রাউজানের গরিবউল্লাহ পাড়ায় ঢোকার আগে সিএনজিচালকদের হিসাব করতে হয়—যাত্রী কারা, যাবেন কোন বাড়িতে, পরিচিত লোকের নাম কী। কারণ, পথে সন্ত্রাসীদের দুটি পক্ষ গাড়ি থামিয়ে চালক ও যাত্রীদের তল্লাশি করে।
এই পাড়ার ভান্ডারি কলোনিতেই গত বছরের ১৯ এপ্রিল রাতে প্রবাসফেরত যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহকে নিজ বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর পরিবার বাড়ি ছেড়েছে। প্রতিবেশীরা হত্যাকারীদের কয়েকজনকে চিনলেও নাম বলতে চান না। একজন বললেন, ‘এখানে কথা বলার মানে নিজের বিপদ ডেকে আনা।’
শুধু গরিবউল্লাহ পাড়া নয়। ঈশান ভট্টের হাটে স্ত্রী-সন্তানের সামনে যুবদল নেতা মো. সেলিমকে, পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারে শত শত মানুষের সামনে মাসুদুল হক চৌধুরীকে, গাজীপাড়ায় মুহাম্মদ ইব্রাহিম ও পশ্চিম রাউজানে আলমগীর আলমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত ব্যক্তিদের সবাই যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
হত্যার স্থান আলাদা হলেও কৌশল প্রায় একই। অস্ত্রধারীরা মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এসে প্রকাশ্যে গুলি করেন। এরপর পাহাড়ি পথ ধরে সরে যান। পড়ে থাকে লাশ, বাড়ি ছাড়ে পরিবার এবং নীরব হয়ে যান প্রত্যক্ষদর্শীরা। এরপর বদলে যেতে থাকে এলাকার নিয়ন্ত্রণ।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত রাউজানে অন্তত ২৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ। হত্যাকাণ্ডগুলোর অন্তত ১৬টির সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও রাউজানকেন্দ্রিক খুন হয়েছে ছয়টি।
সরেজমিন দেখা গেছে, খুন এখানে শুধু প্রতিপক্ষকে সরানোর ঘটনা নয়; বাজারের চাঁদাবাজি, বালুমহাল, নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা এবং এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারও হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এসব ঘিরে রাউজানে তৈরি হয়েছে এক অদৃশ্য শাসনব্যবস্থা, ভয়ের সংস্কৃতি। নোয়াপাড়ার এক বাসিন্দার ভাষায়, ‘এখানে মানুষ প্রজার মতো। সন্ত্রাসীরাই রাজা।’
চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে রাউজান। পশ্চিমে হালদা নদী, দক্ষিণে কর্ণফুলী এবং পূর্বে রাঙ্গুনিয়া ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়। নদী, পাহাড় ও প্রধান সড়কের এই সংযোগ অপরাধী গোষ্ঠীগুলোকে হামলার পর পালানোর একাধিক পথ দিয়েছে।
প্রথম আলোর দুই প্রতিবেদক সম্প্রতি রাউজানের গরিবউল্লাহ পাড়া থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া ১৫টি স্থানে গিয়েছেন। পাহাড়তলী চৌমুহনী, কদলপুরের ঈশান ভট্টের হাট ও আশরাফ শাহর মাজার, রাউজান সদর ইউনিয়নের গাজীপাড়া, পৌরসভা, অলিমিয়ার হাট, পূর্ব গুজরা, মদুনাঘাট ও নোয়াপাড়ায় স্থানীয় বাসিন্দা, নিহত ব্যক্তিদের স্বজন, ব্যবসায়ী, সিএনজিচালক ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছেন তাঁরা।
এর বাইরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন—এমন আট ব্যক্তির সঙ্গে কথা হয় প্রথম আলোর। তাঁদের ভাষ্য, রাউজানের সন্ত্রাসীরা আশপাশের এলাকা এবং চট্টগ্রাম নগরেরও বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত। এ ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হানের নাম সবচেয়ে বেশি এসেছে।
হত্যার স্থান আলাদা হলেও কৌশল প্রায় একই। অস্ত্রধারীরা মোটরসাইকেল বা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় এসে প্রকাশ্যে গুলি করেন। এরপর পাহাড়ি পথ ধরে সরে যান। পড়ে থাকে লাশ, বাড়ি ছাড়ে পরিবার এবং নীরব হয়ে যান প্রত্যক্ষদর্শীরা। এরপর বদলে যেতে থাকে এলাকার নিয়ন্ত্রণ।
তল্লাশির পাড়া
রাউজানের তিনজন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক প্রথম আলোকে বলেন, গরিবউল্লাহ পাড়ায় তাঁরা তল্লাশির শিকার হয়েছেন। সেখানে যাওয়ার কারণে গালাগালও শুনেছেন। একজন বলেন, ‘যাত্রী নিয়ে গেলেও ভয় লাগত। দুই পক্ষই থামাত। ভুল লোকের নাম বললে বিপদ।’
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, স্থানীয় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি ঘিরে পাড়াটিতে দুটি পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ। এক পক্ষের নেতৃত্বে ছিলেন যুবদল নেতা আরাফাত মামুন। তিনি বাগোয়ান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করতে চান। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করার পথে বাধা হয়ে উঠেছিলেন প্রবাসফেরত যুবদল কর্মী মানিক আবদুল্লাহ।
ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম হত্যা মামলায় আরাফাত মামুন গত বছরের ৪ মার্চ গ্রেপ্তার হন। এর পরের মাসে খুন হন মানিক আবদুল্লাহ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে মনে করেন, মানিক হত্যায় মামুনের অনুসারীদের ভূমিকা রয়েছে।
মানিকের পাশের বাড়ির বাসিন্দা জাহাঙ্গীর আলমসহ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, হত্যাকাণ্ডের পরও এলাকার ভয় কাটেনি। মানিকের পরিবার বাড়ি ছেড়েছে। তাদের ঘরটি ফাঁকা পড়ে আছে।
পরিত্যক্ত ওই বাড়িতে গেলে পাশের একটি খুপরি থেকে ‘কে? কে?’ বলে একজন চিৎকার করে উঠলেন। পরে সেখান থেকে বের হয়ে এক যুবক প্রথম আলোর প্রতিবেদকদের সঙ্গে কথা বলেন। নাম জানালেন হৃদয় আহমেদ ওরফে শাওন। দাবি করলেন, তিনি মামুনের মুক্তির জন্য কাজ করছেন। তিনিও চাঁদাবাজির একটি মামলায় গ্রেপ্তার ছিলেন। কিছুদিন আগে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
শাওনের দাবি, মানিক খারাপ লোক ছিলেন, তাই খুন হয়েছেন। তবে এতে মামুন জড়িত নন। হত্যার পর দক্ষিণ রাউজানের নিয়ন্ত্রণ জসিম গ্রুপের হাতে।
মানিকের ছোট ভাই সাকিল আহমেদ বলেন, ২০১০ সালের ২৬ মার্চ তাঁদের বড় ভাই যুবদল কর্মী রাশেদুল ইসলামকে গাড়ি থেকে নামিয়ে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।
সাকিল বলেন, ‘১৫ বছর আগে এক ভাইকে খুন করেছে আওয়ামী লীগের লোকজন। এবার আরেক ভাই (মানিক) খুন হন নিজের দলের মানুষের হাতে।’
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে মনে করেন, মানিক হত্যায় মামুনের অনুসারীদের ভূমিকা রয়েছে।
হত্যার পর বদলায় নিয়ন্ত্রণ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কর্ণফুলীকেন্দ্রিক বালুমহাল ও নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ বিএনপি নেতা আবদুল হাকিমের হাতে ছিল বলে স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য। তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিএনপি নেতা পরিচয় দেওয়া হাজি মুহাম্মদ জসিমের পক্ষটি সেই নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছিল।
২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর রাউজান থেকে ফেরার পথে হাটহাজারীর মদুনাঘাটে চলন্ত গাড়িতে হাকিমকে গুলি করা হয়। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, এর আগে খুন হওয়া মানিক ছিলেন জসিমের ঘনিষ্ঠ। হাকিম হত্যায় জসিমের নাম আসে। এরপর জসিম আবার দেশ ছাড়েন। তাঁর অনুসারী একটি পক্ষ নোয়াপাড়াসহ দক্ষিণ রাউজানের কয়েকটি এলাকায় এখনো সক্রিয়। তবে বাগোয়ানে মামুনের অনুসারীদের আধিপত্য বেশি।
মামুন জেলে ও জসিম পলাতক থাকায় এ বিষয়ে দুজনের কারও বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর রাউজান থেকে ফেরার পথে হাটহাজারীর মদুনাঘাটে চলন্ত গাড়িতে হাকিমকে গুলি করা হয়। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, এর আগে খুন হওয়া মানিক ছিলেন জসিমের ঘনিষ্ঠ। হাকিম হত্যায় জসিমের নাম আসে। এরপর জসিম আবার দেশ ছাড়েন।
র্যাবের সঙ্গে বৈঠকের পর হত্যা
গত ১৩ জুন পাহাড়তলী জনবহুল চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুদুল হক চৌধুরীকে।
হত্যার দৃশ্য দেখা ৭২ বছর বয়সী ফার্মেসিমালিক মাহমুদুল হক বলেন, ‘গুলি করতে করতে আসল, আবার গুলি করতে করতে চলে গেল। জীবনেও এমন দেখিনি।’
নিহত মাসুদের ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, হত্যার আগে ঘটনাস্থল থেকে ৪০-৫০ মিটার দূরের কার্বন রেস্টুরেন্টে র্যাব সদস্যদের সঙ্গে মাসুদের বৈঠক হয়েছিল।
পুলিশের ধারণা, রাজনৈতিক আধিপত্যের পাশাপাশি বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ এই হত্যার পেছনে থাকতে পারে।
ওই রেস্তোরাঁর কর্মী মুহিত কায়সার প্রথম আলোকে বলেন, বৈঠক শেষে মাসুদসহ পাঁচজন বের হন। র্যাব সদস্যরা আগেই চলে যান। এর ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যে মাসুদকে গুলি করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করা হয়েছে। তিনজনের হাতে পিস্তল এবং দুজনের হাতে শটগান ছিল। হত্যাকারীরা সন্ত্রাসী মোহাম্মদ রায়হানের অনুসারী।
মাসুদের বড় ভাই পেয়ারুল হক চৌধুরী রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। পরিবারের ভাষ্য, মাসুদও পরবর্তী নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
পুলিশের ধারণা, রাজনৈতিক আধিপত্যের পাশাপাশি বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ এই হত্যার পেছনে থাকতে পারে।
মামলা করে কী করব? কিছুই হবে না। আর মামলা করার টাকাও নেই আমাদের কাছে। তাই আল্লাহর কাছে বিচার দিছি।দিদারের মা বাচু আক্তার
প্রকাশ্যে হত্যা, আল্লাহর কাছে বিচার
২০২৫ সালের ৬ জুলাই কদলপুরের ঈশান ভট্টের হাটে বোরকা পরা অস্ত্রধারীরা গুলি করে হত্যা করে ইউনিয়ন যুবদলের সদস্যসচিব মো. সেলিমকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, খুন করে অস্ত্রধারীরা আশরাফ শাহর মাজারের পাশ দিয়ে পাহাড়ের দিকে চলে যান।
ওই মাজারের পাশে এখন পুলিশের তল্লাশিচৌকি। তবে স্থানীয় মানুষের আস্থা ফেরেনি। সেখানকার চা-দোকানি শাহজাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষ ভয় পাইছে। পুলিশ, র্যাব আর আর্মি মিলে অভিযান দরকার। নইলে এসব থামবে না।’
সেলিম হত্যা মামলায় যুবদল কর্মী নাসির উদ্দিনের নাম আলোচনায় আসে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন। নাসিরের বিরুদ্ধেও প্রায় পাঁচটি মামলা ছিল। সেলিম হত্যার ৯ মাস পর এ বছরের ২৬ এপ্রিল নাসিরকেও একই এলাকায় গুলি করে হত্যা করা হয়।
সেলিম হত্যার দুই দিন পর তাঁর বন্ধু দিদারকে (৩০) রাঙামাটির কাউখালীর পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়; কিন্তু পরিবার মামলা করেনি। দিদারের মা বাচু আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলা করে কী করব? কিছুই হবে না। আর মামলা করার টাকাও নেই আমাদের কাছে। তাই আল্লাহর কাছে বিচার দিছি।’
বাড়ি নির্মাণেও নিয়ন্ত্রণ
সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ শুধু রাজনীতি ও বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। কদলপুর ও আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা জানান, কিছু এলাকায় বাড়ি নির্মাণের মিস্ত্রি এবং ইট, বালু ও সিমেন্ট নিতে হয় নির্ধারিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে। বাইরে থেকে শ্রমিক বা নির্মাণসামগ্রী আনলে বাধা দেওয়া হয়। ফলে বাজারদরের চেয়ে বেশি টাকা গুনতে হয় বাড়ির মালিককে।
নোয়াপাড়ার এক প্রবাসীর কাছে বাড়ি নির্মাণের সময় ২৫ লাখ টাকা দাবি করে সন্ত্রাসীরা। পরে তিনি নির্মাণকাজ বন্ধ করে বিদেশে চলে যান। নিরাপত্তার আশঙ্কায় দেশে ফিরছেন না বলে তাঁর স্বজনেরা জানান।
নির্মাণকাজ কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় তা বুঝতে রাউজানের উড়কিরচরের হারপাড়া এলাকার একটি ইটভাটায় যান প্রথম আলোর প্রতিবেদকেরা। সেখানে ভাটার ব্যবস্থাপক সজীব দাস বলেন, ‘কিছু কিছু এলাকায় সমস্যা হয়, যেখানে একক আধিপত্য আছে। আমরা আগে টাকা নিয়ে নিই। এ জন্য আমাদের সমস্যা হয় না।’
বোঝা যায়, ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারীদেরও এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে সমঝোতা করে চলতে হচ্ছে।
এসব নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটেছে। নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসা নিয়ে বিরোধ থেকে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল রাউজান সদর ইউনিয়নের গাজীপাড়ায় যুবদল কর্মী মুহাম্মদ ইব্রাহিমকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর চাচা আবদুল হালিম ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি। কয়েকজন বাসিন্দা এই হত্যায় সন্ত্রাসী রায়হানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেছেন।
‘জীবন হাতে নিয়ে চলি’
রাউজান পৌরসভার পশ্চিম রাউজানে কায়কোবাদ জামে মসজিদসংলগ্ন পুরোনো কবরস্থানের ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে ছিলেন আট অস্ত্রধারী। আত্মীয়ের বাড়ি থেকে দাওয়াত খেয়ে ফেরার সময় তাঁরা যুবদল কর্মী আলমগীর আলমকে গুলি করে হত্যা করেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আলমগীর কারাগারে ছিলেন। ক্ষমতার পালাবদলের পর এলাকায় ফিরে সক্রিয় হন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরোধ এবং আলোচিত সন্ত্রাসী রায়হানের ঘনিষ্ঠ অস্ত্রধারীদের সঙ্গে এই হত্যার সম্পর্ক থাকতে পারে।
রায়হান তাঁর ফেসবুকে সংসদ সদস্য গিয়াস কাদের চৌধুরীর সঙ্গে তোলা ছবি কাভার ছবি হিসেবে দিয়েছেন। এ বিষয়ে গিয়াস কাদের প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন এআই দিয়ে কী না করা যায়?’ তবে ছবি শনাক্তকারী পাঁচটি টুলস ব্যবহার করে প্রথম আলো দেখেছে, এটি এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি করা ছবি নয়।
এ বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি অলিমিয়ার হাটে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদল কর্মী আবদুল মজিদকে হত্যা করা হয়। ঘটনাস্থলটি পূর্ব গুজরা পুলিশ তদন্তকেন্দ্র থেকে প্রায় ৫০০ মিটার দূরে।
মজিদের বড় ভাই আবদুল আজিজ বলেন, বাজার ইজারা নিয়ে তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে একটি পক্ষের বিরোধ ছিল। হত্যার পর তাঁদের বাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘ভাই মরে গিয়ে আমরাও বিপদে পড়ে গেছি। এখন জীবন হাতে নিয়ে চলি।’
পরিবারের অভিযোগ, হুমকির বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে গেলেও পুলিশ তা নেয়নি। হত্যা মামলায় তিনজনের নাম থাকলেও অজ্ঞাতনামা অস্ত্রধারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না।
মজিদের স্ত্রী শাহনাজ বেগম বলেন, এর আগেও তাঁর স্বামীর ওপর হামলা হয়েছিল। তখন তিনি বেঁচে গেলেও এবার তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
এর আগে ৫ জানুয়ারি একই বাজারের কাছে যুবদল নেতা মুহাম্মদ জানে আলমকে মোটরসাইকেলে এসে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ১৭ বছর পর এলাকায় ফিরে তিনি রাজনীতি ও স্থানীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়েছিলেন। তিনি একটি মসজিদের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।
প্রতিবেশী মো. ইব্রাহিম বলেন, দীর্ঘদিন পর ফিরে আসায় মানুষের মধ্যে জানে আলমের প্রভাব তৈরি হয়েছিল।
স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ টাকা দিয়ে অস্ত্রধারী ভাড়া করে তাঁকে হত্যা করিয়েছে। তবে জানে আলমের বিরুদ্ধে এক প্রবাসীর বাড়িতে গুলি ও চাঁদাবাজির একটি মামলার কথাও জানা গেছে।
চার দশকের নিয়ন্ত্রণের লড়াই
রাউজানের বর্তমান সহিংসতা নতুন নয়। প্রবীণ বাসিন্দা ও রাজনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য, আশির দশকের মাঝামাঝি বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পরিবার এবং আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ আল হারুনের অনুসারীদের দ্বন্দ্বে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্র হয়। ওই সময়ে অনেক মানুষ খুন হয়েছিলেন বলে স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন।
১৯৯৫-৯৬ সালের দিকে বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া চলত। কে কোন এলাকায় ঢুকতে পারবেন, সেটিও নিয়ন্ত্রণ করত রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া গোষ্ঠীগুলো।
২০০৯ সালের পর রাউজানে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী তাঁর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় নির্বাচন, বাজার, ইজারা ও ব্যবসা, অপরাধজগৎ—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ ছিল ফজলে করিম ও তাঁর দলীয় ক্যাডারদের হাতে। তিনি বিরোধী দলের পাশাপাশি নিজ দলের বিরুদ্ধমতের নেতা-কর্মীদেরও এলাকাছাড়া করেছিলেন।
গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই একক নিয়ন্ত্রণ ভেঙে যায়। দীর্ঘদিন এলাকাছাড়া বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা ফিরে আসেন। একই সঙ্গে কারাগার থেকে বেরিয়ে বা আত্মগোপন থেকে ফিরে পুরোনো অপরাধীদের কেউ কেউ নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
দুই নেতার বিরোধ ছড়িয়েছে পাড়ায় পাড়ায়
রাউজান বিএনপির রাজনীতি এখন প্রধানত দুই নেতার অনুসারীদের মধ্যে বিভক্ত। এক পক্ষে স্থানীয় সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। অন্য পক্ষে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক গোলাম আকবর খন্দকার।
দুই পক্ষের বিরোধ ইউনিয়ন, বাজার ও পাড়া পর্যন্ত ছড়িয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া, বাজার ও বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ এবং নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ নিয়ে তাঁদের অনুসারীরা মুখোমুখি হচ্ছেন। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, গোলাম আকবরের অনুসারীরা এখন এলাকায় কোণঠাসা।
গত বছরের জুলাইয়ে দুই পক্ষের বড় সংঘর্ষে গোলাম আকবরসহ অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। পরে বিএনপি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করে এবং গিয়াস কাদেরের দলীয় পদ স্থগিত করে। সংঘর্ষের ঘটনায় তাঁর অনুসারী হিসেবে পরিচিত বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের ১২৯ নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়।
গত বছরের ২৯ জুলাই বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর পাঠানো চিঠিতে গিয়াস কাদেরের বিরুদ্ধে দলীয় হানাহানি ও সংঘাতে মদদ দেওয়া এবং এলাকায় ‘ত্রাসের রাজত্ব’ কায়েমের অভিযোগ করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর দলের কারণ দর্শানোর নোটিশে তাঁর বিরুদ্ধে পাঁচটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছিল। নোটিশে ধনী ব্যবসায়ীদের তালিকা করে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায়, ওমানপ্রবাসী ব্যবসায়ী ইয়াসিনের কাছে দেড় কোটি টাকা দাবি ও তাঁর বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং ব্যবসায়ী মো. ফোরকানের কাছে এক কোটি টাকা দাবি ও তাঁকে নির্যাতনের অভিযোগ করা হয়। বিদেশ থেকে ফিরে সন্ত্রাসী ভাড়া করে রাউজানে আতঙ্ক তৈরি এবং দলীয় কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা প্রকাশের অভিযোগও ছিল ওই নোটিশে।
গিয়াস কাদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, দলীয় সংঘাত, হত্যা বা সন্ত্রাসে তিনি কখনো কাউকে উৎসাহ বা মদদ দেননি। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনেছে। তাঁর দাবি, অভিযোগ ওঠার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট এক ব্যবসায়ী বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিলেন, তাঁর সঙ্গে গিয়াস কাদেরের পরিচয় বা যোগাযোগ নেই।
গিয়াস কাদের চৌধুরী দাবি করেন, তিনি কোনো সন্ত্রাসীর পক্ষে থানায় ফোন বা তদবির করেননি। চাঁদাবাজির অভিযোগ পেলে তিনি পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে বলেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঠিক ভূমিকার অভাবেই রাউজানে সন্ত্রাস হচ্ছে।
অন্যদিকে গোলাম আকবর খন্দকার বলেন, ‘রাউজানের অপরাধ ও খুনোখুনিতে কোনো পক্ষ-বিপক্ষের বিষয় নেই। এখন যা হচ্ছে তার সবই গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর লোকজনই করছে।’ দখল, চাঁদাবাজি, মাটি ও বালুর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে খুনোখুনি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই টাকা কারা নেয় এবং শেষ পর্যন্ত কার কাছে যায়, তা অনুসন্ধান করলেই জানা যাবে।
পুলিশ বলছে, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের সহযোগী সন্ত্রাসী মো. রায়হান, মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, মো. কাদের, ধামা ইলিয়াসসহ কয়েকজন চাঁদাবাজি করছেন এবং ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করছেন। একাধিক ঘটনার অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করা হয়েছে। পাহাড় ও সমতলে অভিযান চলছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে, আস্থা নেই
স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, হত্যার পর মামলা এবং কিছু গ্রেপ্তার হলেও অস্ত্রের উৎস, অর্থদাতা, পরিকল্পনাকারী ও আশ্রয়দাতাদের শনাক্ত করতে তদন্ত গভীরে যায় না।
স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পুলিশ মার্ডারের নেপথ্যে যায় না। এ জন্য ঘটনার পর ঘটনা ঘটে।’
পুলিশ বলছে, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খানের সহযোগী সন্ত্রাসী মো. রায়হান, মোবারক হোসেন ওরফে ইমন, মো. কাদের, ধামা ইলিয়াসসহ কয়েকজন চাঁদাবাজি করছেন এবং ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করছেন। একাধিক ঘটনার অস্ত্রধারীদের শনাক্ত করা হয়েছে। পাহাড় ও সমতলে অভিযান চলছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, অপরাধ করেই সন্ত্রাসীরা পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে চলে যায়। আধিপত্য বিস্তার ও বালু ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বেশির ভাগ ঘটনার সূত্রপাত।
পুলিশ সুপার বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের কাছে ভারী অস্ত্র থাকতে পারে। আমরা ড্রোন ব্যবহার করে সন্ত্রাসীদের অবস্থান শনাক্তসহ নানাভাবে তাদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ আতঙ্ক কমাতে তল্লাশিচৌকি ও টহল বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের কথা, শুধু সরাসরি হত্যায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করলে পরিস্থিতি বদলাবে না। যাঁরা টাকা, তথ্য, অস্ত্র ও রাজনৈতিক আশ্রয় দিচ্ছেন, তাঁদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
রাউজানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে নীরবতা। বাজারে প্রকাশ্যে খুন হলেও দোকানিরা কিছু দেখেননি বলে জানান। নিহতের বাড়িতে গেলে পুরুষ সদস্যরা সামনে আসেন না। নারীরা দরজার আড়াল থেকে কথা বলেন। কেউ মামলা করতে ভয় পান, কেউ মামলা করেও হতাশ; কোনো কোনো পরিবার এলাকা ছেড়ে চলে গেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, রাউজানে এই পরিস্থিতির পেছনে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন বড় ভূমিকা রাখছে। একই রাজনৈতিক দলের দুটি পক্ষ আধিপত্য বিস্তারের জন্য মুখোমুখি হচ্ছে। যারা লোকবল দেখাতে, এলাকা নিয়ন্ত্রণ করতে কিংবা প্রতিপক্ষকে দমন করতে পারে, রাজনীতিতে তাদের মূল্যায়ন করার প্রবণতা রয়েছে। এতে চিহ্নিত অপরাধীরাও রাজনৈতিক আশ্রয় পাচ্ছে। তাই কেবল সন্ত্রাসী নয়, তাদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা ও সহায়তাকারীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।