মেয়রের এমন উপলব্ধির পর ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগ মশক নিধনের পদ্ধতিতে কোনো পরিবর্তন আনল কি না, তা জানতে গতকাল সোমবার বিকেলে সংস্থাটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জোবায়দুর রহমানের সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তিনি বলেন, ‘মেয়র সেখানে (যুক্তরাষ্ট্রে) পরিদর্শন করছেন, দেখছেন। তিনি অনেক নতুন তথ্য-উপাত্ত নিয়ে আসবেন। দেশে ফিরে সেই অভিজ্ঞতা তিনি আমাদের জানাবেন। তখন সেগুলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সমন্বয় করা হবে। তবে এখনই সেসব বিষয়ে নির্দিষ্ট করে গণমাধ্যমে কিছু বলার মতো সময় আসেনি।’

ডিএনসিসির স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মশার লার্ভা নিধনে প্রতিদিন সকালে দুটি ওষুধ ব্যবহার করে লার্ভিসাইডিং করা হয়। ওষুধগুলো হচ্ছে টেমিফস ও ম্যালেরিয়া ওয়েল-বি।

টেমিফস ১৫ মিলিলিটার পরিমাণে ১০ লিটার পানির সঙ্গে মিশিয়ে ছিটানো হয়। প্রত্যেক মশককর্মীর কাছে ৬০ মিলিলিটার পরিমাণ ওষুধ দেওয়া হয়। একজন কর্মী তা চারবার ওষুধ ছিটানোর যন্ত্রে (স্প্রে মেশিন) পানির সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করেন।

ম্যালেরিয়া ওয়েল-বি ছিটানো হয় সরাসরি, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী। সাধারণত, যেখানে পানির পরিমাণ বেশি, সেখানে ওষুধটি ছিটানো হয়। যেখানে প্রাকৃতিকভাবে মশক নিধনের জন্য গাপ্পি মাছ ছাড়া আছে, সেখানে ছিটানো হয় না। এ ওষুধ প্রয়োগে মশা ডিম পাড়তে পারে না। আর লার্ভা থাকলে নিশ্বাস নিতে না পেরে মারা যায়।

পানির সঙ্গে ধীরে ধীরে দ্রবীভূত হয়—এমন ওষুধ নোভালিউরন ট্যাবলেটও ব্যবহার করে ডিএনসিসি। এই ওষুধ বাসাবাড়ির ওয়াসার পানির মিটারের বক্সে বা চৌবাচ্চার মতো আবদ্ধ জায়গায় ব্যবহার করা হয়। এতে মশার ডিম লার্ভা হতে পারে না। আর যদি লার্ভা থাকে, তা পিউপায় কিংবা পিউপা থাকলে তা পরিপক্ব মশায় পরিণত হতে পারে না।

বিকেলে ফগিং বা ধোঁয়া দিয়ে মশক নিধনের কাজ করে ডিএনসিসি। এতে মেলাথিওন নামের ওষুধ ব্যবহার করা হয়। ওষুধটি ৫৭ ইসি হিসেবে আমদানি হয়। পরবর্তী সময়ে পরীক্ষাগারে একে ৫ ভাগ হিসেবে ডিজেলের সঙ্গে মিশিয়ে ফগার যন্ত্রে ব্যবহার করা হয়; যদিও এই পদ্ধতি খুব বেশি কার্যকর নয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জোবায়দুর রহমান বলেন, লার্ভিসাইডিংয়ে টেমিফস, ম্যালেরিয়া ওয়েল-বি ও নোভালিউরন ট্যাবলেট যথেষ্ট কার্যকর। অন্যদিকে, ফগিংয়ের কার্যকর মেলাথিওন। তারপরও মেয়র হয়তো একটি ধারণা পেয়েছেন যে দু-তিন বছর পরপর ওষুধ পরিবর্তন করা দরকার। তাঁরাও এমনটা মনে করেন। কেননা, মশারও প্রতিরোধক্ষমতার উন্নতি হতে পারে। তখন ওষুধের পরিবর্তন করা প্রয়োজন। মেয়র দেশে ফিরলে ওষুধে পরিবর্তন আনতে চান কি না, তা আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আতিকুল ইসলামের বার্তার বিষয়ে জোবায়দুর রহমান বলেন, ‘মেয়র জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে লার্ভা নিধনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। আমরাও তা–ই করছি। সেই আঙ্গিক আর ধারণাতেই কাজ করছি। তবে মেয়র বলায় লার্ভিসাইডিংয়ের ওপর আরও বেশি জোর দিয়ে কাজ করা হচ্ছে।’

ডিএনসিসির শনিবারের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মেয়র বলেছেন, দ্রুত ঢাকা উত্তর সিটিতে মশার প্রজাতি চিহ্নিত করার জন্য একটি পরীক্ষাগার স্থাপন করবেন। পরীক্ষাগার স্থাপন সম্পর্কে জোবায়দুর রহমান বলেন, ‘মেয়র একটি পরীক্ষাগার (ল্যাব) প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা পোষণ করেছেন। অর্থাৎ, কোথায়, কোন এলাকায় কী মশা জন্মাচ্ছে, পরীক্ষাগার থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে; যেখানে আমরা এখন মাঠের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কাজ করছি।

পরীক্ষাগার স্থাপন করা গেলে গবেষণার ফলকে কাজে লাগিয়ে কাজ করা সম্ভব হবে। সেটা আরও বিজ্ঞানসম্মত হবে।’ মশক নিধনে বিদেশের মতো ডিএনসিসি একই পথে হাঁটছে বলে দাবি করেন জোবায়দুর রহমান। তিনি বলেন, ‘বাইরে ধীরে ধীরে পানির সঙ্গে মেশে—এমন ট্যাবলেট ব্যবহার করা হয়। আমরাও তা (নোভালিউরন) করছি। এ ছাড়া অনেক কিছুই, যেমন ড্রোনের ব্যবহার করে ছাদবাগান জরিপ করা হয়েছে। জলাশয়ের মাঝ পর্যন্ত পৌঁছানো যায়—এমন উইল বারো যন্ত্র ও নৌকার ব্যবহার করা হচ্ছে।

এতে জলাশয় আকারে বড় হলেও মাঝ পর্যন্ত ওষুধ দেওয়া যাচ্ছে।’ ভুল পদ্ধতি ব্যবহার ও অর্থের অপচয়–সম্পর্কিত আতিকুল ইসলামের উপলব্ধি নিয়ে কিছু বলতে পারবেন না জানিয়ে ডিএনসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘তিনি (মেয়র) হয়তো নিশ্চয়ই দেখেছেন যে এভাবে কাজ করলে অর্থের সাশ্রয় হতো, আরও বেশি কার্যকর হতো।

কিন্তু আমরা প্রচলিত পদ্ধতিতে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার করছি, এটা সজ্ঞানে বলতে পারি। অন্যদিকে কৃচ্ছ্রসাধনের বিষয়টিও রয়েছে।’