মামলা, গ্রেপ্তার, অবসর, ওএসডির চাপে পুলিশ

বাংলাদেশ পুলিশের লোগো

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর অভিযোগে পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৬৮ জন গ্রেপ্তার ও ৫৭ জন পলাতক। এর বাইরে ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) ও বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে আরও ১৪২ জনকে। পলায়নের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন ৯৩ জন।

মামলায় আসামি হওয়া, গ্রেপ্তার, পলাতক, সাময়িক বরখাস্ত, ওএসডি ও বাধ্যতামূলক অবসরের কারণে পুলিশের বিভিন্ন পর্যায়ে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। শাস্তির আওতায় আসা পুলিশ সদস্যদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই না করেই অনেক কর্মকর্তাকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। কেউ ঘটনাস্থলেই ছিলেন না, কারও ডিউটি রোস্টারে নাম ছিল না, আবার কেউ তখন অন্য ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এরপরও তাঁদের মামলা হয়েছে। এই অংশের দাবি, পুলিশের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও কেউ কেউ মামলার আসামি হয়েছেন। এতে প্রকৃত অপরাধীদের পাশাপাশি নির্দোষ কর্মকর্তারাও শাস্তির মুখে পড়ছেন।

অন্যদিকে পুলিশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আন্দোলন দমনে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে জড়িত কর্মকর্তাদের বিচার হওয়া জরুরি। তবে তাঁদের ক্ষেত্রেও যথাযথ তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তাঁরা।

১,৪৯০ পুলিশ সদস্য আসামি

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া মামলায় এখন পর্যন্ত পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ সদস্য আসামি হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৬৮ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি), অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) মতো পদে থাকা কর্মকর্তারাও আছেন।

শাস্তির আওতায় আসা পুলিশ সদস্যদের একটি অংশের অভিযোগ, অনেক পুলিশ কর্মকর্তার প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই না করেই মামলায় আসামি করা হয়েছে। কেউ ঘটনাস্থলেই ছিলেন না, কারও ডিউটি রোস্টারে নাম ছিল না, আবার কেউ তখন অন্য ইউনিটে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এরপরও তাঁদের মামলা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ১৩৭ জন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। পর্যায়ক্রমে তাঁদের মধ্যে ৮০ জন কর্মস্থলে ফিরেছেন। ৫৭ জন এখনো পলাতক। পলাতকদের মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এএসপি, পরিদর্শক, এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল আছেন।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, পলাতক পুলিশ সদস্যদের মধ্যে যাঁদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের কম, তাঁদের বিভাগীয় মামলার মাধ্যমে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আর যাঁদের চাকরির বয়স ২৫ বছরের বেশি, তাঁদের সরাসরি চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বাধ্যতামূলক অবসর, ওএসডি ও সংযুক্ত ২৮৩

গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই পুলিশের ১৭ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ৫৬ জন এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর আরও ৮৫ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে জুলাই অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া মামলায় এখন পর্যন্ত ৬৮ জন পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাও বর্তমানে কারাগারে আছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, এসব কর্মকর্তার বড় অংশের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা রয়েছে।

যেসব মামলায় পুলিশ সদস্যদের কারাদণ্ড হয়েছে, তাঁদের নামে রেড নোটিশ জারির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।
— খোন্দকার রফিকুল ইসলাম, পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক, ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস

এদিকে বিভিন্ন পদমর্যাদার আরও ৮২ জনকে ওএসডিসহ ১৪২ জনকে বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে। পলায়নের অভিযোগে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ৯৩ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৭ জন ডিআইজি, ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, ৩২ জন পুলিশ সুপার, ২৫ জন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও ১৭ জন এএসপি রয়েছেন। এ ছাড়া গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে হওয়া মামলায় পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত আরও ২৬ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

ঘটনাস্থলে ছিলেন না, তবু মামলার আসামি

গত বছরের ৭ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, নিজ কর্মস্থল থেকে পলায়নের অভিযোগে ডিআইজি থেকে পরিদর্শক পদমর্যাদার ৪০ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। তাঁদের বিপিএম ও পিপিএম পদকও প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে এই শাস্তির প্রক্রিয়া নিয়ে পুলিশে বিতর্ক রয়েছে। শাস্তির আওতায় আসা কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, জুলাই অভ্যুত্থানের সময় তাঁদের অনেকেই ঘটনাস্থলে ছিলেন না। কারও ডিউটি রোস্টারে নাম ছিল না। কেউ ছিলেন অন্য ইউনিটে। তাঁদের অভিযোগ, তৎকালীন প্রভাবশালী কিছু পুলিশ কর্মকর্তা ও একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতার প্রভাবে অনেক নির্দোষ কর্মকর্তাও মামলায় জড়িয়েছেন। মামলা হওয়ার পর তাঁদের সাময়িক বরখাস্ত, ওএসডি, সংযুক্ত বা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ধারাবাহিকতা শুরু হয়।

গণ-অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন পদমর্যাদার ১৪১ জন পুলিশ সদস্যকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। গত ২৩ জুলাই সর্বশেষ পুলিশের ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, এসব কর্মকর্তার বড় অংশের বিরুদ্ধেই ফৌজদারি মামলা রয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের সময় ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের উপকমিশনারের দায়িত্বে থাকা অতিরিক্ত ডিআইজি মশিউর রহমানসহ চারজন উপকমিশনার এবং সিটিটিসি ও অ্যান্টিটেররিজম ইউনিটের পুলিশ সুপার পদমর্যাদার তিন কর্মকর্তার নাম ডিউটি রোস্টারে ছিল না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, এরপরও এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা হয়েছে। মশিউর রহমানসহ দুজন বর্তমানে কারাগারে। দুজন রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ে সংযুক্ত। একজন পলাতক এবং আরেকজন একটি ইউনিটে কর্মরত।

পেশাদার কর্মকর্তারাও অবসরের তালিকায়

বাধ্যতামূলক অবসরের তালিকায় রয়েছেন এমন কিছু কর্মকর্তার সহকর্মীদের দাবি, তাঁদের কেউ কেউ দীর্ঘ কর্মজীবনে জেলা পুলিশ সুপার বা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেননি। তাঁদের মধ্যে ডিআইজি কাজী জিয়া উদ্দিন, ডিআইজি আবদুল্লাহিল বাকি ও অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানার নাম উল্লেখ করেছেন সহকর্মীরা। তাঁদের দাবি, পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানে সরাসরি ভূমিকার অভিযোগ নেই। প্রতিদ্বন্দ্বী কর্মকর্তাদের প্রভাব বা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণেই তাঁরা শাস্তির মুখে হয়েছেন।

যথাযথ অনুসন্ধানের পর তথ্য সংগ্রহ করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। যেন একটা নির্দোষ লোকও শাস্তির আওতায় না আসে। একটা নির্দোষ পুলিশ সদস্যও যেন প্রমোশন (পদোন্নতি) বঞ্চিত বা চাকরিচ্যুত না হন।
— মো. আবদুল কাইয়ুম, সাবেক আইজিপি

তবে এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

আরও পড়ুন

জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর উপস্থিতিতে ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসা থেকে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বের করার দেওয়া হয়েছে এমন মিথ্যা ও বানোয়াট প্রতিবেদন সাজিয়ে তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। অথচ ওই দিন সেখানে তাঁর কোনো ডিউটি ছিল না। তখন তাঁর কর্মস্থল ছিল পুলিশ সদর দপ্তরে।

জানতে চাইলে রেবেকা সুলতানা গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, এবার পুলিশের ডিআইজি হিসেবে পদোন্নতির তালিকায় তাঁর নাম ছিল। পেছনের সারির একটি পক্ষ তাঁর পদোন্নতি বাগিয়ে নিতে চাকরি থেকে তাঁকে সরিয়ে দিয়েছে। এর আগেও তাঁকে টপকিয়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও তিনি পদোন্নতিবঞ্চিত ছিলেন। চাকরিজীবনে অতিরিক্ত উপকমিশনার হিসেবে ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তাঁকে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি করা হয়। সর্বশেষ তিনি পুলিশ সদর দপ্তরেই ছিলেন। কখনো কোনো জেলার এসপির দায়িত্ব পাননি। পুলিশের সাবেক এই কর্মকর্তা বলেন, তাঁর সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। তিনি ন্যায়বিচার চান।

আরও পড়ুন

‘দাপুটে’ কর্মকর্তাদের অনেকে এখনো পলাতক

পলাতক ৫৭ পুলিশ সদস্যের মধ্যে আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা আছেন। তাঁদের মধ্যে বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন-অর-রশীদ, ডিএমপির সাবেক অতিরিক্ত কমিশনার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার ও এস এম মেহেদী হাসান এবং ডিএমপি সদর দপ্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত ডিআইজি) প্রলয় কুমার জোয়ারদারের নাম রয়েছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুলিশের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাও দণ্ডিত হয়েছেন। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দুটি মামলায় রাজসাক্ষী বা অ্যাপ্রুভার হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

এ ছাড়া গুলশান থানার সাবেক ওসি বি এম ফরমান আলী, পল্লবী থানার সাবেক ওসি অপূর্ব হাসান, ঢাকা জেলার সাবেক ওসি কাজী মাইনুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা পলাতক আছেন।

আরও পড়ুন

তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা সে সময় বিরোধী দল দমনে মাঠপর্যায়ে ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া বিগত সরকারের সময় ক্ষমতার অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানা অভিযোগ আছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর বিচারের আতঙ্কে তাঁরা আর কর্মক্ষেত্রে ফেরেননি। তাঁদের কেউ কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি মোহাম্মদ আলী মিয়ার বিরুদ্ধে হত্যাসহ আটটি মামলা রয়েছে। জুলাই অভ্যুত্থানে রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. মনিরুজ্জামানকেও বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে আরও ছয়টি ফৌজদারি মামলা রয়েছে।

অভিযোগ ও মামলা থাকা সত্ত্বেও মোহাম্মদ আলী মিয়া ও মনিরুজ্জামানের মতো প্রভাবশালী অনেক পুলিশ কর্মকর্তাকে এখনো গ্রেপ্তার করা যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

আরও পড়ুন

কারাগারে সাবেক আইজিপিসহ ৬৮ কর্মকর্তা

কারা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা পুলিশের ৬৮ সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যে আছেন—সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি ইকবাল বাহার, গাজীপুর মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মোল্যা নজরুল ইসলাম ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার মো. সাইফুল ইসলাম।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, গণ-অভ্যুত্থানের পর সারা দেশে ১৩৭ জন পুলিশ সদস্য কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। পর্যায়ক্রমে তাঁদের ৮০ জন কর্মস্থলে ফিরেছেন। তবে ৫৭ জন এখনো পলাতক। পলাতকদের মধ্যে ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এএসপি, পরিদর্শক, এসআই, এএসআই ও কনস্টেবল রয়েছেন।

এ ছাড়া সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি মো. শহিদুল্লাহ, ডিএমপির মিরপুর বিভাগের সাবেক উপকমিশনার জসীম উদ্দিন মোল্লা, সাবেক পুলিশ সুপার (নিউমারারি) মো. আবদুল্লাহিল কাফী, সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আলেপ উদ্দিন, গুলশান থানার সাবেক ওসি মাজহারুল ইসলাম ও যাত্রাবাড়ী থানার সাবেক ওসি আবুল হাসান কারাগারে আছেন।

কারা সূত্র আরও জানিয়েছে, নোয়াখালীর সাবেক পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান ও ডিএমপি সদর দপ্তরের সাবেক উপকমিশনার (প্রশাসন) তানভীর সালেহীন (ইমন) সম্প্রতি কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হয়েছেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কয়েকজনও কারাগারে

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় পুলিশের কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তাও দণ্ডিত হয়েছেন। সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন দুটি মামলায় রাজসাক্ষী বা অ্যাপ্রুভার হয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।

আশুলিয়ায় ছয়জনের লাশ পোড়ানোসহ সাতজন হত্যার মামলায় সাবেক এসআই আবদুল মালেক ও সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই মামলায় সাবেক পুলিশ সুপার আবদুল্লাহিল কাফীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। দণ্ডপ্রাপ্ত এসব সাবেক কর্মকর্তা কারাগারে আছেন।

পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, যেসব মামলায় পুলিশ সদস্যদের কারাদণ্ড হয়েছে, তাঁদের নামে রেড নোটিশ জারির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।

আরও পড়ুন

অভিজ্ঞ কর্মকর্তার সংকট

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, মামলা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে পুলিশের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ এখন বাহিনীর বাইরে। এ অবস্থায় অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পুলিশ কর্মকর্তার সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের ওপর। এভাবে চলতে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা পুলিশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে বলেও জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে সাবেক আইজিপি মো. আবদুল কাইয়ুম প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। গত ফ্যাসিস্ট রেজিমে যেসব পুলিশ সদস্য পেশাদারত্ব ও আইন ভেঙে অতি উৎসাহী হয়ে জুলুম-নির্যাতন, খুন ও হত্যা করে অপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন। তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তবে যথাযথ অনুসন্ধানের পর তথ্য সংগ্রহ করে অভিযুক্ত সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। যেন একটা নির্দোষ লোকও শাস্তির আওতায় না আসেন। একটা নির্দোষ পুলিশ সদস্যও যেন প্রমোশন (পদোন্নতি) বঞ্চিত বা চাকরিচ্যুত না হন।