রেলস্টেশনে হামলায় বৃদ্ধা নিহত হওয়ার মামলায় গ্রেপ্তার ৫ আসামি তিন দিনের রিমান্ডে

নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলায় নিহত ওয়াহিদা বেগমছবি: সংগৃহীত

নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলায় বাক্‌প্রতিবন্ধী নারী নিহত হওয়ার মামলায় গ্রেপ্তার পাঁচজনকে তিন দিন করে রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। আজ রোববার দুপুরের দিকে নরসিংদী আদালতে রিমান্ড শুনানি শেষে এ আদেশ দেন অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বেলাল হোসেন।

রেলস্টেশন এলাকার বাসিন্দারা নিহত ওই নারীকে ববি বেগম হিসেবে চিনলেও তাঁর আসল নাম ওয়াহিদা বেগম। ৪ জুলাই দিবাগত রাত দুইটার দিকে রেলস্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় তাঁকে মারধরের পর তাঁর দীর্ঘদিনের জমানো টাকা লুট করে একদল দুর্বৃত্ত। হামলায় তাঁর চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত লাগে। ৭ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে স্থানীয় লোকজন তাঁকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেন। পরে দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

আরও পড়ুন

রেলওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলা ও লুটের শিকার বাক্‌প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ ওয়াহিদা বেগম নিহত হওয়ার ঘটনায় ৬ জুলাই রাতে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে ভৈরব রেলওয়ে থানায় মামলা হয়। মামলাটি হামলা ও লুটের অভিযোগে করা হলেও ওয়াহিদা বেগম মারা যাওয়ার পর হত্যা মামলায় রূপান্তর করা হয়।

পরে গত বৃহস্পতিবার দিন ও রাতভর যৌথ অভিযান চালায় ভৈরব রেলওয়ে থানা–পুলিশ, নরসিংদীর র‍্যাব–১১ ও রেলওয়ে গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পরে রেলস্টেশনের আশপাশ থেকে তিনজন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলা থেকে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার পাঁচজন হলেন সাকিব মিয়া (২৩), ইলিয়াছ মিয়া (৩৫), বিল্লাল মিয়া (২৫), দ্বীন ইসলাম (২৬) ও রিফাত মিয়া (২০)।

আরও পড়ুন

এ তথ্য নিশ্চিত করে ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. সাঈদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, গ্রেপ্তার পাঁচজনকে আজ দুপুরে আদালতে তুলে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হয়েছিল। শুনানি শেষে আসামিদের তিন দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। আজ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে।

মেথিকান্দা রেলওয়ে পুলিশ স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই যুগ আগে এক দুপুরে এই স্টেশনে থামা একটি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন বাক্‌প্রতিবন্ধী ওয়াহিদা বেগম ওরফে ববি বেগম। এরপর আর কোথাও যাননি। রেলস্টেশনটির পরিত্যক্ত একটি কক্ষ ছিল তাঁর আশ্রয়। বিনা বেতনে প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া ও শৌচাগার পরিষ্কারসহ বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন তিনি। রেলস্টেশন ও আশপাশের মানুষসহ অনেক যাত্রী তাঁকে চিনতেন। কেউ খাবার দিতেন, কেউ ৫ থেকে ১০ টাকা দিয়ে সহযোগিতা করতেন। ওই টাকা খরচ না করে দুই যুগ ধরে জমিয়েছিলেন। সেই টাকাই কাল হয় তাঁর জন্য।

আরও পড়ুন

কোনো স্বজন না থাকায় প্রথমে ওই নারীর লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে স্থানীয় মানুষের অনুরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্টেশনসংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

ওই নারীর মৃত্যুর খবর ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরে গতকাল শনিবার দুপুরে তাঁর কবর জিয়ারত করতে আসেন দুই স্বজন। তাঁরা জানান, ওয়াহিদা বেগমের বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামে। তিনি মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মৃত আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে। তাঁর আট ভাই–বোনের মধ্যে সাতজনই বাক্‌প্রতিবন্ধী। এর মধ্যে ওয়াহিদাসহ তিনজন মারা গেছেন।

স্বজনেরা জানান, ওয়াহিদার বিয়ের দেড় বছরের মাথায় তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়। তাঁদের ঘরে জন্ম নেওয়া একমাত্র মেয়েটিও জন্মের পরপর মারা যায়। তখন খুব একা হয়ে গিয়েছিলেন ওয়াহিদা, বাবার বাড়িতেই থাকছিলেন। ২২ থেকে ২৩ বছর আগে এক ছোট বোনের সঙ্গে ঝগড়া করে ওয়াহিদা বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এর আগে প্রায় সময়ই তিনি রাগ করে অন্য বোনের বাড়ি যেতেন, আবার চলে আসতেন। কিন্তু সেদিনের ঝগড়ার পর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। তাঁকে কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিন বছর খোঁজাখুঁজির পর পরিবারের সদস্যরাও হাল ছেড়ে দেন। ফেসবুকে ভেসে বেড়ানো ছবি দেখে তাঁরা নিশ্চিত হন, তিনিই হারিয়ে যাওয়া ওয়াহিদা বেগম।