অদম্য মেধাবী ২০২৬—৫
সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে সাফল্য পেলেও মুখে হাসি নেই
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে, যাদের জীবনের গল্প অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনের পঞ্চম পর্বে আজ থাকছে চার শিক্ষার্থীর কথা।
মা–বাবার সামর্থ্য সীমিত। কারও বাবা অটোরিকশাচালক, কারও বাবা দিনমজুর, কেউ রংমিস্ত্রি, আবার কেউ নির্মাণশ্রমিক। সংসারে অভাব আছে, আছে নানা দায়িত্বও। এসবের মধ্যেই পড়াশোনা চালিয়ে এসএসসিতে জিপিএ–৫ পেয়েছে চারজন। একজন চিকিৎসক হতে চায়, কেউ শিক্ষক, কেউ গাইনি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে; কিন্তু ভালো ফলের আনন্দের মধ্যেও তাঁদের ভাবতে হচ্ছে কলেজে পড়ার খরচ আসবে কীভাবে?
রেখাকে উৎসাহ দিয়েছেন মা–বাবা
বাবা মো. রেজাউল অটোরিকশাচালক। মা হালিমা খাতুন গৃহিণী। দুজনেরই পঞ্চম শ্রেণির পর আর পড়ালেখা হয়ে ওঠেনি; কিন্তু মেয়ের পড়ালেখায় উৎসাহ দিতে কখনো কার্পণ্য করেননি তাঁরা। সেই উৎসাহে মেয়ে রেখা আক্তার এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাদের বাড়ি ফরিদপুর সদরের অম্বিকাপুর ইউনিয়নের বিশ্বাসডাঙ্গী গ্রামে।
দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে রেখা সবার বড়। নিয়মিত ক্লাস করা ও দুই শিক্ষকের কাছে পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিদিন পাঁচ–ছয় ঘণ্টা পড়াশোনা করত সে। রেখা স্বপ্ন দেখে একজন গাইনি চিকিৎসক হওয়ার। সে প্রথম আলোকে বলে, মা ও বাবার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ছাড়া তাঁর পক্ষে এ সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হতো না। সে গ্রামের অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতি মায়েদের দুঃখ, কষ্ট ও বেদনা দেখেছে। এ জন্য ছোটবেলা থেকে সে একজন গাইনি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখে এসেছে।
খার মা হালিমা বেগম জানান, ‘ছোটবেলা থেকে মেয়ের ইচ্ছা গাইনি চিকিৎসক হওয়ার। মেয়ের স্বপ্ন একসময় আমাদের স্বপ্নও হয়ে দাঁড়ায়। তাই আমরা ওকে উৎসাহ দিতে কোনো কার্পণ্য করিনি। অভাবের সংসারে যতটা সম্ভব ওর যত্ন নেওয়ার চেষ্টা করেছি; কিন্তু সামনে তো অনেক খরচ। কলেজ ও মেডিক্যালের জন্য। এ খরচ কীভাবে মেটাতে পারব, তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।’
স্থানীয় আনসার উদ্দীন উচ্চবিদ্যালয় থেকে চলতি বছর দুজন জিপিএ–৫ পেয়েছে। তাদের একজন রেখা। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবু জাফর শেখ বলেন, রেখা অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। তবে পরিবারটি আর্থিকভাবে সচ্ছল নয়। কলেজ ও মেডিক্যালে পড়ার অনেক খরচ। এ খরচ বহন করার জন্য সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তিদের এগিয়ে আসা উচিত।
টিউশনি করে জিপিএ–৫ খাদিজার
পরিবারের বড় সন্তান খাদিজা আক্তার (১৭)। নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে এলাকায় টিউশনি করেছে সে। সময় পেলেই গৃহিণী মায়ের হাঁস–মুরগি পালনে সহযোগিতা করেছে। দিনমজুর বাবার কৃষিকাজেও পাশে থেকেছে খাদিজা। এভাবে পড়াশোনা করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে সে।
খাদিজা রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামের দরিদ্র দিনমজুর খবির উদ্দিন মোল্লার মেয়ে। গোয়ালন্দ উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে বাবার সামান্য আট শতক জমির ওপর কোনোভাবে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে খবির উদ্দিন মোল্লার। নিজের জমি না থাকায় মানুষের প্রায় তিন বিঘা জমি বার্ষিক বন্দোবস্ত নিয়ে শাকসবজির আবাদ করেন তিনি। পাশাপাশি দিনমজুর হিসেবে কাজ করে সংসার চালান। স্ত্রী বিলকিস বেগম বাড়িতে কিছু হাঁস-মুরগি ও ছাগল পালন করে সাধ্যমতো সহযোগিতা করেন তাঁকে।
গোয়ালন্দ নাজির উদ্দিন পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল খাদিজা আক্তার। তিন বোনের মধ্যে সবার বড় খাদিজা বলে, সংসার খরচ ও তিন বোনের খরচ চালানো বাবার পক্ষে অসম্ভব। এখন সে গোয়ালন্দ সরকারি কামরুল ইসলাম কলেজে ভর্তি হতে চায়। যাতে মা–বাবাসহ ছোট দুই বোনের খোঁজখবর রাখতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ভবিষ্যতে কলেজে শিক্ষকতা করতে চায় খাদিজা।
খবির উদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘সবাই বলেন, আমার খাদিজা নাকি অনেক মেধাবী। ওদের পড়াশোনার খরচ মেটানো এবং সংসার চালানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তারপরও যত দূর পড়াশোনা করতে চায় আমি করাব।’
সাফল্য পেলেও মুখে হাসি নেই শাম্মির
তিন শতক জমিতে টিনের ঘরে বেড়ে ওঠা। বাবার রঙের কাজের আয় দিয়ে কোনো রকমে চলে সংসার। নেই আবাদি জমি। তিন বেলার খাবার ঠিকঠাক জোটে না। সেই পরিবারেই জন্ম নেওয়া শাম্মি আক্তার এবারে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে।
রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ইকরচালী ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামের খাজের আলীর মেয়ে শাম্মি আক্তার। এসএসসিতে সাফল্য পেলেও মুখে হাসি নেই তার। এখন দুশ্চিন্তা একটাই—কলেজে ভর্তি হবে কীভাবে? কীভাবে চালাবে পড়ার খরচ।
শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও পরিবারে সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খাজের আলী পেশায় রংমিস্ত্রি। সহায়সম্বল বলতে তিন শতক জমিতে টিনের চাল ও বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা দুটি ঘর। সেই ঘরে ছয় সদস্যের বসবাস। কাজ পেলে খাবার জোটে, না হলে অনাহারে দিন কাটে।
ইকরচালী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী ছিল শাম্মি। সে বলে, ‘আমি শিক্ষক হতে চাই; কিন্তু এই অভাবের সংসারে কলেজে ভর্তি হওয়াই এখন অনিশ্চিত।’
শাম্মির মা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘ছাওয়াটার (মেয়ের) অনেক আশা। ভালো কলেজে পড়বে, চাকরি করবে; কিন্তু আমি তো ভাতই দিতে পারি না। ভাতের টাকাও ঠিকমতো জোটে না, ওরে কলেজে পড়াব কেমনে কন?’
ইকরচকলী উচ্চবিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘শাম্মি আক্তার খুব মনোযোগী ছাত্রী ছিল। তার ফলাফল দেখে আমরা গর্বিত; কিন্তু এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, সমাজের মানুষ এই ছেলেটির পাশে দাঁড়াক।’
ভালো ফল, তবু দুশ্চিন্তা চাম্পার
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন চাম্পা রানীর। এ বছর এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ–৫ পেয়েছে সে; কিন্তু কলেজে ভর্তি হওয়ার সামর্থ্য পরিবারের নেই। তাই ভালো ফল করেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে চাম্পা।
চাম্পা নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বোরাগাড়ি ইউনিয়নের বাগডোকরা দোলাপাড়া গ্রামের নির্মাণশ্রমিক (রাজমিস্ত্রি) লক্ষিন্দ্র রায়ের মেয়ে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবা ঢাকায় রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তাঁর আয়েই কোনোভাবে সংসার চলে।
চাম্পাদের বাড়ি বিদ্যালয় থেকে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে। অর্থাভাবে এত দিন হেঁটেই বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করেছে সে। ডোমার সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেলেও অর্থের কারণে প্রতিবেশীদের মিষ্টিমুখ করাতে পারেনি বলে জানায় চাম্পা। সে বলে, ‘লেখাপড়া করে একজন চিকিৎসক হয়ে আমাদের মতো গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাই।’
দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে চাম্পা সবার বড়। তাদের মা শৈবা বালা বলেন, ‘ছেলে মেয়েদের ভালোমন্দ খাওয়াতে পারি না। তারা অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করছে। মেয়েটা এত দিন খেয়ে না খেয়ে হেঁটে স্কুলে যাওয়া–আসা করেছে। এখন সে ভালো কলেজে ভর্তি হতে চায়। কিন্তু আমাদের সে সামর্থ৵ নেই।’
ডোমার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছা. আফরোজা বুলবুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়েটা অনেক ভদ্র ও মেধাবী। আমাদের বিদ্যালয়ে তার উপবৃত্তি ছিল। এখন কলেজে ভর্তি হলে তার খরচ লাগবে। যা তার বাবার জন্য কষ্টসাধ্য।’
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ফরিদপুর এবং প্রতিনিধি, নীলফামারী, রাজবাড়ী ও তারাগঞ্জ, রংপুর]