সিলেটে তিন আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস, একটিতে এগিয়ে বিএনপি

সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন উল্লেখযোগ্য প্রার্থীছবি: সংগৃহীত

সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে তিনটিতে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য জোটের প্রার্থীর সমানে-সমানে লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। এর বাইরে একটি আসনে বিএনপি প্রার্থী কিছুটা এগিয়ে, আরেকটিতে বিএনপি প্রার্থী অনেকটাই নির্ভার আছেন। অন্য আসনটিতে বিএনপি-সমর্থিত শরিক দলের প্রার্থী বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।

রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আগামী বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সে চলবে ভোট গ্রহণ।

গত এক সপ্তাহে সিলেটের ছয়টি আসন ঘুরে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট) এবং সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। এ দুটি আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস আছে। তবে সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনে বিএনপির প্রার্থী তুলনামূলকভাবে স্বস্তিতে আছেন।

এ ছাড়া সিলেট-১ (মহানগর ও সদর), সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) এবং সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর) আসনে বিএনপি ও ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

সিলেট-১: মর্যাদার লড়াই

খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর (বাঁয়ে) ও হাবিবুর রহমান
ছবি: সংগৃহীত

সিলেট বিভাগের চার জেলার ১৯টি আসনের মধ্যে সিলেট-১ আসনটি স্থানীয়ভাবে ‘মর্যাদাপূর্ণ’ আসন হিসেবে পরিচিত। এ আসন নিয়ে জনশ্রুতি আছে—এখানে যে দলের প্রার্থী জয়ী হন, সেই দলই রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়। স্বাধীনতার পর থেকে কাকতালীয়ভাবে এমনটিই ঘটেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ আসনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর ও জামায়াতের প্রার্থী হাবিবুর রহমানের মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। মুক্তাদীর বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এবং হাবিবুর রহমান জেলা জামায়াতের আমির। দুজনই পেশায় ব্যবসায়ী।

মুক্তাদীরের বাবা এ আসনে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তাদীরও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে আসনটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সৎ, মার্জিত ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির রাজনীতিবিদ হিসেবে তাঁর সুনাম আছে। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী হাবিবুর রহমানও একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।

এ ছাড়া এ আসনে আরও ছয়জন প্রার্থী আছেন। তাঁরা হলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাহমুদুল হাসান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রণব জ্যোতি পাল, গণ অধিকার পরিষদের আকমল হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) সঞ্জয় কান্ত দাস এবং ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের শামীম মিয়া।

সিলেট-২: নির্ভার ইলিয়াস-পত্নী তাহসিনা

তাহসিনা রুশদীর লুনা (বাঁয়ে) ও মুহাম্মদ মুনতাছির আলী
ছবি: সংগৃহীত

এ আসনে বিএনপি প্রার্থী করেছে দলের ‘গুম’ হওয়া সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনাকে। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেলেও আইনি জটিলতার কারণে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেননি।

স্থানীয় ভোটারদের তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের ছয়টি আসনের মধ্যে সিলেট-২ আসনে বিএনপি প্রার্থী জয়ের ব্যাপারে সবচেয়ে স্বস্তিতে আছেন। অন্য প্রার্থীদের তুলনায় তাঁর জয়ের সম্ভাবনা বেশি। স্থানীয় বিএনপির গ্রহণযোগ্য নেতা হিসেবে সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীর ভাবমূর্তির প্রভাবেই তাহসিনা এগিয়ে আছেন বলে মনে করছেন অনেকেই। এ আসনে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে খেলাফত মজলিসের মুহাম্মদ মুনতাছির আলীর নাম আলোচনায় আছে।

এ আসনে আরও তিনজন প্রার্থী আছেন। তাঁরা হলেন জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির উদ্দিন এবং গণফোরামের মুজিবুল হক।

আরও পড়ুন

সিলেট-৩: প্রবাসীর সঙ্গে নবীন প্রার্থীর লড়াই

সিলেট-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন যুক্তরাজ্য বিএনপির সদ্য সাবেক সভাপতি এম এ মালিক। তিনি দীর্ঘ ১৯ বছর যুক্তরাজ্যে ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তিনি দেশে ফেরেন। এ আসনে বিএনপির শক্তিশালী মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক এম এ সালাম, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আবদুল আহাদ খান জামালসহ কয়েকজন মনোনয়ন চেয়েছিলেন।

স্থানীয় বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, মনোনয়ন পাওয়ার পর মালিকের পক্ষে মাঠে নেমেছেন কাইয়ুম, সালাম, আহাদসহ অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। তবে দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকায় মালিককে তৃণমূল পর্যায়ে কতটা গ্রহণ করা হয়েছে, তা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা আছে। প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও ভেতরে অসন্তোষ আছে—এমন কথাও শোনা যাচ্ছে।

এম এ মালিক (বাঁয়ে) ও মুসলেহ উদ্দীন
ছবি: সংগৃহীত

অন্যদিকে এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান লোকমান আহমদ দীর্ঘদিন মাঠে ছিলেন। তবে জোটগত সমঝোতার কারণে শেষ মুহূর্তে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হয়। ১১-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুসলেহ উদ্দীনকে প্রার্থী করা হয়। তিনি তুলনামূলকভাবে তরুণ ও কম অভিজ্ঞ।

জামায়াতের তৃণমূলের কর্মীদের মতে, এ আসনে তাঁদের ভালো ভোট আছে। শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তনের কারণে শুরুতে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল। ফলে এখানে সমানে-সমানে লড়াই হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

এ আসনে মোট ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্যরা হলেন জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আতিকুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রেদওয়ানুল হক চৌধুরী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মইনুল বাকর ও মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী।

সিলেট-৪: ‘মেয়র-চেয়ারম্যানের’ লড়াই

মূলত সিলেট-১ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী। তবে বিএনপি তাঁকে প্রার্থী করেছে সিলেট-৪ আসনে। আসনটি জামায়াতের জন্য সম্ভাবনাময় হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তাঁকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতও ধারণা করেনি বিএনপি এখানে আরিফুল হককে প্রার্থী করবে। আগে সম্ভাব্য বিএনপি প্রার্থীরা জামায়াতের প্রার্থী ও জৈন্তাপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীনের তুলনায় দুর্বল ছিলেন বলে ধারণা ছিল; কিন্তু শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তনের ফলে প্রতিযোগিতা জমে উঠেছে।

আরিফুল হক চৌধুরী (বাঁয়ে) ও জয়নাল আবেদীন
ছবি: সংগৃহীত

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘নির্বাচনের ম্যাজিক ম্যান’ হিসেবে আরিফুল হকের সুখ্যাতি রয়েছে। অল্প সময়েই তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ করে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছেন। অন্যদিকে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন তাঁকে ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ‘মেয়র-চেয়ারম্যানের লড়াই’ হিসেবে প্রচার পাচ্ছে।

এ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সাঈদ আহমদ এবং গণ অধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম।

আরও পড়ুন

সিলেট-৫: লড়াই হবে ত্রিমুখী

এ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি ওবায়দুল্লাহ ফারুক। ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আবুল হাসান। তাঁদের সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদের ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সূত্র জানায়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জোটের অংশ হিসেবে এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন ওবায়দুল্লাহ ফারুক। সে সময় বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েও শেষ পর্যন্ত জোট সমঝোতায় সরে দাঁড়ান মামুনুর রশীদ। এবার দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাঁকে সম্প্রতি বহিষ্কার করা হয়েছে।

ওবায়দুল্লাহ ফারুক (বাঁয়ে), মামুনুর রশীদ (মাঝে) ও মোহাম্মদ আবুল হাসান
ছবি: সংগৃহীত

রাজনৈতিকভাবে সচেতন ব্যক্তিদের ধারণা, এ আসনে তিন প্রার্থীর মধ্যেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। স্থানীয়ভাবে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হিসেবে মামুনুরের জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে জোট ঐক্যবদ্ধ থাকায় আবুল হাসান সুবিধাজনক অবস্থানে আছেন বলে মনে করছেন অনেকে। এ ছাড়া স্থানীয় মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের একটি ভোটব্যাংক তাঁর পক্ষে আছে বলেও আলোচনা আছে। ‘ফুলতলী হুজুরের’ অনুসারীদের ভোটও এখানে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে।

এ আসনে আরেকজন প্রার্থী আছেন—বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মো. বিলাল উদ্দিন।

সিলেট-৬: তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস

সিলেট-৬ আসনে বিএনপির প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমরান আহমদ চৌধুরী। এ আসনে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। শুরুতে কেউ কেউ তাঁর পক্ষে সক্রিয় না থাকলেও শেষ দিকে সবাই প্রচারে যুক্ত হয়েছেন।
অন্যদিকে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। সিলেটের আসনগুলোর মধ্যে এ আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

তবে এমরান ও সেলিম ছাড়াও স্বতন্ত্র প্রার্থী ফখরুল ইসলাম আলোচনায় আছেন। স্থানীয় ভোটারদের অনেকেই মনে করছেন, এ তিন প্রার্থীর মধ্যেই মূল লড়াই হবে।
এ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী আছেন। অন্য দুজন হলেন জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আবদুন নূর এবং গণ অধিকার পরিষদের জাহিদুর রহমান।

এমরান আহমদ চৌধুরী (বাঁয়ে),  মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন (মাঝে) ও ফখরুল ইসলাম
ছবি: সংগৃহীত

নেতারা কী বলছেন

বিএনপি ও জামায়াতের দুই নেতার সঙ্গে কথা বলে তাঁদের প্রার্থীদের সর্বশেষ অবস্থা ও মাঠের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চায় প্রথম আলো। উভয় দলের নেতারা নিজেদের প্রার্থীদের জয়ের ব্যাপারে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।

সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ শাহজাহান আলী বলেন, ‘আমাদের প্রার্থীদের পক্ষে গণজাগরণ তৈরি হয়েছে। সব প্রার্থীই জয় পাবেন।’

অন্যদিকে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রার্থীরা অনেক ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে ধানের শীষ ও একটিতে খেজুরগাছ প্রতীকের প্রার্থী আছেন। সবার বিজয় সুনিশ্চিত।’

আরও পড়ুন