বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
default-image

‘অসুস্থ হয়ে আদালতেই শুয়ে পড়েন পরীমনি, মাথায় ঢালতে হয় জল’ থেকে শুরু করে ‘পুলিশ কর্তার সঙ্গে পরীমনির চুম্বনের ভিডিও সরাতে আইনি নোটিশ’ পর্যন্ত অসংখ্য প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে এই সময়ে। বিবিসি তো বটেই, ভারতের বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্র আনন্দবাজার, জিনিউজ, হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, আউটলুক ইন্ডিয়া পরীমনির হালনাগাদ খবর দিয়েছে পাঠকদের।

অবশ্য বছরের শুরুর দিকে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন সদ্য সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। তিনি ও তাঁর ভাইদের নিয়ে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা ফেব্রুয়ারির প্রথম ভাগে তথ্যচিত্র প্রকাশ করে। এর বিষয় নিয়ে দেশি গণমাধ্যমগুলো খুব একটা উচ্চবাচ্য করেনি। তবে গুরুত্ব দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বিবৃতি ছাপে। বিবৃতি দুটির ভাষা মোটামুটি একই রকম। ‘উগ্রপন্থী’ ও ‘অশুভ চিন্তাধারা’র লোকজন অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছেন, তাঁরাই এই তথ্যচিত্রের কারিগর। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, আল–জাজিরা আদতে ‘অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সরকারকে কক্ষচ্যুত করার লক্ষ্য নিয়ে সাজানো হীন রাজনৈতিক ছক বাস্তবায়নের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।

এই প্রতিবেদনের পর দ্য ইকোনমিস্টসহ বেশ কিছু পত্রপত্রিকা খবর ছাপে। স্ক্রল ডট ইন একটি নিবন্ধে লেখে ‘কেন বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যম আল–জাজিরা তথ্যচিত্রের এই বিস্ফোরক অভিযোগ নিয়ে নীরব?’

আজিজ আহমেদকে নিয়ে আলোচনার রেশ কাটতে না–কাটতেই ২৫ ফেব্রুয়ারি মারা যান লেখক ও উদ্যোক্তা মুশতাক আহমেদ। এই ঘটনায় দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সংবাদ শিরোনাম ছিল, ‘বাংলাদেশি রাইটার ডিটেইনড ওভার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টস ডাইজ ইন জেল’ (সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ায় কারাগারে আটক বাংলাদেশি লেখকের মৃত্যু)। প্রতিবেদনে বলা হয়, লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যু আবারও দেখিয়ে দিল বিরুদ্ধ মত দমনে বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো কঠোর আইনের ব্যবহার হচ্ছে।

নিউইয়র্ক টাইমস ছাড়াও মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে বিবিসি, ভারতীয় দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিন্দুস্তান টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য প্রিন্ট, স্ক্রল ও জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পাশাপাশি উদ্বেগ জানিয়ে বিবৃতি দেয় অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো–অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টভুক্ত (ওইসিডি) ১৩ দেশ।

default-image

মতপ্রকাশে বাধার দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয় সাংবাদিক রোজিনা ইসলামের গ্রেপ্তার। চলতি বছরের মে মাসে রোজিনাকে গ্রেপ্তার ও তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের জাঁদরেল সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান ও ওয়াশিংটন পোস্টসহ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ভারতের প্রথম সারির বেশ কিছু সংবাদপত্রে। প্রিজন ভ্যানে রোজিনা ইসলাম কিংবা শতাধিক পুলিশ সদস্যের পাহারায় রোজিনা ইসলামকে আদালতে নেওয়া হচ্ছে—এমন ছবিও ব্যাপকভাবে প্রচার পায়।

এ বছরে বড় সহিংসতার ঘটনা ঘটে দুবার। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকা থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়। এই বিক্ষোভ হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্বে পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়ায়। এতে ১৯ জন নিহত ও পুলিশসহ ৫০০ জন আহত হন। হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয় সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায়। সারা দেশে ১৫৪ মামলায় এক লাখের বেশি আসামি করা হয়।

default-image

এই বিষয়ে বিবিসি দিনের ঘটনার পাশাপাশি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন ছেপেছে। তারা লিখেছে, ‘হোয়াই নরেন্দ্র মোদিস ভিজিট টু বাংলাদেশ লেড টু টুয়েলভ ডেথ’ (কেন নরেন্দ্র মোদির সফর বাংলাদেশে ১২ জনের প্রাণহানি ঘটাল)। নিউইয়র্ক টাইমস, আল–জাজিরা, ডয়চে ভেলে, ভারতের দ্য হিন্দুসহ শীর্ষস্থানীয় সব দৈনিক, পাকিস্তানের জাঁদরেল দৈনিক দ্য ডন এই সফর নিয়ে খবর প্রকাশ করে। মোদির বাংলাদেশ সফরসূচি, কেন বাংলাদেশের ছাত্র ও কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক ছাত্র-শিক্ষকদের সংগঠন হেফাজতে ইসলাম এই সফরের বিরুদ্ধে, এই সহিংসতা দুই দেশের সম্পর্ককে কোন পথে নেবে—এ বিষয়গুলো নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমগুলো।

এ বছরের অক্টোবরে হিন্দুধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজায় সাতটি জেলায় মণ্ডপে ভাঙচুর করা হয়। কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার অভিযোগ থেকে এই ভাঙচুরের শুরু। পরে তা ছড়ায় দেশের অন্যান্য অঞ্চলে। কদিন বাদে পুলিশ জানায়, মণ্ডপে পবিত্র কোরআন রেখেছেন ইকবাল নামের ব্যক্তি। যদিও কার ইন্ধনে ইকবাল এই ঘটনা ঘটিয়েছেন, তা আর প্রকাশ করেনি পুলিশ।

default-image

এই ঘটনার দিকেও চোখ রেখেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। দ্য ইকোনমিস্ট, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদপত্র দ্য ইনডিপেনডেন্ট, কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল–জাজিরা, ভারতের প্রথম সারির প্রায় সব কটি সংবাদমাধ্যমে ঘটনা ও এর বিশ্লেষণ জায়গা করে নিয়েছে।

বছরের শেষভাগে ১০ ডিসেম্বর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব ও পররাষ্ট্র দপ্তর র‌্যাবের সাবেক ও বর্তমান মহাপরিচালকসহ সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। অভিযোগ তোলা হয় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের। প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ সরকার, মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে ডেকে পাঠান পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন।

এ খবর ও নিষেধাজ্ঞার কারণ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী খবর ও মতামত প্রকাশ করেছে যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান থেকে শুরু করে ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র, পাকিস্তানের দ্য ডন, জাপানের এনএইচকেসহ আরও অনেকে।

অবশ্য পত্রপত্রিকাগুলো নিষেধাজ্ঞার পেছনে যে কারণই খুঁজুক না কেন, আবারও সরকারের তরফ থেকে আঙুল তোলা হয়েছে সেই ‘উগ্রবাদী’ ও ‘অশুভ চক্রের’ দিকে। যদিও অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও বাংলাদেশে নির্বিঘ্নে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। বছরের প্রথম ১১ মাসে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে এই সংখ্যা ছিল ৬৭।

অপরাধ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন