১৮ জুলাই বিকেলে জেলা কারাগার থেকে বের করে সার্ভেয়ারকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদক কর্মকর্তারা। দুই দিনের মাথায় ঘুষ গ্রহণের দায় স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হন ওই সার্ভেয়ার। বর্তমানে তিনি জেলা কারাগারে অবস্থান করছেন।

আদালত সূত্র জানায়, আতিকুর রহমান আদালতের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, মহেশখালীর ধলঘাটা ও মাতারবাড়ীতে ভূমি অধিগ্রহণের ৪০টির বেশি ক্ষতিপূরণ কেস (ফাইল) তাঁর হাতে ছিল। ক্ষতিপূরণের চেক (টাকা) পাইয়ে দেওয়ার বিপরীতে তিনি জমির মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ নেন। পরে তিনি ঘুষের ২৩ লাখ ৬৩ হাজার ৯০০ টাকা নিয়ে কক্সবাজার থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে গ্রেপ্তার হন।

আতিকুরের বাড়ি সিরাজগঞ্জ পৌরসভার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মীরপুর এলাকায়। আতিকুরের চাকরি পার্বত্য বান্দরবান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে হলেও তিনি (সার্ভেয়ার) সংযুক্তিতে দেড় বছর ধরে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসনের ভূমি হুকুম দখল (এলএ) শাখার অধীন মহেশখালী উপজেলার দায়িত্বে ছিলেন। মহেশখালীতে সরকারের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর স্থাপনসহ প্রায় ১৫টি প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের দায়িত্বে ছিলেন আতিকুরসহ তিন সার্ভেয়ার। ভূমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে জমির মালিকদের কাছ থেকে ঘুষ লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন আতিকুর। ঘুষের টাকাসহ আতিকুর ধরা পড়ার ঘটনায় কক্সবাজারের এলএ শাখার ৯ সার্ভেয়ারকে গত ১৯ জুলাই একযোগে তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটিসহ অন্যত্র বদলি করা হয়।

দুদক সমন্বিত কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘সার্ভেয়ার আতিকুর রহমানকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে এনে আমরা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছিলাম। দুই দিনের মাথায় তিনি ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে রাজি হন। তবে আদালতে সার্ভেয়ার কী বলেছেন সেটা আমাদের জানা নেই।’

১ জুলাই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক হন আতিকুর রহমান। ৪ জুলাই সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে মামলা করেন দুদক কক্সবাজার সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন। একই সময় সার্ভেয়ারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন কক্সবাজার বিশেষ জজ আদালতের বিচারক, জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ১ জুলাই সকাল ৯টা ৩৫ মিনিটে কক্সবাজার বিমানবন্দরের তল্লাশি গেট থেকে প্রবেশের সময় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সার্ভেয়ার আতিকের কাছে টাকা পাওয়া যাওয়ার বিষয়টি মুঠোফোনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আমিন আল পারভেজকে জানান। তিনি (এডিসি) তাৎক্ষণিক আতিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। কিন্তু ততক্ষণে সার্ভেয়ার আতিক ইউএস বাংলার একটি ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ায় তাঁকে আটকাতে পারেনি কক্সবাজার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

পরে ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক করা হয় তাঁকে। সেখানে আটকের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি টাকার উৎস সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সঠিক উত্তর দিতে পারেননি। পরে গোয়েন্দা সংস্থা সার্ভেয়ার আতিককে কক্সবাজারে ফেরত এনে জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্ভেয়ার আতিককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

সেখানেও জিজ্ঞাসাবাদে সার্ভেয়ার আতিক টাকার উৎস সম্পর্কে সদুত্তর দিতে না পারায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ১ জুলাই রাতে সার্ভেয়ারকে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়।
পরে ওই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ ডায়েরি করে সার্ভেয়ার আতিকুর রহমানকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠায় পুলিশ। আদালতের বিচারক সার্ভেয়ারকে ২ জুলাই জেলা কারাগারে পাঠান।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, সার্ভেয়ার আতিক উৎস গোপন বা আড়াল করার উদ্দেশ্যে হস্তান্তর, স্থানান্তরের চেষ্টা করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২–এর ৪ (২) ও ৪ (৩) ধারা তৎসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন