ভ্রান্ত ধারণা থেকে শিকার, অস্তিত্বের হুমকিতে মাছটি

ঝালকাঠির কাঠালিয়ার জেলেদের জালে সম্প্রতি বিশাল আকৃতির এই করাত মাছ ধরা পড়েছবি: সংগৃহীত

ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলার আমুয়াঘাট। গত ৩১ মার্চ সকালে এই ঘাটে প্রায় ২৫ মণ ওজনের একটি মাছ নিয়ে হাজির হন জেলেরা। মাছটি ধরা হয় বঙ্গোপসাগর থেকে।

বেশি দামে বিক্রির আশায় মাছটি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার বাজারে মাইকিং করে প্রতিকেজি ৩ হাজার টাকায় বিক্রি শুরু হয় মাছটি।

মাছটির নাম করাত। স্থানীয়ভাবে খটক মাছও বলা হয়। ‘মহাবিপন্ন’ এই মাছ ধরা আইনে নিষিদ্ধ। তবু তা ধরা, বিক্রি ও খাওয়া চলছে।

প্রাণীসংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা ওয়ার্ল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি (ডব্লিউসিএস) বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রবিউল কাউসার দীর্ঘদিন ধরে করাত মাছ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বললেন, এই মাছ নিয়ে দেশের কিছু মানুষের মধ্যে একধরনের মিথ, ভ্রান্ত ধারণা আছে। আর তা হলো, এ মাছ খেলে ক্যানসার সারে। এটিসহ অন্যান্য কারণে এই মাছের চাহিদা আছে। ফলে মারা পড়ছে এই মাছ। এতে বঙ্গোপসাগরসহ সুন্দরবনের মোহনা থেকে এই মাছ পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

মহাবিপন্ন মাছ

ডব্লিউসিএসের তথ্য অনুযায়ী, করাত শাপলাপাতা জাতীয় মাছ। এর শরীরের দুই পাশে ছড়ানো পাখনা আছে। সামনে আছে একটি লম্বা ঠোঁট। ঠোঁটের দুই পাশে করাতের মতো ধারালো দাঁত। এই দাঁত দিয়ে তারা খাবার শিকার করে। আবার আত্মরক্ষায়ও কাজে লাগায়।

ডব্লিউসিএস বলছে, এই মাছের পাঁচটি প্রজাতি বিশ্বে টিকে আছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে পাওয়া যায় তিন প্রজাতি। তিন প্রজাতির সবগুলোই হুমকির মুখে।

গবেষকেরা বলছেন, এই মাছ যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা, অস্ট্রেলিয়া উপকূল ও বাংলাদেশে এখন টিকে আছে।

প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন ২০১৩ সালে করাত মাছকে (Pristis pristis) বৈশ্বিকভাবে মহাবিপন্ন শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করে।

এই মাছ নিয়ে দেশের কিছু মানুষের মধ্যে একধরনের মিথ, ভ্রান্ত ধারণা আছে। আর তা হলো, এ মাছ খেলে ক্যানসার সারে। এটিসহ অন্যান্য কারণে এই মাছের চাহিদা আছে। ফলে মারা পড়ছে এই মাছ। এতে বঙ্গোপসাগরসহ সুন্দরবনের মোহনা থেকে এই মাছ পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন ২০২৬ অনুযায়ী, এই মাছ তফসিল-১-এর (খ) অন্তর্ভুক্ত। এই মাছ ধরা, বিক্রি, খাওয়া আমলযোগ্য ও অজামিনযোগ্য অপরাধ। এই অপরাধে তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান আছে।

মঠবাড়িয়ায় গত ৩১ মার্চ এই মাছের অংশবিশেষে জব্দ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই অভিযানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে ছিলেন বন অধিদপ্তরের বাগেরহাট জেলার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (সামাজিক বন) শাহীন কবির। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গিয়ে ১৫০ কেজির মতো মাছ উদ্ধার করি। লোকজনের কাছে জেনেছি, মাছটি প্রতিকেজি ৩ হাজার টাকা করে বিক্রি হচ্ছিল। ক্যানসার ভালো হয়—এমন ধারণা থেকে লোকজন এ মাছ কেনেন।’

শাহীন কবির আরও বলেন, মহাবিপন্ন এই মাছ ধরা আইন অনুযায়ী নিষিদ্ধ। যাঁরা মাছটি ধরেছেন, তাঁদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

আরও পড়ুন

‘বাচ্চা দিতে এসে ধরা’

ওয়ার্ল্ডলাইফ কনজারভেশন সোসাইটি বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রবিউল কাউসার প্রথম আলোকে বলেন, এই সময়ে করাত মাছ বাচ্চা দিতে সাগর থেকে সুন্দরবনের মোহনাসহ আশপাশের নদীতে আসে। এসব এলাকায় ৫ থেকে ৬ মিটার পানির নিচে তারা বাচ্চা দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। দুঃখজনক হলো, সুন্দরবন এলাকায় সবচেয়ে বেশি ভাসা জাল পাতা হয়। এগুলো নদীর তলদেশ পর্যন্ত চলে যায়। করাত মাছ তার দীর্ঘ ঠোঁট দিয়ে নদীর তলদেশে থাকা খাবার খেতে পছন্দ করে। ঠিক এ কারণেই তারা ভাসা জালে আটকা পড়ে।

নিষিদ্ধ হওয়ার পরও জেলেরা কেন এই মাছ ধরে বিক্রি করেন, তার কিছু ব্যাখ্যা দেন রবিউল কাউসার। তিনি বলেন, এ মাছে ক্যানসার সারে, এমন ভ্রান্ত ধারণা স্থানীয়ভাবে আছে। ফলে স্থানীয় বাজারে এই মাছের একটা চাহিদা আছে। এ চাহিদার কারণে জেলেরা এই মাছ বেশি দামে বিক্রি করতে পারেন। অন্যদিকে দেশের বাইরে এ মাছের দীর্ঘ ঠোঁটের চাহিদা আছে। আভিজাত্যের নিদর্শন হিসেবে এই ঠোঁট ঘরের দেয়ালে অনেকে টাঙ্গিয়ে রাখেন।

কক্সবাজার জেলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, দেশে অবৈধভাবে এই মাছের ঠোঁট ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। পরে তা বাইরের দেশে পাচার করা হয়।

বৈশ্বিকভাবে বিপন্ন বন্য প্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে ১৯৭৫ সালে সাইটিস চুক্তি কার্যকর হয়। বাংলাদেশ চুক্তিতে যোগ দেয় ১৯৮১ সালে, আর তা কার্যকর হয় ১৯৮২ সালে। করাত মাছ সাইটিস–১–এর তালিকাভুক্ত। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশ থেকে এই মাছের বাণিজ্য নিষিদ্ধ।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জার্নাল ফর নেচার কনজারভেশন–এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় সাক্ষাৎকার দেওয়া ৩১৮ জন জেলের মধ্যে ২৮৫ জনই করাত মাছ ধরার কথা স্বীকার করেন। তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কী পরিমাণ করাত মাছ ধরা হয়? উত্তরে জেলেরা বলেন, ২০১৬ থেকে ২০২০—এই সময়কালে তাঁরা ৮৫টি করাত মাছ ধরেছেন। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ২০টি।

দেশে করাত মাছ ধরার প্রবণতা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ও কসমস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের যৌথভাবে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের দক্ষিণ–পশ্চিমাঞ্চল বিশেষ করে বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা জেলার জেলেদের জালে এই মাছ ধরা পড়ে।

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জার্নাল ফর নেচার কনজারভেশন–এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। গবেষণায় সাক্ষাৎকার দেওয়া ৩১৮ জন জেলের মধ্যে ২৮৫ জনই করাত মাছ ধরার কথা স্বীকার করেন। তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, কী পরিমাণ করাত মাছ ধরা হয়? উত্তরে জেলেরা বলেন, ২০১৬ থেকে ২০২০—এই সময়কালে তাঁরা ৮৫টি করাত মাছ ধরেছেন। ২০২১ সালে এই সংখ্যা ২০টি।

আরও পড়ুন

গবেষণায় উঠে এসেছে, বলেশ্বর, পশুর ও শিবসা নদী ছাড়াও উপকূলসংলগ্ন অগভীর জলসীমায় এই মাছ ধরা পড়ে। এ ছাড়া গভীর সমুদ্রেও কয়েকটি করাত মাছ ধরা পড়েছে।

গবেষকদলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আলিফা বিনতে হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সুনির্দিষ্ট করে করাত মাছ ধরা জেলেদের লক্ষ্য থাকে না। মাছ ধরার সময় এটি জেলেদের জালে আটকে যায়।

আলিফা বিনতে হক বলেন, এই মাছের শারীরিক কাঠামো এমন যে এটা যেকোনো জালে আটকে যায়। অনেকক্ষণ ধরে জালে আটকে থাকলে এটাকে বাঁচানো কঠিন। আবার মাছটা যেহেতু শক্তিশালী, তাই এটাকে ছেড়ে দিতে গেলেও ঝুঁকি তৈরি হয়। এটি যদি ছাড়তে হয়, প্রশিক্ষণের ব্যাপার আছে।

ঝুঁকি কেন বাড়ছে

গবেষক আলিফা বিনতে হক বলেন, করাত মাছের একটা বাজারমূল্য আছে। এটা ধরা পড়ে গেলে তখন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা জেলেদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। কারণ, জেলেরা প্রান্তিক। তাদের হাতে টাকা–পয়সা তেমন থাকে না। অন্যদিকে, এত বড় একটি মাছকে কীভাবে মুক্ত করতে হবে, সে বিষয়ে তাঁদের কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। ফলে, এই মাছ ছেড়ে দেওয়ার মানসিকতা ও চর্চা এখনো তৈরি করা যায়নি।

যেসব এলাকায় করাত মাছ বাচ্চা দিতে আসে, সেগুলো সংরক্ষণের আওতায় নিয়ে আসার পরামর্শ দেন গবেষক আলিফা বিনতে হক। পাশাপাশি তিনি জেলেদের প্রশিক্ষণ ও সচেতন করে তোলার ওপর জোর দেন।

‘এই মাছে ক্যানসার সারে না’

করাত মাছ খেলে ক্যানসার সারে কি না, তা জানতে চাওয়া হয় বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান সৈয়দ আকরাম হোসেনের কাছে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সব ধরনের ক্যানসারের চিকিৎসায় একটা নির্দিষ্ট প্রটোকল আছে। এই প্রটোকলে করাত মাছের কোনো উল্লেখ নেই। এ মাছে ক্যানসার সারে—এই প্রচারণার একটা উদ্দেশ্য হলো, তা বেশি দামে বিক্রি করা। এই মাছে ক্যানসার সারে না।