রাজশাহীর পানি–সংকটাপন্ন এলাকায় সেচ নিয়ে চিন্তিত চাষিরা
ভূগর্ভস্থ পানি তোলার জন্য সরকার অনুমোদিত মোটর আছে রাজশাহীর তানোর উপজেলার চোরখৈর গ্রামের কৃষক আয়েজ উদ্দিনের। গত বছর সেই মোটর দিয়ে পানি তুলে তিনি প্রায় ৩০ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করেন। এবারও বোরো চাষ করতে এক বিঘা জমিতে বীজতলা করেছেন। তাতে চারাও গজিয়েছে।
কিন্তু আয়েজ উদ্দিন জানেন না, তাঁদের এলাকাকে পানি–সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জমিতে সেচ দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তিনি।
‘অতি উচ্চ পানি–সংকটাপন্ন’ এলাকা
ক্রমবর্ধমান ভূগর্ভস্থ পানির সংকটের কারণে রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫০৩টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানি–সংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব অঞ্চলের ৮৭ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি পানির সংকটে ভুগছেন। এসব এলাকায় সেচে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে গত ৬ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। অথচ আগের মতোই বোরো চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন এসব এলাকার চাষিরা।
গেজেট অনুযায়ী, পানি–সংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন নলকূপ স্থাপন কিংবা বিদ্যমান নলকূপের মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা যাবে না। বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করলে বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩–এর ধারা ২৯ ও সংশ্লিষ্ট অন্য ধারা অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে।
পানি–সংকটাপন্ন এলাকায় এবার ভূগর্ভস্থ সেচের পানি ব্যবহার করা যাবে কি না, সে ব্যাপারে এখনো মাঠপর্যায়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। কৃষক আয়েজ উদ্দিনের মতো অনেকে বোরো ধানের বীজতলা প্রস্তুত করলেও সেচ দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। এ ব্যাপারে নির্দেশনা না পাওয়ায় কৃষি কর্মকর্তারাও করণীয় নির্ধারণ করতে পারেননি।
সবচেয়ে উঁচু এলাকা তানোরের চিত্র
রাজশাহীর মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সবচেয়ে উঁচু এলাকা তানোর উপজেলার উচ্চাডাঙ্গা গ্রাম। এই গ্রামের বাসিন্দা আবু বক্কার এবার বোরো ধান চাষের জন্য জমি তৈরি করছেন। তাঁর এলাকাকে পানি–সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। তিনি বলেন, খবরে একদিন শুনেছেন যে এই এলাকাকে পানি–সংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে এবং সেচের কাজে আর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করা যাবে না। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে ধান চাষ করবেন, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন।
তানোরের মুন্ডুমালা পৌর এলাকার আবদুল আউয়াল বলেন, গত বছর ২০ বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। পুরোটাই ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে। এবার এলাকাকে পানি–সংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়েছে শুনছেন। কিন্তু সরকারিভাবে এখনো তাঁদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এরপরও বিষয়টি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। যদি ধান চাষ করতে না পারেন, তাহলে কী করে চলবেন। ভূগর্ভস্থ পানি ছাড়া এলাকায় ধান চাষ করার অন্য কোনো উপায়ও নেই।
একই উপজেলার কলমা ইউনিয়নের চোরখৈর গ্রামের মোহাম্মদ কাজল বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার ছাড়া তাঁদের কোনো উপায় নেই। মাটির নিচের পানি ব্যবহার করা যাবে না শুনেই তাঁরা দুশ্চিন্তায় আছেন।
জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, পানি–সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁদের কাছে ভূগর্ভস্থ পানি বোরো ধানে ব্যবহার করা যাবে কি না, এ রকম কোনো নির্দেশনা আসেনি। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) শুধু তাঁদের কাছ থেকে এ বছরে কী পরিমাণ বোরো ধান চাষ হবে, তার একটা তালিকা নিয়েছে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সংকট মোকাবিলায় প্রস্তাবিত জাতীয় পানি নীতি–২০২৫ প্রণয়নকে সময়োপযোগী ও জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন পানি বিশেষজ্ঞরা। সেই লক্ষ্যে গত ৩০ ডিসেম্বর পবা উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে গণশুনানি ও তারুণ্যের মতামত গ্রহণ–সংক্রান্ত কর্মশালা হয়।
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) আয়োজিত কর্মশালায় পানি–সংকটাপন্ন এলাকার তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি সংকটের কারণ তুলে ধরা হয়। ওয়ারপোর পক্ষ থেকে জানানো হয়, অতিরিক্ত গভীর নলকূপ স্থাপন, অপরিকল্পিত সেচের ব্যবস্থা, জলাশয় ভরাট ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির স্বাভাবিক পুনঃ ভরাট ব্যাহত হচ্ছে। এতে প্রতিবছর পানির স্তর গড়ে কয়েক ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে।
চাষাবাদে অতিরিক্ত পানি উত্তোলন করায় বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ১০ বছর আগে থেকে নতুন করে গভীর নলকূপ না বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য চাষিদের পানি–সাশ্রয়ী ফসল চাষেরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চাষিরা সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সেচপাম্প বসাচ্ছেন।
কৃষি কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর মধ্যে তানোরে বেশি ধান উৎপাদন হয়। এখানে সেচের আওতায় আছে ২২ হাজার ৩৩২ হেক্টর জমি। বিপরীতে সেচযন্ত্র আছে ২ হাজার ১৯৫টি। এর মধ্যে বিএমডিএর গভীর নলকূপ ৫২৯টি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন গভীর নলকূপ ১৬টি। অন্যগুলো অগভীর নলকূপ। এ ছাড়া প্রায় আড়াই হাজার অনুমোদনহীন নলকূপ রয়েছে।
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহম্মদ বলেন, কৃষকদের ধানের বদলে পানি–সাশ্রয়ী ফসল শর্ষে, তিল, মসুর ও ভুট্টা চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।