গ্রেপ্তার নেতা-কর্মীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে রিমান্ডেও নিয়েছে পুলিশ। সর্বশেষ আজ বৃহস্পতিবার বাসাইল উপজেলা বিএনপির তিন নেতার দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। তাঁরা হচ্ছেন উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি আবুল হাশেম, উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব শাহ আলম ভূইয়া ও কাশিল ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি রফিক মিয়া।

কোথাও কোনো ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। কাউকে বাড়ি থেকে, কাউকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা রাস্তা থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে ককটেল নিক্ষেপের কাল্পনিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
ফরহাদ ইকবাল, সাধারণ সম্পাদক, টাঙ্গাইল জেলা বিএনপি

বিএনপি নেতা-কর্মীরা জানান, গত বুধবার এই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ওই তিনজনসহ দলের আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে মামলা করা হয়। বাসাইল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) টিটু চৌধুরী বাদী হয়ে দায়ের করা মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ৪০-৫০ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়।

এর আগে গতকাল বুধবার মির্জাপুর থানার এসআই মোশারফ হোসেন বাদী হয়ে ২৮ জনের নাম উল্লেখ করে বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা করেন। ওই মামলায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ছয় নেতাকে আসামি করা হয়। ওই ছয় নেতাকে বুধবার দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। তাঁরা এখন রিমান্ডে পুলিশ হেফাজতে আছেন। গত মঙ্গলবার (২২ নভেম্বর) রাতে মির্জাপুরের গোড়াই নাজিরাপাড়া কাশেম ড্রাইসেল মিলের পাশে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে এই মামলা হয়।

যাঁদের নাম মামলায় রয়েছে তাঁরা গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকা ছেড়েছেন। অন্যরাও গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছেন। প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। যে কাউকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করতে পারে পুলিশ।

ঘটনাস্থলের পাশেই বাড়ি জুলহাস মিয়ার। তিনি ড্রাম্প ট্রাক ও এক্সকাভেটর ভাড়া দেন। জুলহাস বলেন, পেশাগত কারণে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে হয়। মঙ্গলবার রাতে তিনি কোনো ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ বা অন্য কোনো শব্দ শোনেননি। কোনো হইচইও কানে আসেনি। তবে পরদিন সকালে শুনেছেন তাঁদের এলাকায় পুলিশের ওপর ককটেল মারার অভিযোগে কয়েকজনকে ধরেছে পুলিশ।

একই দিন ঘাটাইল উপজেলা বিএনপির ১০ নেতা-কর্মীরও দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। আগের দিন মঙ্গলবার তাঁদের গ্রেপ্তার করে পুলিশের ওপর ককটেল হামলার অভিযোগে মামলা করা হয়। ওই মামলায় ৩৫ জনের নাম উল্লেখসহ ৪০-৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া ১০ জন নেতা-কর্মী পুলিশ হেফাজতে আছেন।

সোমবার রাতে টাঙ্গাইল শহরে বিএনপির প্রস্তুতি সভা থেকে ফেরার পথে তিনজন আইনজীবীসহ ১২ জনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। ওই রাতেই তাঁদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা করা হয়। পরদিন আদালতে হাজির করে রিমান্ড চাওয়া হয়। আদালত এক দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে ওই ১২ জন টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে আছেন।

এ ছাড়া ২১ নভেম্বর নাগরপুর উপজেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের দুজনকে এবং ১৭ নভেম্বর কালিহাতী উপজেলার পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধেও পুলিশ বাদী হয়ে বিস্ফোরক আইনে মামলা করে। উভয় মামলাতেই আসামিদের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়। কালিহাতীর মামলায় ২৯ জনের নাম উল্লেখসহ ৩০-৪০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়।

নাগরপুরের মামলায় ২১ জনের নাম উল্লেখসহ ৪০-৫০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। ঘটনার স্থান উল্লেখ করা হয়েছে সহবতপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ। ওই স্কুলের পাশের বাসিন্দা ব্যবসায়ী মো. মনির উদ্দিন। তিনি বলেন, ওই দিন তিনি বাড়িতে ছিলেন। ককটেল বা অন্য কোনো বিস্ফোরণের শব্দ শোনেননি। আশপাশের অন্য কেউও শোনেননি। পরদিন সকালে বাজারে গিয়ে শুনেছেন পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

বিএনপি নেতা-কর্মীরা বলছেন, এভাবে একের পর এক মামলার ফলে নেতা-কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। যাঁদের নাম মামলায় রয়েছে তাঁরা গ্রেপ্তার এড়াতে এলাকা ছেড়েছেন। অন্যরাও গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছেন। প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। যে কাউকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করতে পারে পুলিশ। আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশ বাধাগ্রস্ত করতে পুলিশ ধারাবাহিকভাবে এই মামলা করছে বলে অভিযোগ বিএনপি নেতাদের।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবাল বলেন, পুলিশ এক সপ্তাহে টাঙ্গাইলে ছয়টি মামলা করেছে। এর পাঁচটিতেই পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগ আনা হয়েছে। অথচ কোথাও কোনো ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেনি। কাউকে বাড়ি থেকে, কাউকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বা রাস্তা থেকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে ককটেল নিক্ষেপের কাল্পনিক অভিযোগ আনা হয়েছে। সব মামলাই ‘গায়েবি মামলা’। অবিলম্বে মামলাগুলো প্রত্যাহার করে গ্রেপ্তার নেতা-কর্মীদের মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন।