সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন এমনটাই বলেছেন। ২০০০ সালে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ দেখা দিয়েছিল। ওই বছর ডেঙ্গুতে মারা গিয়েছিলেন ৯৩ জন। এরপর ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় প্রকোপ দেখা দেয় ২০১৯ সালে। ওই বছর মারা যান ১৭৯ জন। করোনা মহামারি শুরুর বছর অর্থাৎ ২০২০ সালে মারা যান ৭ জন, পরের বছর মারা যান ১০৫ জন। এ বছর এ পর্যন্ত (১৬ নভেম্বর) ডেঙ্গুতে ২১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

গত ২২ বছরের ডেঙ্গুর অভিজ্ঞতা হলো, আগাম বৃষ্টি হলে ডেঙ্গু একটু আগে শুরু হয়। শেষ হয় তাড়াতাড়ি। আবার দেরিতে বৃষ্টি হলে ডেঙ্গুর বিস্তৃতি আরও বাড়ে। তবে কম-বেশি অভিজ্ঞতা হলো, বৃষ্টির মৌসুমে অর্থাৎ জুন থেকে প্রকোপ বাড়তে থাকে। আর তা সেপ্টেম্বরের দিকে কমে আসে। কিন্তু এ বছর মধ্য নভেম্বর পার হলো, মৃত্যু কমছে না। শনাক্ত সপ্তাহখানেক ধরে একটু কম হলেও আগের যেকোনো বছরের চেয়ে তা বেশি।

এ পর্যন্ত যে বছরটায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গুর প্রকোপ হয়েছে অর্থাৎ ২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয় ১ লাখ ১ হাজার ৩৫৪ জন। ওই বছরের আগস্ট মাসে সর্বোচ্চ ৫২ হাজার ৬৩৬ জন আক্রান্ত হয়। এরপর সেপ্টেম্বর থেকে কমতে থাকে প্রকোপ। অক্টোবর আর নভেম্বর মাসে অনেকটাই কমে যায়।

এবার কিন্তু দেখা যাচ্ছে ভিন্ন পরিস্থিতি। এ বছরের অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ৯৩২। এটি এ বছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ রোগীর সংখ্যা। আবার অক্টোবরেই ৮৬ জনের মৃত্যু হয়। চলতি বছর কোনো এক মাসে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর সংখ্যা এটিই।

তিন প্রাকৃতিক কারণ

এবার ডেঙ্গুর বিস্তারে যে তিনটি প্রাকৃতিক কারণের কথা বলা হচ্ছে তার মধ্যে প্রথমটি হলো এ বছর বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হয়নি। জুন ও জুলাই মাস ছিল বৃষ্টিহীন। এসব মাসে দেশের উত্তর জনপদে বরং খরা পরিস্থিতি দেখা গেছে। বৃষ্টি বেশি হয়েছে সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে। আর এই বৃষ্টি হয়েছে থেমে থেমে।

জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘থেমে থেমে বৃষ্টি ডেঙ্গু পরিস্থিতিকে নাজুক করে দিয়েছে। পরিস্থিতির খানেকটা উন্নতি হতে পারত। কিন্তু শেষ অক্টোবরে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ ও সৃষ্টি হওয়া ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কারণে ব্যাপক বৃষ্টির পর ডেঙ্গুর বিস্তার আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে।’

থেমে থেমে বৃষ্টি হওয়ার কারণে এডিস মশার বিস্তারে বেশি হয় বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এবার তেমনটাই হয়েছে। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, থেমে থেমে বৃষ্টি হলে মশা ধুয়েমুছে যায় না।

মশাগুলো থেকেই যায়। যখন একটি এডিস মশা রোগীকে কামড়ায়, তখন কিন্তু সেই মশাটি ভাইরাসটি নিয়ে নেয়। ভাইরাসটি মশার শরীরে থেকে যায়। যখন সে ডিম পাড়ে, তখন সব ডিম থেকে মশা হয় না। বৃষ্টি এবং অনুকূল তাপমাত্রা সেখানে একটি বিচার্য বিষয় হিসেবে থাকে। তারপর যতগুলো ডিম থেকেই বাচ্চা হোক, সেই মশাটি কিন্তু এই ভাইরাস বহন করবে। তাই তারা যাকে কামড়াবে, তারই ডেঙ্গু হবে।

ডেঙ্গু ভাইরাসের ৪ ধরন

চিকিৎসকেরা বলছেন,  ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন আছে। সেগুলো হলো ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। একটি ধরনে একবার আক্রান্ত হলে মানুষের শরীরে সেই ধরনটির প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে ওঠে, মানুষ দ্বিতীয়বার সেই ধরনে আর আক্রান্ত হয় না। ডেন-১-এ আক্রান্ত ব্যক্তি আর কখনো ডেন-১ দ্বারা আক্রান্ত হবে না।

তবে বাকি তিনটি ধরন থেকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে কোনো ব্যক্তি প্রথমবার একটি ধরন দিয়ে আক্রান্ত হওয়ার পর দ্বিতীয়বার যদি অন্য ধরন দিয়ে আক্রান্ত হয়, তাহলে ওই ব্যক্তির জটিলতা বাড়ে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ডেন-১-এ আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হওয়ার পর ডেন-২ বা ডেন-৩ বা ডেন-৪ দ্বারা আক্রান্ত হলে জটিলতা বাড়ে।

বৃষ্টি ও মশা বৃদ্ধির কারণের পাশাপাশি আরেক প্রাকৃতিক কারণ হলো এবার নতুন ধরন বা ডেন-৪ ধরনের সংক্রমণ, এমনটাই মনে করেন মুশতাক হোসেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এবার ডেন-৪ এ রোগী আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। এটা শনাক্তের সংখ্যা বৃদ্ধির একটা কারণ।’

সমন্বিত উদ্যোগের অভাব

মশা নিধনে কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগের অভাবকেও এবার ডেঙ্গু বিস্তারের কারণ হিসেবে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদেরা। ডেঙ্গুর সংক্রমণ রাজধানী ঢাকাতেই বেশি। দুই সিটি করপোরেশন মশার ওষুধ ছিটানো এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে বিভিন্ন জায়গায় অভিযানও পরিচালনা করেছে মাঝেমধ্যে।

ভাইরাসবিদ ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম বলছেন এসব উদ্যোগ নিলেও তাতে ‘পাস করতে পারেনি’। তিনি বলেন,  ‘মশা নিধন একটি সমন্বিত উদ্যোগ। এখানে জনসম্পৃক্ততা দরকার। কিন্তু জনগণকে সম্পৃক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে দুই সিটি।’

এই ব্যর্থতার পাশাপাশি দুই সিটি থেকে যে ওষুধ দেওয়া হচ্ছে মশা নিধনে তা কতটুকু কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম। তিনি মনে করেন, ব্যবহার করা ওষুধ পরীক্ষা করতে হবে।

মশা নিধনে জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি খুব তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন চিকিৎসক আলমগীরও। তিনি মনে করেন, দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ দায় নিচ্ছে না আবার সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোও নিজে থেকে এগিয়ে আসছে না।

২০০০ সালে ডেঙ্গু বিস্তারের সময়কার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এ এস এম আলমগীর বলেন, তখন পাড়ায় পাড়ায় বিভিন্ন সংগঠন যুক্ত হয়েছিল। এখন এসব উদ্যোগ কোথায় গেল?

চিকিৎসক আলমগীর আরও বলেন, ‘আমরা মানুষকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাঠে নামাতে পারছি না। আমরা জানি ডেঙ্গু কী, এতে কী হয়। কিন্তু মানি না।’

স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের মেলবন্ধনের অভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তাই এ দুয়ের সম্মিলন দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আরও কারণ

মুশতাক হোসেন বলেন, রাজধানীতে পাড়াভিত্তিক সরকারি স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব ডেঙ্গু বিস্তার এবং অনেক মৃত্যুর কারণ। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা, থাইল্যান্ড এবং নিকারাগুয়ার উদাহরণ টেনে বলেন, শহরাঞ্চলের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ডেঙ্গু রোগীর তালাশ করা এবং তাকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার উদাহরণ আছে এসব দেশের শহরে।

ঢাকায় দুই সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য পরিষেবার হাল খুব নাজুক। এবার অনেক রোগী দেরিতে হাসপাতালে আসায় তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় থাকা একাধিক চিকিৎসকের অভিমত।

যদি ঢাকার স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো কমিউনিটিভিত্তিক হতো তবে এসব রোগীকে আগেভাগে শনাক্ত করা যেত এবং তাদের আগাম সেবা দেওয়া যেত। তাতে অনেক মৃত্যু রোধ হতো বলেই মনে করেন মুশতাক হোসেন।

চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন,  ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানীর সমস্যা নয় সারা দেশের সমস্যা। এটা শুধু বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ের সমস্যাও এখন আর নেই। তাই এখন থেকেই বছরব্যাপী এবং দেশব্যাপী উদ্যোগ নিতে হবে।