‘আমরা সন্তানহারা মা–বাবা বাধ্য হয়ে বেঁচে আছি’

বাবার কোলে ফাইয়াজ হাসান তাজিম। ৮ মাস ১৮ দিন বয়সী তাজিম হামে মারা গেছে গত ২২ এপ্রিলছবি: সংগৃহীত

বিয়ের প্রায় ১১ বছর পর ফারজানা ইসলাম-হেলাল ভূঁইয়া দম্পতি প্রথম সন্তানের মুখ দেখেছিলেন। নাম রাখা হয় ফাইয়াজ হাসান তাজিম। মা ছেলের নামে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নাম রাখেন ‘তাজিম এর আম্মু’। ৮ মাস ১৮ দিন বয়সী তাজিম হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় গত ২২ এপ্রিল। টেস্টটিউব বেবি বা আইভিএফ পদ্ধতিতে জন্ম নেওয়া তাজিমের জন্মদিন ছিল ৪ আগস্ট।

ফারজানা ইসলাম গতকাল বুধবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘হামে মৃত্যু এক হাজার পার হইছে। দেখতেছি তো। এ নিয়ে বলে তো কোনো লাভ হবে না। বাঁচতে হবে, তাই আমরা সন্তানহারা মা–বাবা বাধ্য হয়ে বেঁচে আছি।’

আরও পড়ুন

গত মার্চ মাসে তাজিমকে নিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন ফারজানা-হেলাল দম্পতি। চাঁদপুর থেকে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করে চিকিৎসা করিয়েছেন। নিউমোনিয়ার চিকিৎসার জন্য খরচের বাইরে ১৭ দিন শুধু হামের চিকিৎসায় বিভিন্ন হাসপাতালে খরচ হয়েছে চার লাখ টাকার বেশি। তাজিমের হামের জন্য প্রথম ডোজের টিকা পাওয়ার তারিখ ছিল ১ মে। তার আগেই নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড মোড়ের প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (পিআইসিইউ) মারা যায় সে।

শুধু ফারজানা-হেলাল দম্পতি নন, এমন অনেক মা–বাবা সন্তানের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে হাসপাতালে ঘুরেছেন। কিন্তু সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসাসেবা পাননি।

আরও পড়ুন
হাসপাতালে হামে আক্রান্ত মেয়ে আকিরাকে নিয়ে বাবা। ২ এপ্রিল মারা যায় শিশুটি
ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

হাম যে এতটা ভয়ংকর হতে পারে, তা জানা ছিল না আকিরার মা সানজিদা হকের। ৪ বছর ৩ মাস বয়সী আকিরা হায়দার আরশি ২ এপ্রিল রাজধানীর মিরপুরে ডা. এম আর খান শিশু হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথের পিআইসিইউতে মারা যায়।

আকিরা বিভিন্ন হাসপাতালে ২৭ দিন নিউমোনিয়া ও হামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। সানজিদা হক বলেন, তাঁর মেয়ে বাঁচতে চাইত। নিজেই ওষুধ খেত। অক্সিজেন মাস্ক নিজে চেপে ধরত। ‘আমাদের মেয়েটা তো চলে গেছে। বলার তো আর কিছু নাই। হাম যে এত ভয়াবহ, তা–ই তো বুঝি নাই;’ বলেন সানজিদা হক।

সানজিদা জানান, মেয়ের হার্টে ছিদ্র ধরা পড়ার পর নির্ধারিত সময়ে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। তারপর ছোট ছেলের সঙ্গে মেয়েকেও এ টিকা দিতে চাইলে টিকাকেন্দ্র থেকেবলা হয়েছিল, ‘টিকার সংকট আছে, আগে ছেলেকে দিন।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছোট্ট ফাতেমা। ২৩ এপ্রিল মারা যায় ৮ মাস বয়সী শিশুটি
ছবি: পরিবারের সৌজন্যে

ঠান্ডা-জ্বরের জন্য হাসপাতালে ভর্তি থাকার সময়ই মেয়ের হাম হয়েছে বলে জানান সানজিদা হক। তিনি বলেন, হাসপাতালগুলোতে শিশুদের হামের চিকিৎসা বেহাল। একই ওয়ার্ডে হাম ও অন্য শিশুদের রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

আকিরার বাবা আল আমিন ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, যে বয়সে হাত ধরে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেই বয়সে মেয়ের মৃতদেহ কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে। এই বাবা-মায়ের আক্ষেপ, আর একটিবার যদি মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে পারতেন!

২৩ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে সাইনবোর্ড মোড়ে বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতালের পিআইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ৮ মাস বয়সী ফাতেমা। আর যমজ খাদিজা বেঁচে ফিরলেও পুরোপুরি সুস্থ নয়। সে ওই হাসপাতালে ভর্তি ছিল ৩৬ দিন। 

আরও পড়ুন

ফাতেমার মতো খাদিজারও যদি কিছু হয়, এমন আশঙ্কায় থাকেন খাদিজার নানি সোনিয়া আক্তার ও মা সায়মা বেগম। সোনিয়া প্রথম আলোকে জানান, গত এপ্রিলে দুই নাতিকে ভর্তি করতে ঘুরতে হয় রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন হাসপাতালে। এক হাসপাতালে বলা হয় সিট নেই, অন্য হাসপাতালে অক্সিজেন নেই, কোথাও আবার পিআইসিইউ খালি নেই। এ দুজনের সঙ্গে একই সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সায়মার বড় মেয়ে তিন বছর বয়সী আয়েশাও। বিভিন্ন জটিলতায় আয়েশা এখন আবার ভর্তি আছে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে।

গতকাল সোনিয়া আক্তার বলেন, ‘এই শিশু হাসপাতালে বড় নাতিরে ভর্তি করতে আইস্যা আবার ফাতেমার কথা মনে কইরা কান্নাকাটি করছি। ভুলন তো যায় না। দেশে হামে এত শিশু মইরা যাইতেছে, সরকার ভালো কইরা তো কোনো উদ্যোগও নিল না। এহন তো আবার শুরু হইছে ডেঙ্গু।’

রাজধানীর আজিমপুর ছোটমণি নিবাসের ৮ মাস বয়সী মাহির, ৯ মাস বয়সী খুশবু, এক বছরের একটু বেশি বয়সী আরিশা, ৩ মাস ১৮ দিন বয়সী মুনা ও ৫ মাস বয়সী মেহেদি চলতি বছরের বিভিন্ন সময় রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে হাম ও হাম-সংক্রান্ত জটিলতায় মারা গেছে।

আরও পড়ুন

সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে মাতা–পিতার পরিচয়হীন ০ থেকে ৭ বছর বয়সী পরিত্যক্ত বা পাচার থেকে উদ্ধার হওয়া শিশুদের আদালতের আদেশে ছোটমণি নিবাসে লালন-পালন করা হয়। এই খুশবুরা মারা যাওয়ার পর তাদের কাফনের কাপড় খুলে শেষবারের মতো ছোট্ট মুখটি দেখবেন, এমন স্বজনও নেই। নিয়ম অনুযায়ী পরিবার বা দাবিদার না থাকায় বেসরকারি সংস্থা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সহায়তায় ওদের দাফন হয়েছে বেওয়ারিশ হিসেবে।

ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিন প্রথম আলোকে বলেন, নিবাসে এক জায়গায় নানা বয়সী অনেক শিশু থাকছে। হামের মতো সংক্রামক রোগ থেকে ওদের রক্ষা করা খুবই কঠিন কাজ। তবে আপাতত হামে আর কোনো শিশু মারা যায়নি বা আক্রান্ত হয়েছে, এমন শিশু নেই। বর্তমানে নিবাসে নতুন শিশু এলেই ওদের আইসোলেশন বা পৃথকভাবে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।