সুপারি বাগানের ভেতরে লাকিংমে চাকমার পরিবারের ঝুঁপড়ি টংঘর। গত বুধবার কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ শিলখালী এলাকায়
সুপারি বাগানের ভেতরে লাকিংমে চাকমার পরিবারের ঝুঁপড়ি টংঘর। গত বুধবার কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ শিলখালী এলাকায়প্রথম আলো

১৫ বছরের কিশোরী মেয়ে লাকিংমে চাকমার কথা মনে আছে? যার শেষকৃত্যানুষ্ঠান নিয়ে লাশের দাবিদার দুই পরিবারের মধ্যে টানাটানিতে মরদেহটি টানা ২৫ দিন পড়েছিল কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে। লাকিংমের অপহরণকারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু স্বস্তিতে নেই তাঁর পরিবার। শোক সামলে ওঠার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে পরিবারটি। কয়েকটি টিন আর ছনের ছাউনিযুক্ত জরাজীর্ণ ঘরে চলছে দরিদ্র জেলে পরিবারটির মানবেতর জীবন।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা লাকিংমের পরিবারের নিরাপদে বসবাসের উপযোগী একটি বাড়ি নির্মাণ করে দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পাশাপাশি লাকিংমের অপহরণকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি করেছেন তাঁরা।

default-image

কক্সবাজার শহর থেকে ৭১ কিলোমিটার দক্ষিণে টেকনাফ উপজেলার সমুদ্র উপকূলীয় ইউনিয়ন বাহারছড়া। ইউনিয়নের দক্ষিণ শিলখালী এলাকার চাকমাপল্লিতে ৭০টি পরিবারের সাড়ে ৩০০ জন চাকমার বসতি। গ্রামের লোকজন জীবিকা নির্বাহ করেন সমুদ্রে মাছ আহরণ ও পাহাড়ে জুমচাষ করে। গ্রামের পাশের মটকামুরা নামের একটি পাহাড়ের পাদদেশে আলোচিত সেই লাকিংমে চাকমার বাবা লালা অং চাকমার জরাজীর্ণ টংঘর।

গত বুধবার সরেজমিনে দেখা যায়, সুপারিবাগানের ভেতরে ঝুপড়িটি দাঁড়িয়ে আছে। ঘরটির সামনের অংশের চালাটা কয়েকটি টিন দিয়ে ঢাকা। অবশিষ্ট ছাউনি ছন ও খড়ের তৈরি। ঘরের চারদিকে ছেঁড়া পলিথিন ও বাঁশের বেড়া। সেখান দিয়ে শীতের ঠান্ডা হাওয়া ঘরের ভেতরে অনায়াসে ঢুকে পড়ে। তখন কারও চোখে ঘুম আর আসে না। বর্ষায় চালা দিয়ে পড়া বৃষ্টির পানিতে সয়লাব হয় ঘর। অবস্থা এমন, কয়েক মিনিট ঝোড়ো হাওয়া হলেই বা সামান্য ঝড়–বৃষ্টিতে ঘরটি ধসে পড়তে পারে।

কয়েক বছর ধরে ঘরটির সংস্কারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন লালা অং চাকমা। কিন্তু সামর্থ্যে কুলোয় না। সামনে আরও বড় বিপদ বর্ষা। এ সময় স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে কোথায় যাবেন, ভেবে পাচ্ছেন না তিনি। পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিন মেয়ে, দুই ছেলে। লাকিংমে ছিল দ্বিতীয় মেয়ে। স্থানীয় বাহারছড়া শামলাপুর উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ত সে। লেখাপড়া শিখিয়ে লাকিংমেকে মানুষ করার ইচ্ছা ছিল বাবার। কিন্তু অপহরণকারীরা সে ইচ্ছা পূরণ হতে দিল না।

বিজ্ঞাপন

বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে অপহরণ, ধর্মান্তর, বিয়ে ও মৃত্যু

পরিবারের অভিযোগ, ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যায় স্থানীয় যুবক আতাউল্লাহর নেতৃত্বে কয়েকজন বাড়ি থেকে লাকিংমেকে অপহরণ করেন। এরপর কুমিল্লায় নিয়ে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে লাকিংমেকে বিয়ে করেন আতাউল্লাহ। লাকিংমের নাম রাখা হয় হালিমাতুল সাদিয়া। আতাউল্লাহর বাড়ি বাহারছড়া ইউনিয়নেরই মাথাভাঙ্গা গ্রামে। তাঁর বাবার নাম নুর আহমদ। বিয়ের আগে আতাউল্লাহ কুমিল্লার একটি গ্যারেজে চাকরি করতেন। পরে টেকনাফ বাসস্টেশনের রমজান আলী মার্কেটের রহমানিয়া থাই ফ্যাশন নামের একটি দোকানে চাকরি নেন। এখন তিনি আত্মগোপনে। আতাউল্লাহর বাড়ি থেকে লাকিংমের বাড়ির দূরত্ব প্রায় সাত কিলোমিটার।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২০ সালের ৯ ডিসেম্বর আতাউল্লাহর বাহারছড়ার বাড়িতে নিহত হন লাকিংমে। আতাউল্লাহ তখন প্রথম আলোকে বলেছিলেন, বিউটি পারলারে যাওয়া নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে ঘরে গিয়ে সাদিয়া (লাকিংমে) বিষ পান করে। মারা যাওয়ার ১২ দিন আগে লাকিংমে একটি মেয়েসন্তানের জন্ম দিয়েছিল। মেয়েটির বয়স এখন তিন মাস। আতাউল্লাহর এক বোন মেয়েটিকে লালন-পালন করছেন।

মৃত্যুর পর লাকিংমের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতালের হিমঘরে পড়ে ছিল টানা ২৫ দিন। স্বামী আতাউল্লাহর দাবি ছিল, সাদিয়া (লাকিংমে) তাঁর স্ত্রী। বিয়ের আগে লাকিংমে ধর্মান্তরিত হন। ইসলামি শরিয়ামতেই সাদিয়ার দাফন হবে।
অন্যদিকে বাবা লালা অং চাকমার দাবি ছিল, তাঁর কিশোরী মেয়ে লাকিংমেকে অপহরণ করেন আতাউল্লাহর নেতৃত্বে কয়েকজন। এরপর জোরপূর্বক বাল্যবিবাহের পর পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয় মেয়েকে। মেয়ের শেষকৃত্যানুষ্ঠান তাঁদের ধর্মীয় রীতিতেই হবে।

দুই পরিবারের এই টানাটানিতে দীর্ঘ ২৫ দিন হিমঘরে পড়েছিল লাকিংমের মরদেহ। এ সময় লাকিংমের পরিবারের পাশে দাঁড়ায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রসহ একাধিক মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠন। লাকিংমের বাবা লালা অং চাকমা (৫২) প্রথম আলোকে বলেন, অপহরণের ১১ মাস পর গত ৯ ডিসেম্বর তিনি জানতে পারেন, মেয়ের (লাকিংমে) মরদেহ মর্গে পড়ে আছে। তিনি লাশ নিতে গিয়ে জানতে পারেন, অপহরণ, নাবালিকা বিয়ে ও জোরপূর্বক ধর্মান্তরে বাধ্য করার অভিযোগে যে আতাউল্লাহর বিরুদ্ধে তিনি মামলা করেছিলেন, সেই আতাউল্লাহ নিজেকে স্বামী দাবি করে লাশ নেওয়ার আবেদন করেছেন কক্সবাজারের একটি আদালতে।

আদালত নিহত কিশোরীর ধর্মান্তরিত এবং অপহরণের ঘটনা তদন্ত করে শেষকৃত্যানুষ্ঠান সম্পন্ন করার দায়িত্ব দেন র‍্যাব-১৫ কক্সবাজারকে। গত ৪ জানুয়ারি হিমঘর থেকে লাকিংমের মরদেহ মা–বাবার হাতে হস্তান্তর করে র‍্যাব। ওই দিন বিকেলে র‍্যাবের উপস্থিতিতে রামু উপজেলার জাদিমুড়া কেন্দ্রীয় বৌদ্ধ মহাশ্মশানে লাকিংমে চাকমাকে সমাহিত করা হয়। এখন পর্যন্ত লাকিংমের অপহরণকারীরা আছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

র‍্যাব-১৫ কক্সবাজারের অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, ‘বিজ্ঞ আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য আমাদের দিয়েছেন। নিহত কিশোরীর বয়স নির্ধারণসহ বিয়ের যাবতীয় তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। শিগগিরই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’

ঝুপড়িঘরের মানবেতর জীবন

ঝুপড়িঘরটির সামনে বঙ্গোপসাগর, পেছনে বিশাল পাহাড়। সমুদ্রে মাছ আহরণ আর পাহাড়ে জুমচাষ করে কোনোরকমে চলে লালা অং চাকমার টানাপোড়েনের সংসার। দুপুরে টংঘরের খোলা বারান্দায় বসে ছিলেন লাকিংমের মা কোচিং চাকমা (৪০)। মেয়ের কথা উঠতেই তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, মরেও মেয়েটা শান্তি পেল না। অপহরণকারীরা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সবকিছু চেয়ে দেখা ছাড়া তাঁদের কিছু করার সামর্থ্য নেই।

পাশেই দাঁড়ানো লাকিংমের বড় বোন উক্য মে চাকমা (১৮) বলেন, বাবার আয়–রোজগার তেমন নেই। খেয়ে না খেয়ে চলছে টানাপোড়েনের সংসার। লাকিংমের মৃত্যুর পর বাবা একেবারে ভেঙে পড়েছেন। কাজকর্মেও আগ্রহ-মনোবল হারিয়ে ফেলেছেন। মাও অসুস্থ। এ অবস্থায় আসন্ন বর্ষার কয়েক মাস কীভাবে কাটবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। ভাঙা ঝুপড়িঘরে নিরাপদে থাকা নিয়ে তাঁরা সবাই উদ্বিগ্ন।

default-image

চাকমা স্টুডেন্ট ফোরামের সভাপতি প্রদীপ চাকমা বলেন, লাকিংমে চাকমার পরিবারে চলছে খুব কষ্টের জীবনযাপন। অনেকে এসে আর্থিক কিছু সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের নিরাপদে বসবাসের একটি বাড়ি দরকার। লাকিংমের ভাই–বোনের পড়াশোনাও দরকার। এ ব্যাপারে তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর সহায়তা চান।

আদিবাসী ফোরাম কক্সবাজারের সহসভাপতি ক্য জ্য অং বলেন, ‘লাকিংমেকে সন্ধ্যায় বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ধর্মান্তরিত করে জোরপূর্বক বাল্যবিবাহ এবং পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই আমরা। পাশাপাশি লাকিংমের পরিবারের নিরাপত্তা এবং নিরাপদে বসবাসের নিশ্চয়তাও চাই।’

বিজ্ঞাপন

ঢাকা থেকে লাকিংমের বাড়িতে প্রতিনিধিদল

২২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে লাকিংমে চাকমার বাড়িতে যায় ঢাকা থেকে আসা মানবাধিকার, নাগরিক সংগঠনগুলোর ১৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস। দলে ছিলেন নাগরিক উদ্যোগের নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের আমিনুর রসুল, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের উপপরিচালক মুজিব মেহেদী, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য ও প্রচার সম্পাদক দীপায়ন খীসা, আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সভাপতি সুলভ চাকমা, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের প্রকল্প ব্যবস্থাপক সাহিদা পারভিন প্রমুখ।

পরদিন প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মামলার তদন্তকারী সংস্থা র‍্যাব, জেলা পুলিশ সুপার মো. হাসানুজ্জামান এবং জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশীদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন।

default-image

রোবায়েত ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, ‘খুবই নাজুক পরিস্থিতিতে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে লাকিংমের পরিবার। জরাজীর্ণ ঘরটি সামান্য ঝোড়ো হাওয়াতেই ধসে পড়তে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের অসহায়-ভূমিহীন হাজার হাজার পরিবারকে পাকা ঘরবাড়ি দিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিয়েছেন। লাকিংমের পরিবারকেও এ রকম একটা ঘর তৈরি করে দেওয়া কোনো ব্যাপার নয়। এ ব্যাপারে আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। জেলা প্রশাসকও আশ্বাস দিয়েছেন। লাকিংমের পরিবার সরকারি সহায়তায় একটি বাড়ি পাওয়ার অধিকার রাখে।’

প্রতিনিধিদলটি লাকিংমের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এবং সংসারের খোঁজখবর নেয়। এ সময় পরিবারটিকে কিছু অর্থসহায়তা দেওয়া হয়। লাকিংমের ভাই-বোনদের পড়াশোনার খরচ জোগানোর আশ্বাসও দেওয়া হয়।

রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘অপহরণ, জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ ও বাল্যবিবাহ এবং অপরিণত বয়সে সন্তান জন্মদানে বাধ্য করে মৃত্যুর শিকারে পরিণত করা লাকিংমের জন্য আমরাও ন্যায়বিচার চাই। তদন্তকারী সংস্থা র‍্যাব কর্মকর্তারা আমাদের বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব তাঁরা তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবেন। লাকিংমের পরিবার ন্যায়বিচার পাক, এটা সবার চাওয়া।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন