সূর্যের আগে ওঠার অভ্যাসে বদলে গেছে তাঁদের জীবন

‘সূর্যের আগে উঠি’—এমন স্লোগানে ভৈরবে দলবেঁধে প্রাতর্ভ্রমণে একদল মানুষ। সম্প্রতি মেঘনা সেতুর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ প্রান্ত থেকে তোলাছবি: প্রথম আলো

১৪ আগস্ট শুক্রবার ভোর সাড়ে পাঁচটা। মেঘনার স্বচ্ছ পানিতে জাল ফেলেছেন কয়েকজন জেলে। পাশাপাশি থাকা দুটি রেলসেতু ও একটি সড়কসেতুর ওপর দিয়ে চলছে ট্রেন ও যানবাহন। নদীতে ছুটছে নৌকা। এরই মধ্যে নদীর পাড়ে একে একে জড়ো হচ্ছেন মানুষ। কেউ হাঁটছেন, কেউ দৌড়াচ্ছেন, কেউবা করছেন শরীরচর্চা। এক পাশে ছোটদের ফুটবল খেলা। ওই দিন ভোরে মেঘনার তিন সেতুর কিশোরগঞ্জের ভৈরব প্রান্তে এমনই দৃশ্যই দেখা গেল।

এ দৃশ্য অবশ্য শুধু শুক্রবারের নয়, প্রতিদিন ভোরে কয়েক শ মানুষ এখানে প্রাতর্ভ্রমণে আসেন। কেউ আসেন একা, কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। আবার কয়েকটি বড় দল নিয়মিত শরীরচর্চা করে। এসব দলের আলাদা আলাদা পরিচয় থাকলেও একটি বিষয়ে তাদের মিল ‘সূর্যের আগে উঠি’ ধারণাকে মানা।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে ‘সূর্যের আগে উঠি’ প্রতিপাদ্য মেনে দলগত শরীরচর্চা করছেন অন্তত চারটি বড় দল। এসব দলের কমিটি নেই, নেই সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক। তাঁদের কথা, যে দলেই থাকুন, যেখানেই শরীরচর্চা করুন, দিন শুরু করতে হবে সূর্য ওঠার আগে। এই অভ্যাস এখন অনেকের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। দেড় দশক আগে নদীর পাড় প্রাতর্ভ্রমণকেন্দ্রিক ‘সূর্যের আগে উঠি’ নামে একটি সংগঠন ছিল। এখন সংগঠনটি নেই। তবে নামকরণের বিশেষ্যত্বকে চারটি সংগঠন ধারণ করে আছে।

‘সূর্যের আগে উঠি’ স্লোগানে ভৈরবে দলবেঁধে শরীরচর্চা করছেন একদল মানুষ। সম্প্রতি মেঘনা সেতুর ভৈরব প্রান্ত থেকে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

হাঁটা থেকে ম্যারাথন
১৪ আগস্ট সকাল পৌনে ছয়টার দিকে প্রাতর্ভ্রমণের পোশাক পরে নদীর পাড়ে হাঁটছিলেন মফিজুল ইসলাম। তিনি কাকলি খেলাঘর আসর ভৈরব শাখার সভাপতি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর দলের ১৫ জন সদস্য জড়ো হন। দলটি ‘ম্যারাথন দৌড় গ্রুপ’ নামে পরিচিত। সড়কসেতুর নিচে কিছুক্ষণ ওয়ার্মআপ করে তাঁরা উঠে গেলেন সেতুর ওপর। পরে শুরু হয় হালকা দৌড়। প্রায় এক কিলোমিটার পেরিয়ে তাঁরা পৌঁছালেন আশুগঞ্জ প্রান্তে। দলের সদস্যদের মধ্যে শিক্ষক, ব্যাংকার, চিকিৎসক ও মসজিদের ইমাম আছেন।

মফিজুল ইসলাম বলেন, ‘আগে রাত জেগে থাকতাম। সকালে উঠতে কষ্ট হতো। পরে কয়েকজন মিলে ঠিক করলাম, সূর্য ওঠার আগেই উঠব। এখন এটা আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে।’

এই দলের সদস্য ব্যাংক ব্যবস্থাপক হাবিবুর রহমান বলেন, নিয়মিত হাঁটার কারণে তাঁর ওজন ১০ কেজি কমেছে। তাঁদের একটি মেসেঞ্জার গ্রুপও আছে। সেখানে স্বাস্থ্যসচেতনতার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। কেউ টানা তিন দিন নদীর পাড়ে না এলে তাঁকে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়।

শরীরচর্চা শেষে দলগতভাবে উচ্চ স্বরে হাসছেন ভৈরবের একদল মানুষ। তাঁদের ভাষ্য, এভাবে হাসলে শরীর ও মন দুটিই চাঙা থাকে। সম্প্রতি মেঘনা সেতুর ভৈরব প্রান্ত থেকে তোলা
ছবি: প্রথম আলো

প্রভাষক সজল কুমার দেব ও ব্যাংকার আল আমিনের কাছে হাঁটা এখন অনেকটা আসক্তির মতো। তাঁরা বলেন, নিয়মিত হাঁটার কারণে ওজন নিয়ন্ত্রণে আছে। শরীর–মন দুই–ই ভালো থাকে।

ব্যবসায়ী আল উদ্দিন আলী, প্রভাষক ইমরান হোসাইন ও ব্যাংকার মঞ্জুরুল কবির বলেন, এখন আর ঘড়িতে তাঁদের অ্যালার্ম দিতে হয় না। নিজেরাই ভোরে ঘুম থেকে উঠে যান। পরিবারের কয়েকজন সদস্যও এখন ভোরে ওঠেন।

এই দলের প্রশিক্ষক মঞ্জু মিয়া বলেন, সদস্যরা হাঁটার চেয়ে দৌড়াতে বেশি পছন্দ করেন। অনেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নেন। ভবিষ্যতে তাঁরা একটি ম্যারাথন ক্লাব প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছেন।

এভারগ্রিন চত্বর
দুটি সেতুর মাঝখানে রয়েছে একটি চত্বর। নাম ‘এভারগ্রিন চত্বর’। এটি ঘিরে গড়ে উঠেছে আরেকটি বড় প্রাতর্ভ্রমণকারী দল। ছয় বছর ধরে সক্রিয় এই দলের সদস্য প্রায় ৫০ জন।

১৪ আগস্ট সেখানে গিয়ে দেখা যায়, নিয়মিত ব্যায়ামের পাশাপাশি তাঁরা ইয়োগা করছেন। ঢাকার চিকিৎসক আতাউর রহমান এসে তাঁদের ইয়োগা করান। ব্যায়াম শেষে সবাই মিলে ভুনাখিচুড়ি খান। প্রতি শুক্রবার এমন আয়োজন এখন তাঁদের নিয়মিত কর্মসূচির অংশ। এর পাশাপাশি দলটি নিয়ম করে উচ্চ স্বরে হাসার চর্চাও করে। শরীরচর্চার পর চলে আড্ডা। সেই আড্ডায় উঠে আসে ভৈরবের পরিবেশ, শিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, সমাজ, রাষ্ট্র ও বন্ধুত্বের নানা প্রসঙ্গ।

নাসির উদ্দিন, কাজী উসমান গণি, আবদুল মতিন, রফিকুল ইসলাম, মনমোহন, মোশারফ হোসেন, মোফাজ্জল হোসেন ও ইদ্রিস মিয়া দলটির কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

আবদুল মতিন বলেন, ‘বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া সপ্তাহের প্রতিদিন আমরা নিয়ম করে নদীর পাড়ে আসি।’

দলটির প্রশিক্ষক কাজী উসমান গণি বলেন, ‘আমাদের গ্রুপের সবাইকে সূর্যের আগে উঠতেই হয়। সকাল পৌনে ছয়টার মধ্যে নদীর পাড়ে আসতে হয়। ৩০ মিনিট ব্যায়াম ও ৩০ মিনিট হাঁটার পেছনে প্রতিদিন সময় দিই।’

শরীরচর্চার সঙ্গে সবুজায়ন
মো. বাবুল, জাকির হোসেন, চিকিৎসক আবুল কাসেম, আলা উদ্দিন ও কাইজার চৌধুরীসহ কয়েকজনের নেতৃত্বে আরেকটি দল নিয়মিত প্রাতর্ভ্রমণ করেন। হাঁটা শেষে তাঁদের কেউ কেউ মেঘনার পানিতে গোসল করে বাড়ি ফেরেন।

শরীরচর্চার পাশাপাশি পরিবেশ নিয়েও কাজ করেন দলটির সদস্যরা। নদীর পাড়ের আগাছা পরিষ্কার করেন। সামাজিক ও নাগরিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁদের উদ্যোগে নদীর পাড়ে লাগানো হয়েছে অসংখ্য কৃষ্ণচূড়া ও দুটি বটগাছ। বটগাছ দুটি এখন ডালপালা ছড়িয়ে ছায়া দিতে শুরু করেছে।

মো. বাবুল বলেন, ‘হাঁটার পাশাপাশি গাছ লাগানো ও আগাছা পরিষ্কার আমাদের নিয়মিত কাজ।’

দুই দশকের প্রাতর্ভ্রমণ
মেঘনার পাড়ে প্রাতর্ভ্রমণের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ভৈরব সরকারি হাজি আসমত কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ শামসুজ্জামানের। তাঁর নেতৃত্বে একটি বড় দল প্রায় দুই দশক ধরে নদীর পাড়ে নিয়মিত হাঁটছে।

একসময় তাঁর নেতৃত্বে নদীর পাড়কেন্দ্রিক ‘গাঙ সমিতি’ নামে একটি সৃজনশীল সংগঠনও গড়ে ওঠে। সংগঠনটি এখনো সক্রিয়। বর্তমানে প্রাতর্ভ্রমণকারীদের একটি বড় অংশকে নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন ট্যুরিস্ট ক্লাব। স্বাস্থ্যসচেতন থাকা ও চারপাশকে ভালোভাবে দেখাই এই ক্লাবের মূল উদ্দেশ্য।

শামসুজ্জামান বলেন, প্রাতর্ভ্রমণ থেকে মনে হয়েছে, সম্পূর্ণ সুস্থ থাকতে হলে ভ্রমণও করতে হবে। আমরা হাঁটি, দেশ ভ্রমণ করি।

প্রাতর্ভ্রমণকারীদের মতে, তিন সেতুর ভৈরব প্রান্ত এখন শুধু প্রাতর্ভ্রমণের জায়গা নয়, এখানে প্রতিনিয়ত মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে। শরীরচর্চার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে বন্ধুত্ব ও পরিবেশের প্রতি মমতা।