রেলস্টেশনে হামলায় নিহত ববি বেগমের পরিচয় জানা গেছে, বাড়ি বগুড়ায়

নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলায় নিহত বাক্‌প্রতিবন্ধীর ববি বেগমের প্রকৃত নাম ওয়াহিদা বেগমছবি: সংগৃহীত

নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলায় নিহত বাক্‌প্রতিবন্ধীর প্রকৃত পরিচয় এবং স্বজনের সন্ধান মিলেছে। ওই নারীর মৃত্যুর খবর ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পেরে আজ শনিবার দুপুরে তাঁর কবর জিয়ারত করতে আসেন দুই স্বজন। তাঁরা জানান, মানুষ ওই নারীকে ববি বেগম হিসেবে চিনলেও তাঁর নাম আসলে ওয়াহিদা বেগম।

ওয়াহিদার বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামে। তিনি মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মৃত আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে। স্থানীয় ইউপির সদস্য, প্রতিবেশী, বগুড়ার গাবতলী মডেল থানা ও ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রথম আলোকে একই পরিচয় নিশ্চিত করেন।

ববি বেগম নামে যাঁকে বলা হচ্ছে, তিনিই ওয়াহিদা বেগম। প্রায় দুই যুগ আগে স্বামী-সন্তানের মৃত্যুর পর ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি, পরে আর ফেরেননি। মা-বাবা, চার ভাই এবং চার বোনের মধ্যে এক ভাই ছাড়া সবাই বাক্‌প্রতিবন্ধী।
মো. রাকিব হোসেন, ওসি, গাবতলী মডেল থানা, বগুড়া

বগুড়ায় ওয়াহিদাদের প্রতিবেশী এনামুল হক প্রথম আলোকে জানান, দরিদ্র পরিবারটির সবাই বাক্প্রতিবন্ধী। ২৫ বছর আগে ওয়াহিদা নিখোঁজ হন। এরপর খোঁজখবর করেও তাঁর হদিস পায়নি পরিবার। এত দিন পরিবারসহ প্রতিবেশীরা জানতেন, ওয়াহিদা মারা গেছেন। নরসিংদীতে মেথিকান্দা রেলস্টেশনে হামলা ও লুটের শিকার হয়ে খুন হওয়ার পর বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর সেই ছবি দেখে স্বজন ও প্রতিবেশীরা ওয়াহিদাকে চিনতে পারেন।

স্থানীয় একটি মাদ্রাসার শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের নিয়ে ওয়াহিদা বেগমের কবর জিয়ারত করেন তাঁর দুই স্বজন (জিন্সের প্যান্ট পরা)। শনিবার দুপুরে নরসিংদীর মেথিকান্দা রেলস্টেশনের পাশে সামাজিক কবরস্থানে
ছবি: সংগৃহীত

গাবতলী মডেল থানার ওসি মো. রাকিব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘ববি বেগম নামে যাঁকে বলা হচ্ছে, তিনিই ওয়াহিদা বেগম। প্রায় দুই যুগ আগে স্বামী-সন্তানের মৃত্যুর পর ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন তিনি, পরে আর ফেরেননি। মা-বাবা, চার ভাই এবং চার বোনের মধ্যে এক ভাই ছাড়া সবাই বাক্‌প্রতিবন্ধী। তাঁর স্বজনেরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।’

৪ জুলাই রাত দুইটার দিকে মেথিকান্দা স্টেশনের পরিত্যক্ত এক কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা ওয়াহিদা বেগমকে মারধর করে দীর্ঘদিনের জমানো টাকা লুট করে নিয়ে যায় একদল দুর্বৃত্ত। হামলার সময় তাঁর চোখ, মুখ ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর আঘাত করা হয়। ৭ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে রাত সোয়া একটার দিকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

আরও পড়ুন

কোনো স্বজন না থাকায় প্রথমে ওই নারীর লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের কথা ভাবা হয়েছিল। তবে স্থানীয় মানুষের অনুরোধে প্রশাসন, পুলিশ ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় স্টেশন–সংলগ্ন সামাজিক কবরস্থানে তাঁর দাফনের ব্যবস্থা করা হয়। এ ঘটনায় মেথিকান্দা স্টেশনমাস্টারের দায়ের করা মামলায় এরই মধ্যে পাঁচজন গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

শনিবার দুপুরে ওই নারীর স্বজন দাবি করে তাঁর কবর জিয়ারত করতে আসেন দুজন। তাঁদের একজনের নাম সৈকত ইসলাম, অপরজন গোলাম রব্বানী। তাঁরা সঙ্গে করে একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি নিয়ে এসেছিলেন। স্থানীয় বয়স্ক লোকজন ওই ছবি দেখে নিশ্চিত হন, এটি নিহত নারীরই ছবি। পরে ওই নারীর জীবনের বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরেন স্বজনেরা। তাঁরা বলেন, নিহত নারী ববি বেগম নামে পরিচিত হলেও প্রকৃত নাম ওয়াহিদা বেগম। তাঁর বাবা রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও মা আনিসা বিবি, দুজনই বাক্‌প্রতিবন্ধী ছিলেন। তাঁদের আট সন্তানের মধ্যে সাতজনই বাক্‌প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মান। ওয়াহিদাসহ তিন ভাইবোনের মৃত্যু হয়েছে। জীবিত পাঁচজনের সবাই বাক্‌প্রতিবন্ধী।

ওয়াহিদা বেগমের আগের ছবি
সংগৃহীত

স্বজনেরা প্রথম আলোকে জানান, ওয়াহিদার বিয়ে দেওয়ার দেড় বছরের মাথায় তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়। তাঁদের ঘরে জন্ম নেওয়া একমাত্র মেয়েটিও জন্মের পর পর মারা যায়। তখন খুব একা হয়ে গিয়েছিলেন ওয়াহিদা, বাবার বাড়িতেই থাকছিলেন। ২২-২৩ বছর আগে ছোট বোনের সঙ্গে ঝগড়া করে ওয়াহিদা বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এর আগে প্রায় সময়ই তিনি রাগ করে অন্য বোনের বাড়িতে যেতেন আবার চলে আসতেন। কিন্তু সেদিনের ঝগড়ার পর তিনি আর বাড়িতে ফেরেননি। তাঁকে কোথাও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তিন বছর খোঁজাখুঁজির পর পরিবারের সদস্যরাও হাল ছেড়ে দেন।

ওয়াহিদার ভাগ্নি জামাই সৈকত ইসলাম বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে তিনি ফেসবুকে চোখ বোলাচ্ছিলেন, ওই সময় রেলস্টেশনে মারধরে বৃদ্ধ নারীর নিহতের ঘটনাটি তাঁর সামনে আসে। পাশে থাকা স্ত্রীকে ঘটনাটি তিনি দেখান। স্ত্রী সেটি দেখে বলেন, নিহত নারীকে পরিচিত মনে হচ্ছে, তাঁর খালা ওয়াহিদার মতো। পরদিন বাড়িতে সব আত্মীয়স্বজনদের ছবিটি পাঠানো হলে তাঁরাও নিশ্চিত করেন ববি বেগম আসলে ওয়াহিদা।

আরও পড়ুন

ভাগনে গোলাম রব্বানী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার মায়ের সঙ্গেই ঝগড়া করে বাড়ি ছেড়েছিলেন ওয়াহিদা খালা। ভিডিও কল করে বাড়ির সবাইকে খালার কবর তিনি দেখিয়েছি। আগামীকাল রোববার তাঁর ভাইবোনসহ আরও আত্মীয়স্বজন কবর জিয়ারত করতে আসবেন। শেষ পর্যন্ত খালার খোঁজ পেলাম, তা–ও মৃত্যুর পর।’

রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, দুই যুগ আগে এক দুপুরে মেথিকান্দা স্টেশনে থামা একটি ট্রেন থেকে নেমেছিলেন বাক্‌প্রতিবন্ধী ববি বেগম। এরপর আর কোথাও যাননি, স্টেশনটির পরিত্যক্ত একটি কক্ষ ছিল তাঁর আশ্রয়। বিনা বেতনে প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া ও শৌচাগার পরিষ্কারসহ বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন তিনি। স্টেশন এলাকা ও আশপাশের সবাই তাঁকে চিনতেন। কেউ খাবার দিতেন, কেউ ৫-১০ টাকা সহযোগিতা করতেন। ওই টাকা খরচ না করে দুই যুগ ধরে জমিয়েছিলেন। সেই টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য ওই নারীর ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা।

ভৈরব রেলওয়ে থানার মো. সাঈদ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেথিকান্দা রেলস্টেশনে নিহত নারীর নাম ওয়াহিদা বেগম। তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য আমরা নিশ্চিত হয়েছি। তাঁর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দুজন আজ এসে কবর জিয়ারত করেছেন, অন্য সদস্যরা আগামীকাল আসবেন বলে জানিয়েছেন।’