মেয়র থেকে সংসদ সদস্য, এবার মন্ত্রিত্ব পেলেন মিজানুর রহমান মিনু
১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় রাজশাহী–২ (সদর) আসন থেকে পূর্ণ মন্ত্রী হয়েছিলেন এমরান আলী সরকার। দীর্ঘ ৪৬ বছর পর আবার রাজশাহী সদর আসন থেকে নির্বাচিত কোনো সংসদ সদস্য পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। তিনি হলেন বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মিজানুর রহমান মিনু।
এর আগে নির্বাচিত হয়ে সংসদে গেলেও মন্ত্রিত্ব পাননি মিজানুর রহমান। এবার মন্ত্রী হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজশাহী শহরের পাড়া–মহল্লায় তাঁর ভক্ত ও অনুসারীরা মিষ্টি বিতরণসহ বিভিন্নভাবে আনন্দ–উল্লাস করছেন।
রাজশাহী–২ আসনটি বর্তমানে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকা নিয়ে গঠিত। ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় আসুন পুনর্গঠিত হলে পবা উপজেলা রাজশাহী–২ আসন থেকে বাদ যায়। এই আসনে বর্তমানে ভোটারসংখ্যা ৩ লাখ ৬৯ হাজার ৫৬৪।
১৯৭৩ সালের নির্বাচনে এই আসন থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা এ এইচ এম কামারুজ্জামান। একই সঙ্গে রাজশাহী–১ আসন থেকেও তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে রাজশাহী সদর আসন ছেড়ে দিয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন রাজশাহী–১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে। এরপর ১৯৭৯ সালে এই আসন থেকে মন্ত্রী হন এমরান আলী সরকার। তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসনমন্ত্রী ছিলেন। এমরান আলী সরকার ন্যাপ–ভাসানী থেকে বিএনপিতে যোগদান করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মিজানুর রহমান ১ লাখ ৩৭০ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। নিকটতম প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর মহানগর আমির মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরের সঙ্গে তাঁর ভোটের ব্যবধান ২৮ হাজার ১৭৬। এর আগে মিজানুর রহমান ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত এবং ১৯৯৪ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন। তিনি ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী–২ আসন থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেবার তিনি সারা দেশের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিলেন। এবার তিনি মন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করে ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।
মিজানুর রহমানের মন্ত্রী হওয়ার খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে রাজশাহীর সাহেববাজারে নির্বাচনী কার্যালয়ের সামনে ও নগরের লক্ষ্মীপুরসহ বিভিন্ন পাড়া–মহল্লায় মিষ্টি বিতরণ করা হয়। মিজানুর রহমান মিনুকে দিয়ে রাজশাহী পঞ্চম পূর্ণ মন্ত্রী পেল। এর আগে আওয়ামী লীগের এ এইচ এম কামারুজ্জামান, বিএনপির এমরান আলী সরকার, জাতীয় পার্টির সরদার আমজাদ হোসেন (রাজশাহী–৪) আসন থেকে ও রাজশাহী–১ আসন থেকে ব্যারিস্টার আমিনুল হক বিএনপি দলীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের আয়কর রিটার্ন অনুযায়ী মিজানুর রহমান মিনুর মোট সম্পদের পরিমাণ ৯৬ লাখ ৬২ হাজার ৮৭৫ টাকা। ব্যবসা, কৃষি ও বাড়িভাড়া থেকে তাঁর বার্ষিক আয় ৮ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টাকা। তাঁর স্ত্রী সালমা শাহাদাত পেশায় কলেজের শিক্ষক। তাঁর স্ত্রীর প্রদর্শিত মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৫৯ লাখ ৪১ হাজার ২৩৯ টাকা। বার্ষিক আয় ১৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫২১ টাকা।
উল্লেখযোগ্য সম্পদের মধ্যে মিজানুর রহমানের নগদ অর্থ রয়েছে ১১ লাখ ৭১ হাজার ৯৫ টাকা এবং স্ত্রীর রয়েছে ৫০ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭০ টাকা। বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে ২৫ লাখ ৫৪ হাজার ৮৫২ টাকা সমমূল্যের। তাঁর স্ত্রীর বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে ২৮ হাজার ৭৪৫ টাকা সমমূল্যের। মিজানুর রহমানের ১০০ ভরি সোনা রয়েছে, যার অর্জনকালীন মূল্য ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। তাঁর স্ত্রীর রয়েছে ৫০ ভরি সোনা।
মিজানুর রহমানের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ১৫ বিঘা কৃষিজমি রয়েছে। স্ত্রীর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জমির পরিমাণ ৩ দশমিক ৪৭২৫ একর। মিজানুর রহমানের অকৃষি জমি রয়েছে ১ কাঠা। মিজানুর রহমান হলফনামায় পাঁচটি ফ্ল্যাট থাকার তথ্য দিয়ে মূল্য দেখিয়েছেন ৪২ হাজার ৬০০ টাকা। স্ত্রীর নামে চারতলা একটি বাড়ি রয়েছে, যার মূল্য ৮২ লাখ ১৩ হাজার টাকা।
মিজানুর রহমানের জন্ম ১৯৫৮ সালের ৭ জানুয়ারি। সর্বোচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা বিকম পাস। দলীয় নেতা–কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজশাহী কলেজে পড়ার সময় কলেজ ছাত্র সংসদের সহক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। তখন থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু। জিয়াউর রহমান জাগোদল খুললে তিনি সেখানে যোগ দেন। পরে তিনি যুবদলের রাজশাহী জেলার সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি হন। এরপর যুবদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম মহাসচিব ছিলেন। রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন মিজানুর রহমান।
মিজানুর রহমানের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় মেয়ে ও এক ছেলে লন্ডনে পড়াশোনা করেন। ছোট ছেলে দেশে রয়েছেন বলে ঘনিষ্ঠ সূত্রে জানা গেছে।