চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড়ে রাজনৈতিক ব্যানার টাঙানোকে কেন্দ্র করে প্রথমে ছুরিকাঘাত, পরে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল কর্মী জিহাদুর রহমানকে। মামলার আসামিদের মধ্যে ছাত্রদলের দুই নেতাও রয়েছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ হত্যার নেপথ্যে ছিল এলাকায় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় দুই বছরে চট্টগ্রাম নগরে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে ছোট-বড় অর্ধশতাধিক সংঘর্ষ, গোলাগুলি, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় চারজন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘শায়েস্তা’ করতে সন্ত্রাসী ভাড়া করে হামলার অভিযোগও রয়েছে।
এর মধ্যে খুন, হামলা, সংঘর্ষ ও দখলের ১৫টি ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে প্রথম আলো।
পুলিশ ও আদালতের নথি, দলীয় সিদ্ধান্ত, ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য এবং সরেজমিন পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ঘটনার নেপথ্যে ছিল নিজ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। এ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে জড়িয়ে আছে জায়গা দখল, চাঁদাবাজি, ঠিকাদারি কাজ, ঘাট ও বাজারের আয় এবং নির্মাণকাজে চাঁদা বসানোর অভিযোগ।
সন্ত্রাসীর কোনো পরিচয় নেই। যে পরিচয়ে থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আমরা মামলা নিচ্ছি, গ্রেপ্তারও করছি।চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী
গত ২৮ জুন থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম শহরের অন্তত ৩০টি এলাকায় শতাধিক মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে চট্টগ্রামের অবৈধ আয়ের উৎসগুলোরও হাতবদল হয়েছে। আগে এসব জায়গায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগ-ঘনিষ্ঠদের প্রভাব ছিল। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ঘাট, বিলবোর্ড, রেল, নির্মাণকাজ, সরকারি জমি ও পরিবহন খাতে পুরোনো চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণে এসেছে নতুন মুখ। কোথাও সরাসরি বিএনপি নেতা, কোথাও যুবদল-ছাত্রদলের নেতা-কর্মী, আবার কোথাও বড় নেতার অনুসারী পরিচয়ে দখল, ভয়ভীতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে।
তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, যেভাবে ঘটনা ঘটছে, সে তুলনায় শাস্তির হার কম। কারও কারও বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বা কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষণ করা ঘটনাগুলো হলো ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর চান্দগাঁওয়ে টার্ফের দখল নিয়ে সংঘর্ষে জুবায়ের উদ্দিন হত্যা, ১৮ নভেম্বর এমইএস কলেজে গুলি, ১৫ ডিসেম্বর কাজীর দেউড়িতে গুলি, ২০২৫ সালের ২১ মার্চ জিইসি মোড়ে জিহাদুর রহমান হত্যা, ২৫ অক্টোবর বাকলিয়ায় সাজ্জাদ হত্যা, ৫ নভেম্বর বায়েজিদে সরোয়ার হোসেন হত্যা, সল্টগোলা ঘাটের নিয়ন্ত্রণ ও টাকা আদায়, খুলশীতে শফিউল বারীর প্লট দখল, তুলাতলীতে খাসজমি দখল, ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি সিআরবিতে রেল কর্মকর্তার দপ্তরে গিয়ে হুমকি, ২৭ এপ্রিল চাঁদা না পেয়ে সম্পত্তি ভাঙচুর, ৫ মে দামপাড়ায় পুলিশের ওপর হামলা, ৫ জুন ফয়’স লেকে সরকারি জমি নিয়ে গোলাগুলি, ৩০ জুন রেলের দরপত্র জমা দিতে গিয়ে ঠিকাদার কার্তিক রঞ্জন শীলের ওপর হামলা এবং এর আগে আরেক ঠিকাদার হুমায়ুনকে মারধর।
চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ত্রাসীর কোনো পরিচয় নেই। যে পরিচয়ে থাকুক না কেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। আমরা মামলা নিচ্ছি, গ্রেপ্তারও করছি।’
তবে প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, যেভাবে ঘটনা ঘটছে, সে তুলনায় শাস্তির হার কম। কারও কারও বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শুধু দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বা কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে।
৫ আগস্টের পর থেকেই শুরু
চট্টগ্রামে দখল ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণের হাতবদল শুরু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকেই। এ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে প্রথম খুনের ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। সেদিন বিকেলে নগরের পুরাতন চান্দগাঁও এলাকায় চান্দগাঁও স্পোর্টস জোনে টার্ফের (কৃত্রিম ঘাসের মাঠ) দখল নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায় যুবদলের দুটি পক্ষ। এতে জুবায়ের উদ্দিন (২৬) নামের এক যুবক নিহত হন।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন মহানগর যুবদলের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। নগর যুবদলের বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম সম্পাদক মোশাররফ হোসাইন ও নগর যুবদলের কৃষিবিষয়ক সম্পাদক নুরুল আমিনকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলীয় সব পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। দুজনই যুবদলের বিলুপ্ত মহানগর কমিটির সভাপতি মোশাররফ হোসেন ওরফে দীপ্তির অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
গত বছরের ২১ মার্চ জিইসি মোড়ে জিহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় খুলশী থানায় করা মামলায় ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে নগর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শরীফুল আলম তুহিন ও খুলশী থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব নুর আলম সোহাগও রয়েছেন।
নুর আলম সোহাগ হলেন শরীফুল আলম তুহিনের অনুসারী। তুহিন হলেন মোশাররফ হোসেন দীপ্তির অনুসারী। বর্তমানে কোনো পদে না থাকলেও চট্টগ্রাম শহরে বিভিন্ন বিষয়ে নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে এখনো দীপ্তি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
ব্যানারে ছবির রাজনীতি থেকে খুন
গত বছরের ২৫ অক্টোবর বাকলিয়া অ্যাকসেস রোড এলাকায় গোলাগুলিতে ছাত্রদল কর্মী মো. সাজ্জাদ নিহত হন। এ ঘটনায় করা মামলার ১৭ আসামির বেশির ভাগই বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মী। তাঁদের মধ্যে যুবদলের পদপ্রত্যাশী বোরহান উদ্দিন ও তাঁতী লীগের নেতা নজরুল ইসলামও রয়েছেন। তাঁরা নিজেদের ছাত্রদলের সাবেক নেতা গাজী সিরাজ উল্লাহর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দিতেন। তবে গাজী সিরাজ তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কথা অস্বীকার করেছেন।
এ ঘটনায় করা মামলায় বলা হয়, মেয়র শাহাদাত হোসেন তাঁর ছবি ব্যবহার করে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের টাঙানো ব্যানার সরানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। যুবদল কর্মী মো. জসিম এমন একটি ব্যানার সরানোর পর তাঁকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়। তাঁকে উদ্ধার করতে গেলে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে সাজ্জাদ নিহত হন।
সাজ্জাদের বাবা মোহাম্মদ আলমের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় যেন আসামি বোরহানের বিচারের পথে বাধা না হয়।
তবে মহানগর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ সাহেদ দাবি করেন, বোরহান তাঁদের সংগঠনের কেউ নন।
দখল করা প্লটে গরুর খামার
খুলশীতে তিন কোটি টাকা মূল্যের একটি প্লট দখলের ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতার নাম এসেছে। নগরের খুলশী লেক ভ্যালি সোসাইটির নুরিয়া মাদ্রাসা রোডে ছয় কাঠার ওই প্লটের মালিক এস এম শফিউল বারী। তাঁর দাবি, ১৯৮২ সালে প্লটটি কেনেন তিনি। সেখানে তাঁর একটি আধা পাকা ঘরও ছিল। ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর প্লটটি দখল করে নেওয়া হয়। বাধা দিলে তাঁকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় খুলশী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং আদালতে নালিশি মামলা করেন তিনি। মামলাটি তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর আদালতে প্রতিবেদন জমা দেন খুলশী থানার উপপরিদর্শক শওকত আলী।
পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়, অবৈধভাবে ও গায়ের জোরে শফিউলের প্লট দখল করে সেখানে গবাদিপশু রাখা হয়েছে। সেখানে ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনে বিবাদী দুই ভাই সাহাব উদ্দিন আকন্দ ও এনামুল হক আকন্দের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। মামলা চলাকালে মারা যাওয়ায় ১ নম্বর বিবাদী জামাল উদ্দিনকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়।
১৯ জুলাই সরেজমিন দেখা যায়, প্লটটি ইটের দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ভেতরে ‘আকন্দ অ্যাগ্রো ফার্ম’ নামে গরুর খামার গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আগে প্লটটির চারপাশে টিনের বেড়া ছিল। দখলের পর সেখানে ইটের দেয়াল তোলা হয়।
মারা যাওয়া জামাল উদ্দিনের ছেলে রাজীব উদ্দিন আকন্দ নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক। সাহাব ও এনামুল তাঁর চাচা।
চাচাদের সঙ্গে আমার দূরত্ব আছে। আমি ওই প্লটটিতে কখনো যাইনি। এ বিষয়ে কিছুই জানা নেই।রাজীব উদ্দিন আকন্দ, নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজীবের প্রভাবেই তাঁর পরিবারের সদস্যরা প্লটটির দখল নেন। তবে ভয়ের কথা জানিয়ে আশপাশের বাসিন্দাদের কেউ নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
ভয়ে নিজের কেনা জায়গায় যেতে পারি না। পুলিশ তদন্ত করে প্লটটি দখলের প্রতিবেদন দিয়েছে। তারপরও এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নিপ্লটটির মালিক শফিউল বারী
তবে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পরিবারের সদস্যদের প্লটটি দখলে সহায়তা করার অভিযোগ অস্বীকার করেন রাজীব উদ্দিন আকন্দ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘চাচাদের সঙ্গে আমার দূরত্ব আছে। আমি ওই প্লটটিতে কখনো যাইনি। এ বিষয়ে কিছুই জানা নেই।’ এই রাজীবও যুবদল নেতা দীপ্তির অনুসারী হিসেবে পরিচিত বলে স্থানীয় সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে।
প্লটটির মালিক শফিউল বারী বর্তমানে ক্যানসারে আক্রান্ত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভয়ে নিজের কেনা জায়গায় যেতে পারি না। পুলিশ তদন্ত করে প্লটটি দখলের প্রতিবেদন দিয়েছে। তারপরও এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি।’
সরকারি জমি দখল নিয়ে গোলাগুলি
নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। তিনি চাঁদাবাজি, মাদক, বিস্ফোরকসহ বিভিন্ন অভিযোগে করা ১৭টি মামলার আসামি। পাহাড়তলী, আকবর শাহ ও খুলশী থানা এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, তাঁর বাহিনীর চাঁদাবাজি, জমি দখল ও অস্ত্রবাজিতে তাঁরা অতিষ্ঠ।
সরকারি জায়গার দখল নিয়ে প্রকাশ্যে গোলাগুলির ঘটনার পর ৮ জুন তাঁকে স্বেচ্ছাসেবক দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
পুলিশ জানায়, খুলশী ও আকবর শাহ থানার সীমান্তবর্তী ফয়’স লেক এলাকায় সরকারি জায়গার দখল নিয়ে ৫ জুন রাতে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। এতে আটজন আহত হন এবং দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জায়গাটি ওয়াকিল দখলে নেন বলে অভিযোগ। সম্প্রতি সেখানে নজর পড়ে আকবর শাহ থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রাজিবের। ৫ জুন তাঁর পক্ষ জায়গাটি দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলে দুই পক্ষের সংঘর্ষ শুরু হয়।
ওয়াকিলের বিরুদ্ধে চাঁদা না পেয়ে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগও রয়েছে। খুলশীর ডিসিপুল আবাসিক এলাকার বাসিন্দা শেখ মো. আরিফের তিনটি প্লট ও কয়েকটি ভাড়া ঘর রয়েছে। আরিফের অভিযোগ, ওয়াকিল তাঁর কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না দেওয়ায় গত ২৭ এপ্রিল লোকজন নিয়ে তাঁর সম্পত্তিতে ভাঙচুর চালানো হয়। এ ঘটনায় ওয়াকিল ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় মামলা করেছেন আরিফ।
স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, ওয়াকিলের নেতৃত্বে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল, কিশোর গ্যাং পরিচালনা এবং লোকজন জড়ো করে ‘মব’ তৈরির মতো কর্মকাণ্ড চলছে। এসব কাজে অন্তত এক ডজন সহযোগী তাঁর সঙ্গে সক্রিয় রয়েছেন। যার কারণে এলাকার লোকজন ওয়াকিলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস করেন না।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঝাউতলা ও ঝিলপাড়ের বস্তিতে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসায় জড়িত ব্যক্তিদের অনেকে এখন ওয়াকিলের দলে যুক্ত হচ্ছেন। আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের সময় জালালাবাদ, কৃষ্ণচূড়া, জমির হাউজিং ও ওয়্যারলেস ঝাউতলা এলাকায় বাড়ি নির্মাণ করতে গেলে যুবলীগের পরিচয়ে কামাল উদ্দিন ওরফে কাঁচি কামাল চাঁদা দাবি করতেন বলে অভিযোগ ছিল। দুই বছর ধরে তিনি ওয়াকিলের আশ্রয়ে ছিলেন বলে স্থানীয় ব্যক্তিদের দাবি। ৪ জুন কামালকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ, ওয়াকিলের নেতৃত্বে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, জমি দখল, কিশোর গ্যাং পরিচালনা এবং লোকজন জড়ো করে ‘মব’ তৈরির মতো কর্মকাণ্ড চলছে। এসব কাজে অন্তত এক ডজন সহযোগী তাঁর সঙ্গে সক্রিয় রয়েছেন। যার কারণে এলাকার লোকজন ওয়াকিলের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিছু বলতে সাহস করেন না।
তবে ওয়াকিল হোসেন দাবি, তিনি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘লোকজন এসে কিছু বললে তাদের সাহায্য করি। কিন্তু কারও জায়গা দখল করিনি। দল কেন বহিষ্কার করেছে জানি না।’
এক দখলে জিম্মি ১৫০ পরিবার
বাকলিয়া ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি নবাব খানের বিরুদ্ধে নগরের বাকলিয়া তুলাতলী এলাকায় সড়কসংলগ্ন একটি খাসজমি দখলের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ওই জমি দখল করে চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ১৫০টি পরিবার দুর্ভোগে পড়েছে। এখন কাদা ও ময়লাপানি মাড়িয়ে পেছনের পথ দিয়ে কল্পলোক আবাসিক এলাকা হয়ে তাদের যাতায়াত করতে হচ্ছে।
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের পাশের জমিটি দখল করে সেখানে এখন ঝুট রাখা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাদকসেবীরা সেখানে নিয়মিত আড্ডা দেন। ঝুটে বেশ কয়েকবার আগুনও লেগেছে। সময়মতো আগুন নেভানো না হলে আশপাশের বসতঘরও পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। বারবার বলার পরও সেগুলো সরানো হচ্ছে না।
২০১৯ সালে জমি কেনার পর ২০২২ সালে বাড়ি করি। তখন জানতাম বাড়ির সামনের সড়ক–সংলগ্ন চলাচলের জায়গাটি খাসজমি।স্থানীয় বাসিন্দা হাফেজ মোহাম্মদ ইসকান্দার
জমি দখল ও বাসিন্দাদের চলাচলের পথ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নবাব খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি কিছু বলব না, যা পারেন লিখে দেন।’
তবে ওই এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা খাসজমি হিসেবে সড়ক–সংলগ্ন জমিটি ব্যবহার করেছেন। ৫ আগস্টের পর হঠাৎ সেটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। দিনমজুর জাফর আহমদ প্রায় ৪০ বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন। তাঁর অভিযোগ, নবাব খান ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে মানুষের বহু বছরের চলাচলের জায়গাটি বন্ধ করে দেন।
স্থানীয় বাসিন্দা হাফেজ মোহাম্মদ ইসকান্দার প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০১৯ সালে জমি কেনার পর ২০২২ সালে বাড়ি করি। তখন জানতাম বাড়ির সামনের সড়ক–সংলগ্ন চলাচলের জায়গাটি খাসজমি।’ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নবাব খান দাবি করেন, জায়গাটি তাঁর। পরে চলাচলের জন্য তাঁর থেকে জায়গা কিনে নেন।
ঘাটগুলো ঘিরে এখনো চাঁদাবাজি
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চট্টগ্রাম নগরের ঘাটগুলো থেকে টাকা আদায়কারী মুখও বদলেছে। আগে আওয়ামী লীগের লোকজন এসব স্থান থেকে টাকা আদায় করতেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রথম আলোর প্রতিবেদকেরা বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে সেখানে নতুনভাবে বিএনপির দখল ও চাঁদাবাজির চিত্র দেখেছেন। সেসব জায়গা এখনো বিএনপির নেতা-কর্মীরাই নিয়ন্ত্রণ করছেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, করপোরেশনের আওতায় কর্ণফুলী নদী ও নগরের বড় খালগুলোতে ১৯টি ঘাট রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি ঘাট ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সাতটিতে উপযুক্ত দর পাওয়া যায়নি। বাকি ১০টি ঘাট ইজারা দেওয়া হয়েছে। দর না পাওয়া সাতটিসহ মোট নয়টি ঘাট খাস ইজারা দেওয়া হয়। এর একটি সল্টগোলা ঘাট।
কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পারের কর্ণফুলী ও আনোয়ারা উপজেলার বড় অংশের মানুষ নৌকায় চট্টগ্রাম নগরে যাতায়াত করেন। চট্টগ্রাম বন্দরের ৫ নম্বর গেটসংলগ্ন সল্টগোলা ঘাট থেকে কর্ণফুলী উপজেলার ডাঙ্গারচরে যাত্রী পারাপার করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, দুই বছরের বেশি সময় ধরে ঘাটটি ইজারা না দিয়ে খাস কালেকশনের নামে সরকারি রাজস্বের লাখ লাখ টাকা ভাগাভাগি করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, করপোরেশনের আওতায় কর্ণফুলী নদী ও নগরের বড় খালগুলোতে ১৯টি ঘাট রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি ঘাট ইজারা দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়। সাতটিতে উপযুক্ত দর পাওয়া যায়নি। বাকি ১০টি ঘাট ইজারা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সংস্কারের কথা বলে দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা না দিয়ে নামমাত্র মূল্যে দৈনিক ভিত্তিতে খাস কালেকশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আহাদ রিপন ও নগর ছাত্রদলের সাবেক ছাত্রকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক ওয়াহিদ ইমরান খানকে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রথমে আহাদ একাই ঘাটটির নিয়ন্ত্রণ নেন। পরে ভাগ বসান ওয়াহিদ। মাসের ১৫ দিন আবদুল আহাদ এবং বাকি ১৫ দিন ওয়াহিদের পক্ষের লোকজন ঘাট থেকে টাকা তোলেন।
আবদুল আহাদ রিপন প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘প্রতি বোটে (ইঞ্জিনচালিত নৌকা) ১০ থেকে ১২ জনের বেশি যাত্রী থাকে না; যা উঠে, করপোরেশন নিয়ে যায়। আমরা কোনো টাকা নিই না। ঘাটটি সংস্কার হবে, আমি দেখভালের দায়িত্বে আছি।’
ওয়াহিদ ইমরান খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর প্রতিনিধি ছাত্রদলের কর্মী মো. আলভীরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়। পরে মো. আলভী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিতে হয়। মাত্র ১৫ দিন আমাদের হাতে। মেয়র সাহেব আমাদের দিয়েছেন। ওনার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।’
আবদুল আহাদ ও ওয়াহিদ—দুজনই নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র শাহাদাত হোসেনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।
প্রতি বোটে (ইঞ্জিনচালিত নৌকা) ১০ থেকে ১২ জনের বেশি যাত্রী থাকে না; যা উঠে, করপোরেশন নিয়ে যায়। আমরা কোনো টাকা নিই না। ঘাটটি সংস্কার হবে, আমি দেখভালের দায়িত্বে আছি।নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবদুল আহাদ রিপন
গত ২০ মে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামালের সই করা একটি চিঠিতে বলা হয়, ‘সল্টগোলা ঘাটের ইজারা না হওয়া পর্যন্ত রাজস্ব শাখার চেইনম্যান সিরাজ উদ্দিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই কাজে লোকবল, যাত্রী পারাপারে নৌকা, সাম্পান সরবরাহসহ অন্যান্য সহযোগিতার জন্য আবদুল আহাদ ও ওয়াহিদ ইমান খানকে সাময়িকভাবে নিয়োজিত করা হলো।’
সম্প্রতি সরেজমিনে ঘাটটিতে যাত্রী পারাপার দেখতে গেলে নুর মোহাম্মদ নামের এক যাত্রী প্রথম আলোকে বলেন, আগে ১০ টাকা নিলেও এখন জনপ্রতি ১৮ টাকা এবং মালপত্রের জন্য আলাদা টাকা নেওয়া হয়।
দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা এখানে চলাচল করে। যাত্রীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুটি নৌকা দৈনিক ৪০ বার যাতায়াত করে। প্রতিবার একটি বোটে গড়ে ৫০ জন যাত্রী থাকেন। জনপ্রতি ১৮ টাকা হিসাবে একবারে ওঠে ৯০০ টাকা। সে হিসাবে দৈনিক আদায় হয় প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। অথচ সিটি করপোরেশন পায় ছয় হাজার টাকা।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কয়েক দফা চেষ্টা করেও সিটি করপোরেশনের মেয়রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়নি।
জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, সল্টগোলা ঘাটটি সংস্কারের জন্য মেয়র মহোদয় (শাহাদাত হোসেন) দুজনকে দিয়েছেন। যদি তাঁরা সংস্কার না করে থাকেন, তাহলে চুক্তি বাতিল করা হবে।
দখল, চাঁদাবাজির অভিযোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তৎকালীন যুবদল নেতা এমদাদুল হক বাদশা চকবাজার, ডিসি রোড ও এক্সেস রোডসহ বাকলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ভয়ভীতি সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে গত বছরের ১২ জুলাই নগর যুবদলের বিলুপ্ত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক এমদাদুল হক বাদশাকে দল থেকে বহিষ্কার করে জাতীয়তাবাদী যুবদল।
কোনো দরপত্র ছাড়াই চকবাজার কাঁচাবাজার দখলে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বাদশার বিরুদ্ধে। একই এলাকায় গত বছরের ২৫ অক্টোবর গোলাগুলির ঘটনার পর নতুন করে আলোচনায় আসেন নজরুল ইসলাম ও বোরহান উদ্দিন।
স্থানীয় সূত্র জানায়, নজরুল পটিয়ার জঙ্গলখাইন ইউনিয়ন তাঁতী লীগের সভাপতি ছিলেন। বোরহান চকবাজার থানা ছাত্রদলের সাবেক সাহিত্য সম্পাদক।
পুলিশ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদাবাজি, অস্ত্র ও মাদকসংক্রান্ত আটটি করে মামলা রয়েছে দুজনের বিরুদ্ধে।
রেলে আতঙ্ক তৈরিতে ‘মব’ সৃষ্টি
ঢাকা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগ নিয়ে গঠিত পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে। রেলের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আগেও খুনোখুনি হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৪ জুন যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও ছাত্রলীগ নেতা সাইফুল আলম লিমনের অনুসারীদের সংঘর্ষে দুজন নিহত হন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রেলের ঠিকাদারি কাজে বিএনপির কিছু নেতার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জয়ের তিন দিনের মাথায় ১৬ ফেব্রুয়ারি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সিআরবি ভবনে অতিরিক্ত অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তার দপ্তরে শ্রমিক দলের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ গিয়ে ‘মব’ সৃষ্টি করে। একটি অনিয়মে ভরা অসংগতিপূর্ণ বিল ছাড়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মো. সাইদুর রহমানকে হুমকি দেন। এমনকি কর্মকর্তাকে ‘দেখে নেওয়া’ ও প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি করার হুমকি দেওয়া হয়।
অভিযুক্ত শ্রমিক দলের নেতা মোমিনুল ইসলাম (মামুন) অবশ্য প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, শ্রমিকদের বিল আটকে রাখায় তিনি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন। কিন্তু কর্মকর্তারা সেই বিল ছাড় না দেওয়ায় প্রতিবাদ করেছেন।
ঠিকাদারেরা হুমকিতে, ভয়ে কথা বলেন না
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর সিআরবি এবং পাহাড়তলী কারখানা ঘিরে দরপত্র নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগও ৫ আগস্ট-পরবর্তী চট্টগ্রামের বড় ঘটনা। অভিযোগের কেন্দ্রে আছেন শ্রমিক দলের নেতা এম আর মঞ্জুর, পেয়ার আহমেদসহ নগর যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তির ঘনিষ্ঠজনদের অনেকে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ঠিকাদারদের অনেকের অভিযোগ, পছন্দের ঠিকাদার ছাড়া অন্যদের কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
রেলের প্রথম শ্রেণির ঠিকাদার ও বাংলাদেশ কাভার্ড ভ্যান, ট্রাক, প্রাইমমুভার পণ্য পরিবহন মালিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব চৌধুরী জাফর আহম্মদ প্রথম আলোকে বলেন, বিএনপির অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতা-কর্মী আওয়ামী লীগ আমলেও নির্বিঘ্নে রেলে ঠিকাদারি করেছেন। এখন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে তাঁরা পছন্দের লোক ছাড়া অন্যদের রেলে যেতে দিচ্ছেন না। তাঁকে ছয় মাস রেল অঙ্গনে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই এখন রেলে যাচ্ছেন না। অন্য ব্যবসায়ীদের অনেকের সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে।
গত ৩০ জুন পাহাড়তলীতে প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে দোহাজারী রেললাইনের একটি কাজের দরপত্র জমা দিতে গিয়ে হামলার শিকার হন তুশি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কার্তিক রঞ্জন শীল।
আমি রেলে ঠিকাদারি করি। কিন্তু কাউকে হুমকি কিংবা মারধর করিনি।যুবদল নেতা রাসেল খান
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, যুবদল নেতা রাসেল খান কার্তিক রঞ্জনকে মারধর করেন। পরে পানির কল এলাকায় সাত-আটজনের একটি দল তাঁর ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা করে।
তবে ঠিকাদারকে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেন রাসেল খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি রেলে ঠিকাদারি করি। কিন্তু কাউকে হুমকি কিংবা মারধর করিনি।’
তবে হামলার ঘটনার পর কার্তিক রঞ্জন চট্টগ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে যান, আর ফেরেননি। তিনি থানায় জিডি বা মামলা করেননি। হামলার বিষয়ে কার্তিকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সবাই জানে, আমি কিছু বলব না।’
কার্তিকের মতো গত বছরের জুনে মো. হুমায়ুন নামের আরেক ঠিকাদারকে মারধর করা হয়েছিল। তিনিও থানা-পুলিশ পর্যন্ত যাননি। এই বিষয়ে ঠিকাদার হুমায়ুন প্রথম আলোর সঙ্গে কোনো কথা বলতেও রাজি হননি।
কার্তিক ও হুমায়ুনের মতো আরও পাঁচজন ঠিকাদারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে প্রথম আলো। তাঁরা হুমকি, হামলা বা ভয়ভীতির কথা বললেও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি। তাঁদের ভাষ্য, প্রতিবাদ করলে কাজ তো বন্ধ হবেই, উল্টো পরিবার নিয়ে বিপদে পড়তে হবে।
চট্টগ্রাম নগরের লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। শহীদ ওয়াসিম আকরাম ফ্লাইওভার নামে পরিচিত এই এক্সপ্রেসওয়ের লালখান বাজার থেকে আগ্রাবাদ মোড় পর্যন্ত নিচের অংশে ৫০টি প্যানাফ্লেক্স বা আলোকিত সাইনবোর্ড স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে সিটি করপোরেশন।
গত বছরের ২৭ অক্টোবর এ নিয়ে যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশাররফ হোসেন দীপ্তির স্ত্রী নিহার সুলতানার প্রতিষ্ঠান জেএম পাবলিসিটির সঙ্গে চুক্তি হয়। অথচ এই এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজই এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। এর মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিটি করপোরেশন চুক্তি করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সিডিএ। ছাত্ররাও এ নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ জানান।
পরে এই চুক্তি বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সচিব ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন।
মোশাররফ হোসেন দীপ্তি প্রথম আলোকে বলেন, গত দুই বছরে তিনি কোনো সরকারি দপ্তরের দরপত্রে অংশ নেননি কিংবা কোনো কাজও করেননি।
তবে স্ত্রীর প্রতিষ্ঠান জেএম পাবলিসিটির বিজ্ঞাপনী ব্যবসার সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘এটি আমার পুরোনো ব্যবসা। সিটি করপোরেশন থেকে বৈধভাবে লাইসেন্স নিয়ে এবং এক বছরের রাজস্ব ও কর অগ্রিম পরিশোধ করে ব্যবসা করছি। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি।’
জুবায়ের ও জিহাদ হত্যার ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে দীপ্তি বলেন, এসব ঘটনাকে দলীয় কোন্দল বলা হচ্ছে, কিন্তু চট্টগ্রাম বিএনপিতে তেমন বড় কোনো অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কথা তাঁর জানা নেই। এগুলো সামাজিক অপরাধ হতে পারে। শরীফুল আলম তুহিন, নুর আলম সোহাগ, ইসমাইল সরকার ও রাজীব উদ্দিন আকন্দ রাজনৈতিক সহকর্মী। তবে অনুসারী বলা ঠিক হবে না। তাঁকে মীর হেলালের অনুসারী হিসেবে বলাটাও সঠিক হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম বিএনপিতে নতুন সমীকরণ
একসময় চট্টগ্রামে বিএনপির রাজনীতি সাবেক মন্ত্রী প্রয়াত আবদুল্লাহ আল নোমান, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনকে ঘিরে আবর্তিত হতো।
দলীয় নেতা-কর্মীদের মতে, আমির খসরুর প্রভাব এখনো থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে মীর নাছিরের ছেলে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এখানকার রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন।
দলীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা এবং ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও কৃষক দলের কমিটিতে মীর হেলালের অনুসারীদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে।
দলের এক জ্যেষ্ঠ নেতার ভাষ্য, তৃণমূল ও কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে মীর হেলাল চট্টগ্রামের মাঠের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্থানীয় বিভিন্ন খাতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ‘কার লোক’ পরিচয়টি গুরুত্বপূর্ণভাবে কাজ করে।
দলীয় নেতা-কর্মীদের মতে, আমির খসরুর প্রভাব এখনো থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে মীর নাছিরের ছেলে বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এখানকার রাজনীতির অন্যতম নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছেন।
ঘুরেফিরে মীর হেলালের অনুসারীদের নাম
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর চট্টগ্রামে রাজনৈতিক পরিচয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও প্রভাব খাটানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত নাম যুবদল নেতা দীপ্তি। তিনি ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীনের অনুসারী হিসেবে এলাকায় বহুল পরিচিত।
মীর হেলারের সঙ্গে চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের ছবিও রয়েছে। বিএনপির একাধিক কর্মসূচিতেও সাজ্জাদকে অংশ নিতে দেখা গেছে।
সন্ত্রাসী সাজ্জাদের গ্রুপকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ গুরুতরভাবে সামনে আসে গত বছরের ৫ নভেম্বর বিএনপির নির্বাচনী গণসংযোগে অংশ নেওয়া সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা হত্যার পর। বায়েজীদের চালিতাতলী এলাকায় বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর গণসংযোগে বাবলাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই মামলায় বড় সাজ্জাদ, ছোট সাজ্জাদ ও তাঁদের অনুসারীদের আসামি করা হয়েছে।
নিহত বাবলার ছোট ভাই আজিজ উদ্দিন তাঁর ভাই হত্যায় ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন জড়িত বলে অভিযোগ করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাইকে মারার পেছনে মীর হেলালের হাত রয়েছে। এটি ঘটনার পরও বলেছি, এখনো বলছি।’
মীর হেলাল কেন মারবেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে আজিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমার ভাই বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর রাজনীতি করতেন। মীর হেলাল বিষয়টি ভালোভাবে নেননি।’
এই বিষয়ে মীর হেলালের বক্তব্য জানতে চেষ্টা করেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা যায়নি।
বহিষ্কারেই দায় শেষ
গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিভিন্ন অভিযোগে নেতা-কর্মীদের বহিষ্কার করেছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম প্রথম আলোকে বলেন, চাঁদাবাজি, জায়গা দখল, সংঘর্ষে জড়ানোসহ নানা অভিযোগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে নগর ও জেলা বিএনপির ৬০ জনের বেশি নেতা-কর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। পরে কারও কারও বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহিষ্কারের পরও একই খাতে দখল-চাঁদাবাজির অভিযোগ থামেনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগরের সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ৫ আগস্টের পর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা ব্যাপকভাবে দখল ও চাঁদাবাজিতে জড়ান। মাঠ, ঘাট, টোল, বালুমহাল—সব জায়গায় কর্তৃত্ববাদী আমলের নিয়ন্ত্রকদের সরিয়ে নতুন মুখ এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক মাফিয়া, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ও প্রশাসনিক যোগাযোগ মিলেই এসব নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন নির্বাচিত সরকার এসব থামাতে না পারলে চট্টগ্রামের মানুষের স্বস্তি ফিরবে না।