নিহত বুলবুল নরসিংদী সদর উপজেলার চিনিশপুর ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের মৃত ওয়াহাব মিয়ার ছেলে। তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহপরান হলের ২১৮ নম্বর কক্ষে। বুলবুল চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন। বাবা ওয়াহাব মিয়া আট মাস আগে মারা যান। এর পর থেকেই পরিবারটির আশা-ভরসা ছিলেন বুলবুল। তাঁর বড় ভাই জাকারিয়া আহমেদ একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন।

default-image

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে জেএসসি পাস করেন বুলবুল। এরপর শহরের সাটিরপাড়া কে কে ইনস্টিটিউশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পাস করেন। আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজ থেকে ২০১৮ সালে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। পরে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান।

একাধিক সরু গলি পেরিয়ে ওই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পাশাপাশি দুটি টিনশেড ঘর। এক ঘরে বুলবুলের মা ইয়াসমিন বেগম, অন্য ঘরে তাঁর বড় বোন সোহাগী আক্তার আহাজারি করছেন। পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে বাড়িটিতে এসেছেন স্বজন, এলাকাবাসী, সহপাঠীসহ শতাধিক মানুষ।

নিহত বুলবুলের মা ইয়াসমিন বেগম বলেন, ‘কলেজে পড়ার সময়ই বুলবুলের সঙ্গে তার এক সহপাঠীর প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ওই মেয়েকে পড়াশোনা শেষে আমরা ঘরের বউ করে আনার পরিকল্পনা করছিলাম। অন্যদিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়ুয়া একটি মেয়ে বুলবুলকে পছন্দ করতে শুরু করে। কিন্তু এক ছেলে ওই মেয়েকে পছন্দ করত। গতকাল সকালে বুলবুলের একটা পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর ওই মেয়ে কথা আছে বলে বুলবুলকে ডেকে নিয়ে যায়। ওই সময়ই তার সঙ্গে আমার সর্বশেষ কথা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে ওই মেয়ের সঙ্গে কথাবার্তার মধ্যেই বুলবুলকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে।’

default-image

ইয়াসমিন বেগম আরও বলেন, ‘আমরা মা-ছেলে বন্ধুর মতো ছিলাম, তাই সে সবকিছু আমার কাছে বলত। কিছুই লুকাত না। গত ঈদে বাড়িতে এসে আমাকে জানিয়েছিল, নেত্রকোনা থেকে দুইটা ছেলেমেয়ে এসে ভর্তি হয়েছে। তাদের মধ্যে নাকি সম্পর্ক আছে। ছেলেটা খুব চাইলেও মেয়েটা এ সম্পর্কে জড়াতে চায় না। অন্যদিকে ওই মেয়ে পছন্দ করে বুলবুলকে, কিন্তু তার তো সম্পর্ক আছে আরেকজনের সঙ্গে। বিষয়টি তাকে বারবার বোঝাতে চাইলেও মেয়েটি বুঝতে চাইত না। আমার ধারণা, প্রেমিককে ছেড়ে বুলবুলকে পছন্দ করার বিষয়টি মেনে নিতে না পারায় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া মেয়েটি ফেসবুকে দেখে আমাকে কল দিয়ে বুলবুলের মৃত্যুর খবর জানায়।’

ইয়াসমিন বেগম বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, কোনো ছিনতাইকারী আমার ছেলেকে হত্যা করেনি। বরং হত্যাকাণ্ডের এ ঘটনাকে অন্যদিকে ধাবিত করতে এসব বলা হচ্ছে। ওই মেয়ে যেহেতু ঘটনার সময় উপস্থিত ছিল, সে হয়তো সব বলতে পারবে। তার চোখের সামনে হত্যার ঘটনা ঘটায় সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে শুনেছি। তার কাছ থেকেই সবকিছু জানা সম্ভব হবে বলে আমি মনে করি। আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাই, আমার হীরার টুকরা ছেলেকে যে বা যারা হত্যা করেছে, তাদের চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।’

নিহত বুলবুলের বড় বোন সোহাগী আক্তার বলেন, ‘আমার ছোট ভাই বুলবুল ছিল একটা হীরার টুকরা ছেলে। সে সব পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়েছিল। মেধাবী ছাত্র হওয়ায় বহু বৃত্তি পেয়েছে। বর্তমানেও কয়েকটি বৃত্তি চলমান ছিল তার। একটি প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে ১২ হাজার টাকা, আরেকটি প্রতিষ্ঠান থেকে ৩ মাস অন্তর ১৫ হাজার টাকা, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৬ হাজার টাকা করে বৃত্তি পেয়ে যাচ্ছিল সে। তার আরও যা খরচ ছিল, সেসব খরচ অনলাইনে কাপড় বেচে বহন করতাম আমি। আমাদের সবার স্বপ্ন ছিল, বুলবুল একজন বিসিএস ক্যাডার হয়ে আমাদের পরিবারের হাল ধরবে।’

এদিকে সোমবার রাতেই নিহত বুলবুলের বড় ভাই জাকারিয়া আহমেদ এলাকার কয়েকজনকে নিয়ে সিলেটে গেছেন। ময়নাতদন্ত শেষে নিহত ব্যক্তির লাশ পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁদের বুঝিয়ে দেওয়া হলে লাশ নিয়ে নরসিংদীর সদরের চিনিশপুরের নন্দীপাড়ার বাড়িতে ফিরবেন তাঁরা। পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, বুলবুলের লাশ মাধবদীর খড়িয়া এলাকায় বাবার কবরের পাশে দাফন করা হবে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন