আশুলিয়ায় শ্রমিক–পুলিশ পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ৭০ কারখানায় ছুটি, গাজীপুর শান্ত
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে সাভারের আশুলিয়ায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকেরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও পুলিশের একটি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকালে আশুলিয়ার আব্দুল্লাহপুর–বাইপাইল সড়কের জামগড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
এ ঘটনার পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির শঙ্কায় আশুলিয়ার ৭০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিকে গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। আজ বেলা তিনটা পর্যন্ত কোথাও শ্রমিক আন্দোলনের খবর পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টহল দিচ্ছে।
পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর
প্রত্যক্ষদর্শী ও কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকালে আশুলিয়ার আব্দুল্লাহপুর–বাইপাইল সড়কের আশপাশের বিভিন্ন কারখানায় উপস্থিত হন শ্রমিকেরা। তাঁরা কাজ বন্ধ করে কারখানায় বসে থাকেন। পরে কারখানায় ছুটি ঘোষণা করলে সকাল সাড়ে আটটার দিকে জামগড়া এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন তাঁরা। পুলিশ তাঁদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া শুরু হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের একটি গাড়ির কাঁচ ভেঙে যায়। পরে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ।
শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, আজ সাভার ও আশুলিয়ার পরিস্থিতি অনেক ভালো। তবে কিছু জায়গায় অস্থিতিশীলতার শঙ্কা থাকায় এবং কিছুটা অস্থিতিশীল হওয়ায় এসব এলাকার এক হাজার ৮৬৩টি কারখানার মধ্যে ৭০টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। সকালে জামগড়া এলাকায় কারখানা ছুটির পর কিছু দুষ্কৃতকারী কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছুড়েছে। সেখান থেকে কয়েকজনকে ধরার পর তাঁরা পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর করেন।
কারখানার ফটক ভাঙচুর
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন বলেন, সকাল থেকে আশুলিয়ার দোসাইদ এলাকার বিভিন্ন কারখানায় শান্তিপূর্ণভাবে কাজ করছিলেন শ্রমিকেরা। সকাল সাড়ে নয়টার দিকে ওই এলাকার ‘ফেব্রিকা নিট কম্পোজিট’ কারখানার সামনে ৪০০ থেকে ৫০০ বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে কারখানার দুটি ফটক ভেঙে ফেলেন। এ পরিস্থিতিতে কারখানায় ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। পরে আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ছুটি দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারখানার এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের এখানে এই কয়দিন সুন্দরভাবে কাজ চলছিল। কোনো ঝামেলা হয় নাই। গতকাল (বুধবার) দেড় শ লোক আসছিল। আমরা ওদের গেট থেইকা সরাইয়া দিছিলাম। কিন্তু আজকে প্রিপারেশন নিয়া আসছিল। প্রায় ৫০০ লোক আইসা দুইটা গেইট ভাঙছে। কারখানা ছুটি দিলে শ্রমিকেরা বের হলে তারা চইলা গেছে। পরে আশপাশের কারখানাও ছুটি দিয়া দিছে।’
আন্দোলনে না গেলে দেওয়া হয় পিটুনি
কারখানা ছুটির পর কারখানার বাইরে থাকা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আন্দোলনে যুক্ত না হলে পিটুনি খেতে হয় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী কয়েকজন শ্রমিক।
জামগড়া এলাকার একটি কারখানার শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সকালে আমরা সবাই কাজ শুরু করছি। তহন বাইরে থেইকা পোলাপান আইসা যেই ঢিল শুরু করছে, মালিকে ছুটি দিয়া দিল।’ তিনি বলেন, ‘ছুটির পর ওগো লগে না গেলে মারে। গতকাল আমাকেও মারবার নিছিল। পরে গেছিলাম; খানিক পর পাশ কাইট্টা বাসায় চইলা আসছি।’
টহল দিচ্ছে পুলিশ–বিজিবি
এদিকে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সাভারের রেডিও কলোনি, হেমায়েতপুর এলাকা ঘুরে পুলিশ ও বিজিবির সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। এ ছাড়া বিভিন্ন কারখানার সামনে এবং কারখানা–সংলগ্ন স্থানে বিএনপির নেতা-কর্মীদেরও দেখা যায়। বেলা একটার দিকে সাভারের জোরপুল এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে বিজিবি সদস্যদের টহল দিতে দেখা যায়।
বিজিবির ঢাকা ব্যাটালিয়নের (৫ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৈমুর হাসান খান প্রথম আলোকে বলেন, অন্যান্য দিনের তুলনায় আজকের পরিস্থিতি ভালো। এখন পর্যন্ত নাশকতার ঘটনা কোথাও হয়নি। বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক আছে। সাভার ও আশুলিয়ার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
গাজীপুরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক
টানা পাঁচ দিনের শ্রমিক বিক্ষোভ, মহাসড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের পর গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক। আজ বৃহস্পতিবার বেলা তিনটা পর্যন্ত কোথাও শ্রমিক বিক্ষোভের খবর পাওয়া যায়নি। ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের যান চলাচল স্বাভাবিক আছে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের টহল দিতে দেখা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বিএনপির নেতা–কর্মীরাও অবস্থান নিয়ে আছেন।
শিল্প–পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের যেসব এলাকায় শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, সেসব এলাকায় বাড়তি নজরদারি করা হচ্ছে। গাজীপুরে আজ কতটি কারখানা বন্ধ আছে, তার সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। তবে যেসব কারখানায় আগেই ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল, সেগুলো বন্ধ আছে।
গাজীপুর শিল্প–পুলিশের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, মহাসড়কের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সচেষ্ট আছে। জেলার অনেক কারখানা আগে থেকে ছুটি ঘোষণা করায় আজ সেগুলো বন্ধ আছে।
১০ প্লাটুন আনসার মোতায়েন
গাজীপুরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ১০ প্লাটুন আনসার মোতায়েন করা হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল বুধবার ছয় প্লাটুন এবং আজ বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জ থেকে আরও চার প্লাটুন আনসার মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
বৃহস্পতিবার দুপুরে গাজীপুরের সফিপুরে আনসারের একটি প্রশিক্ষণের সমাপনী কুচকাওয়াজ শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক এ কথা বলেন। তিনি বলেন, শ্রমিকদের জন্য সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। ইতিমধ্যে কার্যক্রমও শুরু হয়েছে। আনসারের থানা ও ওয়ার্ডভিত্তিক জনবল থেকে তাঁরা দুষ্কৃতকারী কারা, কোথায় কী পরিকল্পনা করছে—জানতে পারছেন। দুষ্কৃতকারীরা যাতে জানমালের ক্ষতি করতে না পারে, সে জন্য আনসার ব্যাটালিয়ন কাজ করছে।