প্রথম আলো: ঘটনার দিন ফারদিনের গতিবিধির সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ফুটেজ কি আপনাকে দেখানো হয়েছে?

কাজী নূর উদ্দিন: আমাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে একটি ফুটেজ দেখানো হয়েছে। সেটি যাত্রাবাড়ী এলাকার ছিল। সেটিকে আমি ফারদিন বলে ৯০ শতাংশ নিশ্চিত করেছি। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ফুটেজ তারা আমাকে মুঠোফোনে দেখিয়েছে। ফুটেজটা যদি বড় কোনো স্ক্রিনে দেখানো হতো, তাহলে আরও স্পষ্ট বোঝা যেত।

ফুটেজে দেখা যাচ্ছিল ফারদিন হাঁটছে, তবে তার হাঁটা স্বাভাবিক ছিল না। লেগুনায় ওঠার আগে কালো পোশাক পরা একজনের সঙ্গে কথা বলেছে আমার ছেলে। পরে কালো পোশাক পরা ছেলেটি সাদা গেঞ্জি পরা ছেলেটিকে কী যেন নির্দেশনা দিল। এরপর সাদা গেঞ্জি পরা ছেলেটির সঙ্গে কথা বলে ফারদিন লেগুনায় উঠল। সেখানে দুই ব্যক্তির সঙ্গে ফারদিনের কথা হলো। সাদা গেঞ্জি পরা ছেলেটি ও ফারদিনকে ফুটেজে শনাক্ত করা হলো। কিন্তু আরেকজন যে ছিলেন, তিনি কোথায় চলে গেলেন, তাঁকে খোঁজা হলো না।

প্রথম আলো: আপনার এসব সন্দেহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানিয়েছেন?

কাজী নূর উদ্দিন: শুরুতে পুলিশ ও র‍্যাব আমাকে ডেকে কথা বলেছে। তারপর আমার সঙ্গে তদন্ত সংস্থাগুলো কমই যোগাযোগ করেছে। ফারদিনের ব্যবহৃত ল্যাপটপ নেওয়ার ক্ষেত্রে যোগাযোগ করেছে। এ ছাড়া ঘটনার দিনের গতিবিধি নিয়ে জানতে চেয়েছে এবং কোনো বিষয় নিয়ে ছেলের মধ্যে হতাশা ছিল কি না, জানতে চেয়েছে।

ফারদিনের প্রায় ছয় ফুট দেহটার মধ্যে শুধু বুকে আর মাথায় আঘাত করা হলো। আর কোথাও আঘাত করার জায়গা পেল না। তাহলে কি তার হৃদয় যা বলে এবং তার মস্তিষ্কে যা আছে, সেটা কি কেউ সইতে পারেনি? সেটিই কি হত্যার কারণ?

প্রথম আলো: সর্বশেষ ফারদিনের সঙ্গে কী কথা হয়েছিল?

কাজী নূর উদ্দিন: ৪ নভেম্বর দুপুরে মায়ের সঙ্গে ভাত খেয়ে বুয়েট ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিল ফারদিন। বের হওয়ার সময় ওর মাকে বলেছিল, পরীক্ষা শেষ করে শনিবার দুপুরে বাসায় ফিরে একসঙ্গে খাবে। ঘটনার দিন রাত ১১টার দিকে ফারদিনের নম্বর থেকে ওর মায়ের নম্বরে কল এসেছিল। তখন ব্যস্ততার কারণে ফোন ধরতে পারেনি ওর মা। কিছুক্ষণ পরে ওর মা ফোন দিলে ফারদিন আর ফোন ধরেনি।

আমি বাসার বাইরে থাকায় আমার সঙ্গে ছেলের কথা হয়নি। তা ছাড়া ফারদিন ওর মাকে সবকিছু জানাত। সব সময় চাইত মায়ের মুখে হাসি দেখতে।

প্রথম আলো: ফারদিনের বেড়ে ওঠা, এরপর বুয়েট ভর্তি হওয়া। বাবার চোখে ছেলের এই বেড়ে ওঠা কেমন ছিল?

কাজী নূর উদ্দিন: ফারদিন আমার প্রথম সন্তান। তিন ভাইয়ের মধ্যে সে বড়। নারায়ণগঞ্জের পাগলা এলাকায় আমাদের বাড়ি রয়েছে। তবে পেশাগত দায়িত্ব ও সন্তানদের লেখাপড়ার স্বার্থে কখনো ঢাকার মিরপুর, কখনো পেয়ারাবাগে এবং দীর্ঘদিন ধরে ডেমরার কোনাপাড়ায় থাকছি। সেখানকার একটি অখ্যাত স্কুল থেকে আমার ছেলে বুয়েট পর্যন্ত এসেছিল।

একটা খুব মজার ব্যাপার ছিল যে আমি যখন বাইরে থেকে বাসায় ফিরতাম, আমার ছোট দুই ছেলে ব্যাগে খাবার খুঁজত, আর ফারদিন খুঁজত বই কিংবা পত্রিকা। আমার ব্যাগে বই বা পত্রিকা না পেলে ওর মন খুব খারাপ হতো। ছেলেটা পুরোপুরি একজন পাঠক ছিল। ফারদিন ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে যেত। টিএসসিতে আবৃত্তি শিখত। নিজের ব্যস্ততার কারণে ছেলের খুব বেশি খোঁজ রাখতে পারিনি, তবে সে নিজেই নিজেকে তৈরি করেছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে চলতে পারত।

সন্তানদের তিলে তিলে গড়ে তুলতে ওর মা তাঁর জীবনের সব কষ্ট মেনে নিয়েছিল। ওর মা বলত, আমাদের কষ্টের দিন শেষ হয়ে আসছে। ফারদিনের বিতর্ক প্রতিযোগিতার ভিডিও দেখে ওর মা শুধু কান্না করে।

স্পেনের মাদ্রিদে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের কথা ছিল। সেখান থেকে একটা সুনাম নিয়ে আসতে পারত বাংলাদেশ। আমি শুধু সন্তান হারাইনি, দেশ হারিয়েছে এক মেধাবীকে। এটা সবচেয়ে বেশি কষ্টের।