দেশে ১৩ মাসে ৩২ ভূমিকম্প, উৎপত্তি কম ঝুঁকির অঞ্চলেও

দেশে ভূমিকম্পের চিত্র

ভূমিকম্পপ্রবণ তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে আছে বাংলাদেশ। তাই এ দেশে যে ভূমিকম্প মাঝেমধ্যে হবে, সেটাকে স্বাভাবিক বলেই মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, সম্প্রতি দেশের মধ্যে ভূমিকম্পের উৎপত্তির প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে ভূমিকম্পের কম ঝুঁকির অঞ্চল হিসেবে পরিচিত দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্প বেড়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তে থাকা দুই প্লেটের মধ্যে বিপরীতমুখী টানের (টেনশনাল ফোর্স) মধ্যে পড়ে গেছে এই দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চল। এ কারণে এই অঞ্চলে ভূমিকম্পপ্রবণতা বেড়ে গিয়ে থাকতে পারে। আবার তাঁরা এ–ও মনে করছেন যে দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে নতুন কোনো ফাটল সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। কিংবা পুরোনো ফাটল নতুন করে সক্রিয় হয়ে থাকতে পারে।

আরও পড়ুন

দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের এসব ভূমিকম্প ভীতিকর নয় বলে ধারণা করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাঁদের মত, দেশের ভেতরে এবং আশপাশে ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াটা বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দেয়। আর সেই ভূমিকম্পের মোকাবিলা করার যথাযথ প্রস্তুতি দরকার। যার যথেষ্ট ঘাটতি আছে।

আশঙ্কার বিষয় হলো, সম্প্রতি দেশের মধ্যে ভূমিকম্পের উৎপত্তির প্রবণতা বেড়েছে। বিশেষ করে ভূমিকম্পের কম ঝুঁকির অঞ্চল হিসেবে পরিচিত দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলে ভূমিকম্প বেড়ে গেছে।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে। এরপর ভূমিকম্পের আশঙ্কা ও তা মোকাবিলার বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। গতকাল ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলা। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৪। এটিকে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প বলা হয়।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কম্পন অনুভূত হলেও স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি মাত্রায় অনুভূত হয় উৎপত্তিস্থল সাতক্ষীরায়। সেখানে আতঙ্কে ঘরবাড়ি ও দোকানপাট ছেড়ে রাস্তায় বেরিয়ে আসেন মানুষজন। তাঁদের অনেকেই জানান, বেশ শক্ত ঝাঁকুনি অনুভব করেছেন তাঁরা। গতকাল বেলা ১টা ৫২ মিনিটে কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী এ ভূমিকম্পে জেলায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের ভূমিকম্প প্রবণ এলাকার মানচিত্র

আশাশুনি সদরের বাসিন্দা আবদুল আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘হঠাৎ দোতলা বাড়ি দুলে উঠল। পরিবারের সবাই দ্রুত নিচে নেমে আসে।’ সুন্দরবন-সংলগ্ন হরিনগর গ্রামের বাসিন্দা পূর্বপদ মল্লিক বলছিলেন, দুপুরের দিকে হঠাৎ ভূমিকম্পে তাঁর দোতলা বাড়িটি দুলে ওঠে।

দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের এসব ভূমিকম্প ভীতিকর নয় বলে ধারণা করেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তাঁদের মত, দেশের ভেতরে এবং আশপাশে ভূমিকম্পের সংখ্যা বেড়ে যাওয়াটা বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দেয়।

দক্ষিণ–পশ্চিমে ভূমিকম্প বাড়ছে কেন

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, ভূমিকম্পের ঝুঁকির বিবেচনায় দেশকে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ, মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং কম ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে উত্তরের জেলা লালমনিরহাট থেকে দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের খাগড়াছড়ি পর্যন্ত অতি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা; ঢাকাসহ উত্তর মধ্যাঞ্চলের এলাকা মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চলের বরিশাল ও খুলনা বিভাগ কম ঝূঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে গণ্য করা হয়।

এই কম ঝুঁকির এলাকা সাতক্ষীরায় গতকাল উৎপত্তি হলো মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের। তবে শুধু গতকালই নয়, দক্ষিণ–পশ্চিমের ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে গত বৃহস্পতিবার ৩ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। এ ছাড়া ৩ ফেব্রুয়ারি ভোরে সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। রিখটার স্কেলে ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ১। গত বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর যশোরের মনিরামপুরে সৃষ্টি হওয়া ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৩ দশমিক ৫।

বাংলাদেশ যে তিনটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থিত, সেগুলো হলো পূর্বাঞ্চলের সাবডাকশন জোন, উত্তরের ডাউকি ফল্ট এবং হিমালয় পাদদেশের হিমালয়ান ফ্রন্টাল থ্রাস্ট অঞ্চল (নেপাল থেকে অরুণাচল পর্যন্ত বিস্তৃত)।

হঠাৎ দোতলা বাড়ি দুলে উঠল। পরিবারের সবাই দ্রুত নিচে নেমে আসে।
আশাশুনি সদরের বাসিন্দা আবদুল আলী

তবে হুমায়ুন আখতার আশ্বস্ত করে বলেন, ওই এলাকায় বড় কোনো সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট বাউন্ডারি নেই। তাই সেখানে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, কিন্তু খুব বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা কম।

যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূমিকম্প নিয়ে পিএইচডি করছেন ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আক্তারুল আহসান। তিনি মনে করেন, সাতক্ষীরার ভূমিকম্পটি গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে হওয়া ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের আফটার–শক (মূল ভূমিকম্প–পরবর্তী যে ভূকম্পন)।

আরও পড়ুন

আক্তারুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, সাতক্ষীরার ভূমিকম্পের উৎপত্তি নতুন আবিষ্কৃত কলকাতা–জামালপুর–ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফাটলরেখা থেকে। সাতক্ষীরা ও নরসিংদী অঞ্চল এ ফাটলরেখার হিঞ্জ লাইনের (ফাটলরেখার উভয় পাশে ৩০ কিলোমিটার এলাকা) মধ্যে পড়েছে।

আক্তারুল আহসান নিজের গবেষণায় কলকাতা থেকে বাংলাদেশের জামালপুর হয়ে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ৪০০ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন একটি ফাটলরেখার সন্ধান পেয়েছেন।

হুমায়ুন আখতার আশ্বস্ত করে বলেন, ওই এলাকায় বড় কোনো সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট বাউন্ডারি নেই। তাই সেখানে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প হতে পারে, কিন্তু খুব বড় মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা কম।

দেশের ভেতরে বাড়ছে ভূমিকম্পের উৎপত্তি

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র থেকে ২০১৬ সাল থেকে এখন পর্যন্ত হওয়া ভূমিকম্পগুলোর তথ্য পাওয়া গেছে। এতে দেখা যায়, ২০২৫ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে এবং সীমান্ত–সংলগ্ন এলাকায় ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে বৃহত্তর সিলেট এলাকায়—১০টি। এসব ভূমিকম্পের উৎপত্তি ডাউকি চ্যুতির কাছাকাছি এলাকায়।

যুক্তরাষ্ট্রের অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূমিকম্প নিয়ে পিএইচডি করছেন ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আক্তারুল আহসান। তিনি মনে করেন, সাতক্ষীরার ভূমিকম্পটি গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীতে হওয়া ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের আফটার–শক (মূল ভূমিকম্প–পরবর্তী যে ভূকম্পন)।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবাইয়াৎ কবীর গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ২০১৬ সালের পর দেশের অভ্যন্তরে মাত্র ১৩ মাসে ৩২টি ভূমিকম্প উৎপত্তির রেকর্ড নেই। দেশের অভ্যন্তর এবং সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার কারণ ভূ–অভ্যন্তরে যে বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় হয়েছে, সেটার বহিঃপ্রকাশ। এটি একটি বড় আকারের ভূমিকম্পের ইঙ্গিত দেয়, যেটা অনেক দিন ধরেই বলা হচ্ছে।

২০২৫ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশের অভ্যন্তরে এবং সীমান্ত–সংলগ্ন এলাকায় ৩২টি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়েছে বৃহত্তর সিলেট এলাকায়—১০টি।

একটি বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কার কথা মানলেও দেশ এবং আশপাশের এলাকায় ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে অধ্যাপক হুমায়ুন আখতারের অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। তিনি বলছিলেন, ‘আগের চেয়ে আমাদের দেশ এবং পার্শ্ববর্তী এলাকায় ভূমিকম্পের তথ্য সংগ্রহের তৎপরতা বেড়েছে। যেগুলো আগে ছিল না। প্রযুক্তিরও উন্নয়ন হয়েছে। তাই হয়তো এখন আমরা বেশি এবং সঠিক মাত্রায় ভূমিকম্প–সংক্রান্ত তথ্য পাচ্ছি।’