কাপাসিয়ায় ৫ খুন: আপনজনের খুনি কীভাবে হয়ে ওঠে মানুষ

গাজীপুরের কাপাসিয়ার এই বাড়িতে মা, তিন সন্তানসহ পাঁচজনের মরদেহ পাওয়া যায়ছবি: প্রথম আলো

মানুষকে হত্যা করা মানুষের জন্য মোটেও সহজ নয়, তাই মানুষ দূর থেকে বুলেট ছোড়ে—এ কথা লিখেছিলেন ডাচ লেখক রুটখার ব্রেগমান তাঁর ‘হিউম্যানকাইন্ড: আ হোপফুল হিস্ট্রি’ বইয়ে, মানুষের সহিংসতা ও যুদ্ধের মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে।

তারপরও কখনো কখনো কোনো মানুষ এমন এক অন্ধকারে ডুবে যায়, যেখানে নিজের সন্তানের মুখও তাকে থামিয়ে রাখতে পারে না। তখন দূর থেকে নয়, কাছ থেকেই ওঠে হন্তারক হাত। সবচেয়ে পরিচিত, সবচেয়ে কাছের মানুষগুলো হয় তার শিকার। যারা তাকে শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিশ্বাস করত, তাদেরই হত্যা করে।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় গত শুক্রবার এক নারী, তাঁর তিন সন্তান ও তাঁর ভাইকে হত্যার ঘটনায় অনেকের মনেই জাগিয়ে তুলেছে একটি প্রশ্ন, তা হলো একজন বাবা কেন তাঁর নিজের সন্তানদের হত্যা করবেন?

পুলিশ ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিন শিশুর বাবা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। হত্যার পর তিনি তাঁর ভাইকে ফোন করে এটাও বলেন, ‘সবাইকে শেষ করে দিয়েছি। আমাকে আর খুঁজে পাবে না।’ পরে স্বজনেরা গিয়ে ঘর থেকে লাশ উদ্ধার করেন। আবার হত্যাকাণ্ডের আগে ওই রাতে ওই ব্যক্তিকে দুই সন্তানকে নিয়ে বাসার পাশের একটি দোকানে গিয়ে চিপস, চকলেট কিনে দিতেও দেখেছিলেন স্থানীয় লোকজন।

আরিফুল ইসলাম নামে প্রতিবেশী এক তরুণ বলেন, ‘এই ঘটনা দেশের মানুষের আবেগকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একজন বাবা কীভাবে এমন কাজ করতে পারে, আমরা বুঝতে পারছি না। এটা কেমন নৃশংসতা।’

আরিফুলের মতো অনেকের কাছেই খবরটি অবিশ্বাস্য ঠেকছে। কারণ, সাধারণত একজন বাবা সন্তানের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত থাকেন। সন্তান ভালো থাকুক, ভালো খাক, ভালোভাবে বড় হোক—এটাই বেশির ভাগ বাবার চাওয়া। অনেক বাবা নিজের কষ্ট আড়াল করে সন্তানের জন্য লড়াই করেন। সেই বাবাই যখন নিজের সন্তানদের হত্যা করেন, তখন এই হত্যাকাণ্ড শুধু আইনের সীমারেখায় থাকে না, মনস্তত্ত্বেরও প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

হত্যার মনস্তত্ত্ব কতটা জটিল

বিখ্যাত মনোবিশ্লেষক সিগমুন্ড ফ্রয়েড মানুষের মনকে তিনটি স্তরে ব্যাখ্যা করেছিলেন—ইড, ইগো ও সুপার ইগো। মানবমনের সবচেয়ে আদিম অংশ হলো ‘ইড’। এটি মানুষের চাহিদা, তাড়না, রাগ, লালসা বা তাৎক্ষণিক আকাঙ্ক্ষার জায়গা। ইড দ্রুত তৃপ্তি চায়, সামাজিক নিয়ম বা নৈতিকতার ধার ধারে না।

‘ইগো’ কাজ করে বাস্তবতার জায়গা থেকে। এটি মানুষের প্রবৃত্তি ও বাইরের বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় করার চেষ্টা করে। আর ‘সুপার ইগো’ হলো নৈতিক বোধের অংশ, যা মানুষকে ঠিক-ভুলের ধারণা দেয়।

মনোবিজ্ঞানের বিভিন্ন ব্যাখ্যায় দেখা যায়, যখন কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিনের হতাশা, দাম্পত্য সংকট, দমিত ক্ষোভ বা মানসিক চাপে থাকেন, তখন তাঁর নিজেকে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে যেতে থাকে। তখন আবেগ, রাগ বা প্রবল কোনো বাসনা আচরণের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।

তবে মনোবিজ্ঞানীরা এটাও বলেন, কোনো একক তত্ত্ব দিয়ে হত্যাকাণ্ড ব্যাখ্যা করা যায় না। পারিবারিক সহিংসতার পেছনে মানসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ব্যক্তিগত—সব ধরনের কারণ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

মনোরোগবিশেষজ্ঞ ডা. আহমেদ হেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, হত্যাকাণ্ডকে সাধারণভাবে দুইভাবে ভাগ করা হয়। একটি পরিকল্পিত বা ‘প্রিমেডিটেটেড’ হত্যা, অন্যটি তাৎক্ষণিক আবেগ, রাগ বা তীব্র মানসিক উত্তেজনা থেকে সংঘটিত—‘ইমপালসিভ’ হত্যা।

ডা. আহমেদ হেলালের মতে, কাপাসিয়ার ঘটনাটি কোন ধরনের, সেটি এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। একটি আচরণ দেখে কারও মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। এ জন্য ব্যক্তির সামগ্রিক মানসিক অবস্থা, আচরণগত ইতিহাস ও অন্যান্য বিষয় পর্যালোচনা করতে হয়, যাকে মনোরোগবিদ্যায় ‘মেন্টাল অ্যাসেসমেন্ট’ বলা হয়।

ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, কিছু মানসিক রোগ বা অবস্থার সঙ্গেও সহিংস আচরণের সম্পর্ক থাকতে পারে। যেমন সাইকোসিস, সিজোফ্রেনিয়া বা মাদকনির্ভরতার মতো সমস্যায় আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি চরম সহিংস আচরণ করতে পারেন। তবে এ ঘটনায় এমন কিছু ছিল কি না, তা তদন্ত ও মূল্যায়ন ছাড়া বলা যাবে না।

কাপাসিয়ার ঘটনা প্রসঙ্গে ডা. হেলাল উদ্দিন আরও বলেন, আগেভাগে কাউকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে দিলে তদন্ত প্রভাবিত হতে পারে। এতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টিকেও ছোট করে দেখার ঝুঁকি থাকে।

দাম্পত্য সংকট ও সহিংসতার অভিযোগ

কাপাসিয়ায় যাঁরা হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেন, যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের সবার বাড়ি গোপালগঞ্জে। ওই ব্যক্তি কাপাসিয়ায় পরিবার নিয়ে পাঁচ বছর ধরে ভাড়া থাকতেন। তিনি প্রাইভেট কার চালাতেন। তাঁর শ্যালক গাজীপুরেই একটি কারখানায় কাজ করতেন। ৪০ বছর বয়সী ওই ব্যক্তির স্ত্রী ছিলেন ৩০ বছর বয়সী, তাঁদের সন্তান তিনটির বয়স ছিল যথাক্রমে ১৫, ৮ ও ২ বছর।

স্বজন ও প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ চলছিল। এর কারণ, তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে করার ইচ্ছা। তাঁদের ঝগড়ার শব্দ প্রায়ই শুনতে পেতেন বলে জানিয়েছেন প্রতিবেশীরা।

কয়েক মাস আগে স্ত্রীকে মারধরের ঘটনাও তিনি ঘটিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মারধর এমন পর্যায়ে ছিল যে তাঁর স্ত্রীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। এরপর স্ত্রী বাবার বাড়িতে চলে যান। পরে আবার তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয়।

ফেরার পর ওই নারী স্বামীকে বলেছিলেন, ‘তিনটা বাচ্চা নিয়ে আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, আমি তোমার সঙ্গেই থাকব।’ এই বাক্যের মধ্যে ছিল সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এবং একটি পরিবার বাঁচিয়ে রাখার আকুতি। তবে সেটা টিকে থাকেনি।

আরও পড়ুন

হত্যার পর কেন ফোন

লাশগুলোর পাশ থেকে গোপালগঞ্জ সদর থানা বরাবর করা অভিযোগের মতো একটি কাগজ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সেখানে লেখাটি পলাতক ওই ব্যক্তির বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে তাঁর স্ত্রী ও শ্বশুরবাড়ির বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ লেখা ছিল।

তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো না গেলেও মনোবিজ্ঞানে বলা হয়, অপরাধের পর অনেক সময় মানুষ নিজেকে রক্ষা করা, দায় সরানো বা ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে। এসব আচরণের কিছু অংশ সচেতনভাবে, আবার কিছু অংশ অবচেতন মন থেকেও আসতে পারে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে হত্যার পর ভাইকে ফোন করে নিজের অপরাধের কথা জানানোকে অনেকেই অপরাধবোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। ওই ব্যক্তি ভাইকে বলেছিলেন, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সবাইকে মাইরা ফেলছি। আমারে আর তোরা পাবি না।’

হত্যার পর স্বজনকে ফোন করার মনস্তত্ত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. হেলাল উদ্দিন বলেন, ঘটনার আগে ও পরে মানুষের মানসিক অবস্থা এক থাকে না। হত্যার আগে যে তীব্র রাগ, ক্ষোভ বা আবেগ কাজ করে, ঘটনার পর সেটি অনেক সময় কমে আসে। তখন অপরাধবোধ, আতঙ্ক বা মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধের পর মানুষ মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে বা ভেতরের অস্থিরতা কমাতে কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেন। একে আবেগের অবনমনও বলা যেতে পারে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, ভয়াবহ সহিংসতার পর অনেক অপরাধী হঠাৎ করেই বাস্তবতায় ফিরে আসেন। তখন অপরাধবোধ, আতঙ্ক, অনুশোচনা বা আত্মধ্বংসী মানসিকতা কাজ করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে খুনের পর আত্মহত্যার ঘটনাও দেখা যায় এ কারণেই।

আরও পড়ুন

সমাজ ও পরিবারের দায়

দাম্পত্য কলহ হত্যাকাণ্ডের দিকে মোড় নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাদেকা হালিম প্রথম আলোকে বলেন, পারিবারিক সহিংসতা সাধারণত হঠাৎ করে তৈরি হয় না। দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, দাম্পত্য অশান্তি, মানসিক চাপ ও সম্পর্কের টানাপোড়েন ধীরে ধীরে ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, বদ্ধ পারিবারিক পরিবেশে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ ও ক্ষোভ জমতে থাকে। এটি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হতে পারে, আবার পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও হতে পারে। এসব দমিত ক্ষোভ থেকেই অনেক সময় সহিংসতা তৈরি হয়।

সাদেকা হালিমের মতে, দেশে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বাড়লেও এটি প্রতিরোধে কার্যকর সামাজিক উদ্যোগ এখনো সীমিত। কিছু সেমিনার বা কাউন্সেলিং হয় ঠিকই, কিন্তু তা মূলত নির্দিষ্ট একটি শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ। নিম্নবিত্ত বা প্রান্তিক পরিবারগুলোতে এ ধরনের মানসিক সহায়তা খুব কম পৌঁছায়। অর্থনৈতিক চাপ, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, মাদকাসক্তি ও পারিবারিক টানাপোড়েন মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক মানুষ তখন পরিবারের বাইরে অন্য সম্পর্কে জড়ানো, দ্বিতীয় বিয়ে বা অন্য কোনো উপায়ে মানসিক আশ্রয় খুঁজতে চান; কিন্তু সেখান থেকেও নতুন দ্বন্দ্ব ও সংকট তৈরি হয়।

এমন পারিবারিক সংকট মোকাবিলায় পরিবার, সমাজ, প্রতিবেশী ও ধর্মীয় নেতাদেরও দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন অধ্যাপক সাদেকা হালিম। তাঁর ভাষায়, ঘরে অশান্তি হলে পরিবারের অন্য সদস্যরা অনেক সময় নিরপেক্ষ না থেকে পক্ষ নিয়ে ফেলেন। এতে সংকট আরও বাড়ে। এ ক্ষেত্রে কাউন্সেলিং ও সহমর্মিতার জায়গা তৈরি করা জরুরি।

তবে কোনো মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণই এই হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দেয় না। বরং এ ধরনের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, পরিবারের ভেতরের অশান্তি, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব ও মানসিক সংকটকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ, মানুষের বোধকে অন্ধকার গ্রাস করলে সবচেয়ে নিরাপদ ঘরটিও হয়ে উঠতে পারে ভয়ংকর।