রোল ২২ থেকে ২, নিজের এই সাফল্য দেখতে পারল না ছোট্ট আয়েশা

আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া শিশু আয়েশা আক্তারছবি: সংগৃহীত

বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ফলাফলে বলা হয়েছে, রোল নম্বর ২২, আয়েশা আক্তার দ্বিতীয় হয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠেছে। এই সাফল্যে শিক্ষক, সহপাঠী আর অভিভাবকদের মুখে আনন্দের হাসি থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—কারও চোখেই আনন্দ নেই, আছে অশ্রু।

এই ফলাফল দেখার জন্য আয়েশা নেই। নতুন বই-খাতা নিয়ে তৃতীয় শ্রেণির কক্ষে গিয়ে রোলকল দুই শোনামাত্র ‘উপস্থিত’ বলার মতো ছোট্ট মানুষটি আর নেই। রাতের অন্ধকারে ঘরের ভেতর আগুনে পুড়ে প্রাণ হারিয়েছে ছোট্ট আয়েশা। তাই তার সাফল্যের খবর এখন শুধুই নীরব শোকের বার্তা হয়ে আছে।

আয়েশার বাবা বেলাল হোসেন গত বৃহস্পতিবার মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘মেয়ের রেজাল্ট হইছে। ভালো করছে। সেকেন্ড হইছে। কিন্তু এই রেজাল্ট দিয়া আর কী হবে?’

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের চরমনসা গ্রামের সূতারগোপ্টা এলাকার বেলাল হোসেনের তিন মেয়ের মধ্যে সাত বছর বয়সী আয়েশা ছিল সবার ছোট। বেলাল ভবানীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক। সূতারগোপ্টা বাজারে তাঁর সারের দোকান রয়েছে।

ঘরে আগুন ও আকুতি

গত ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে বেলাল হোসেনের বাড়িতে আগুন লাগে। তিনি অভিযোগ করেন, ঘরের দরজায় কেউ বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ও পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই আগুনে আয়েশা পুড়ে মারা যায়।

সেই রাতে পাকা ভিত্তির বড় চৌচালা টিনের বাড়ির তিনটি কক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন বেলাল হোসেন, তাঁর স্ত্রী নাজমা বেগম, তিন মেয়ে ও দুই ছেলে আগুন লাগার পর বেলাল তাঁর স্ত্রী, চার বছর বয়সী ছেলে নাজমুল ইসলাম, চার মাস বয়সী ছেলে নজরুল ইসলাম, বড় মেয়ে সালমা আক্তার ও মেজ মেয়ে সামিয়া আক্তারকে ঘরের টিনের বেড়া উঁচু করে কোনো রকমে বের করতে পেরেছিলেন। ছোট মেয়ের আকুতি শুনেছিলেন তিনি—বাঁচানোর জন্য ডেকেছিল আয়েশা। কিন্তু আগুনের তীব্রতায় কাছে যেতে পারেননি। বাবার চোখের সামনেই পুড়ে মারা যায় শিশুটি।

মেয়ের রেজাল্ট হইছে। ভালো করছে। সেকেন্ড হইছে। কিন্তু এই রেজাল্ট দিয়া আর কী হবে?
—বেলাল হোসেন, আয়েশা আক্তারের বাবা

দগ্ধ হন বড় মেয়ে সালমাও। রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে তার মৃত্যু হয়। গত ৫ ডিসেম্বর মুঠোফোনের মাধ্যমে বিদেশে থাকা পাত্রের সঙ্গে সালমার বিয়ে হয়েছিল। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক রবিউল করিম প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, সালমার শ্বাসনালিসহ শরীরের ৯০ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। শরীরে এমন কোনো জায়গা ছিল না, যেখানে দগ্ধ হয়নি।

গত ১৯ ডিসেম্বর গভীর রাতে ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নের বিএনপির সহসাংগঠনিক সম্পাদক বেলাল হোসেনের বাড়িতে আগুন লাগে। এ ঘটনার পর তিনি অভিযোগ করেছেন, ঘরের দরজায় কেউ বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ও পেট্রল ঢেলে নাশকতার জন্যই আগুন দিয়েছে। সেই আগুনেই আয়েশা পুড়ে মারা গেছে। পরে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৫ ডিসেম্বর রাতে বড় মেয়ে সালমারও মৃত্যু হয়।

ছয় দিনের ব্যবধানে দুই মেয়েকে হারান বেলাল হোসেন ও নাজমা বেগম দম্পতি। তাঁদের মেজ মেয়ে সামিয়া আক্তারের শরীরের ২ শতাংশ পুড়েছিল, তবে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়নি।

আয়েশা আক্তারের বার্ষিক পরীক্ষার রিপোর্ট কার্ড
ছবি: সংগৃহীত

বাবার আক্ষেপ

বেলাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘যার দুইটা সন্তান একসঙ্গে মারা যায়, তার তো আর কিছু থাকে না। এক মেয়েকে ১৮ বছর ধরে বড় করলাম। বিয়ে দিলাম। আরেক মেয়ে চোখের সামনে একটু একটু কইরা বড় হইতেছিল। ছোট মেয়েটা আব্বু আব্বু ডাকছে তারে বাঁচানোর জন্য। বড় মেয়ে মারা যাওয়ার এক বা আধা ঘণ্টা আগেও ভিডিও কলে কথা বলছি। মেয়েটা বলছিল, আমার ঢাকা যাওয়ার দরকার নাই, ও নিজেই বাড়ি আসবে।’

যাঁর দুইটা সন্তান একসঙ্গে মারা যায়, তার তো আর কিছু থাকে না। এক মেয়েকে ১৮ বছর ধরে বড় করলাম। বিয়ে দিলাম। আরেক মেয়ে চোখের সামনে একটু একটু কইরা বড় হইতেছিল। ছোট মেয়েটা আব্বু আব্বু ডাকছে তারে বাঁচানোর জন্য। বড় মেয়ে মারা যাওয়ার এক বা আধা ঘণ্টা আগেও ভিডিও কলে কথা বলছি। মেয়েটা বলছিল, আমার ঢাকা যাওয়ার দরকার নাই, ও নিজেই বাড়ি আসবে।
—বেলাল হোসেন, আয়েশা আক্তারের বাবা

ছোট মেয়ে আয়েশার জানাজা ও দাফনের সময় বেলাল নিজে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। বড় মেয়েকে ঢাকায় নেওয়ার সময়ও যেতে পারেননি। আইসিইউতে মারা যাওয়ার খবর পেয়েও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ঢাকায় পৌঁছাতে পারেননি তিনি।

দুই মেয়েকে পাশাপাশি কবর দেওয়া হয়েছে বলে জানান বেলাল হোসেন।

ছোট মেয়ে আয়েশার জানাজা ও দাফনের সময় বেলাল নিজে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। জানাজায় অংশ নিতে পারেননি। বড় মেয়েকে ঢাকায় নেওয়ার সময়ও যেতে পারেননি। আইসিইউতে মারা যাওয়ার খবর পেয়েও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ঢাকায় পৌঁছাতে পারেননি তিনি।

আগুনে ঘরবাড়ি পুড়ে যাওয়ার পর বেলাল হোসেন স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে বর্তমানে পোড়া ঘরের পাশে ভাইয়ের বাড়ির বারান্দায় থাকছেন। তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘কোনো দিন কি ভাবছিলাম, অন্যের জামা গায়ে দেওয়া লাগব, ছেলেমেয়েদের এমন অবস্থা হবে।’

আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা গেছে আয়েশার বড় বোন সালমা আক্তারও
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন

পুড়ে যাওয়া স্বপ্ন

বেলাল হোসেনের তিন মেয়েই পড়াশোনা করেছে স্থানীয় ফাইভ স্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজে। বড় মেয়ে সালমা এই স্কুলে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। মৃত্যুর আগে অন্য একটি কলেজে পড়াশোনা করতেন। মেজ মেয়ে সামিয়া আক্তারের অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। আগুনে পোড়ার পর হাসপাতালে যাওয়া-আসা ও শরীর খারাপ থাকায় সে আর বৃত্তি পরীক্ষা দিতে পারেনি।

ছোট মেয়ে আয়েশা ছিল পড়াশোনায় মনোযোগী। আগুন লাগার আগের দিন তার দ্বিতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হয়েছিল। দ্বিতীয় শ্রেণিতে রোল নম্বর ২২ ছিল। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, সে তৃতীয় শ্রেণিতে দ্বিতীয় অবস্থান নিয়ে পাস করেছে। ছয়টি বিষয়ের মোট ৫০০ নম্বরের মধ্যে ৪৪৩ নম্বর পেয়েছে।

আরও পড়ুন
দুই মেয়েকে পাশাপাশি কবর দেওয়া হইছে। বড় মেয়েকে বাড়িতে আনার পর প্রথম ভাবছিলাম ওরে দেখব না। পরে মনে হইল আর তো কখনো মেয়েকে দেখতে পাব না। তখন মেয়েটার মুখটা দেখি। মনটা জ্বলে যায়। শুধু একবার তাকাই, দ্বিতীয়বার তাকানোর আর সাহস পাই নাই।
—বেলাল হোসেন, আয়েশা আক্তারের বাবা

বেলাল হোসেন বলেন, ‘মেয়েটা পড়াশোনায় মনোযোগী ছিল। বড় হয়ে ডাক্তার বা শিক্ষক হইতে চাইছিল। কোনোটাই তো হলো না। মেজো মেয়েটা বৃত্তি পরীক্ষাটা দিতে পারল না।’

ফাইভ স্টার স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নোমান ছিদ্দিকী মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সালমা, সামিয়া আর আয়েশা—তিন বোনই এই স্কুলে পড়েছে। আয়েশা ভালো ফলাফল করেছে। আমরা এ নিয়ে আনন্দ প্রকাশ করতে পারছি না। আয়েশার বন্ধুরা প্রায়ই তার কবরের কাছে গিয়ে বসে থাকে। সামিয়ার অষ্টম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষাটা দেওয়া হলো না। সালমাও নেই। সব মিলে মর্মান্তিক একটি ঘটনায় পুরো পরিবার চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে গেল। আমরা এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’

বেলাল হোসেনের পুড়ে যাওয়া ঘরে পুলিশের তল্লাশি
ছবি: প্রথম আলো
আরও পড়ুন

তালা, মামলা

ঘটনার পর গত ২২ ডিসেম্বর তল্লাশি চালিয়ে ঘটনাস্থল থেকে তিনটি তালা (একটি তালার মধ্যে চাবি লাগানো) উদ্ধার করেছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. রেজাউল হক প্রথম আলোকে বলেছিলেন, উদ্ধার করা তালাগুলো ঘটনার সঙ্গে কীভাবে সংশ্লিষ্ট, তা যাচাই করা হচ্ছে। আগুন দেওয়ার ঘটনাটি পরিকল্পিত কি না এবং এর পেছনে কারা জড়িত—সবদিক গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অবশ্য ঘটনার পর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হোসাইন মোহাম্মদ রায়হান কাজেমীর সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, আগুনের ঘটনায় নাশকতার কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য’ আলামত পায়নি পুলিশ।

অগ্নিকাণ্ডের চার দিন পর ২৩ ডিসেম্বর রাতে সদর থানায় মামলা করেন বেলাল হোসেন। মামলার অগ্রগতি প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রায়হান কাজেমী প্রথম আলোকে বলেন, পাঁচজনকে সন্দেহভাজনসহ অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা হয়েছে। আশা করা যাচ্ছে, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সুবিচার পাবেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত কোনো আসামি ধরা পড়েনি।

সন্দেহভাজন আসামিদের প্রসঙ্গে বেলাল হোসেন বলেন, ‘জমিজমাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কয়েকজনের সঙ্গে আগে থেকেই ঝামেলা ছিল। ডিজিটাল যুগ, পুলিশ তদন্ত করে বের করুক আসল অপরাধী কারা।’

আরও পড়ুন