এ মাসেও তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে
দেশের আবহাওয়া পরিস্থিতি গত এপ্রিল মাসে কেমন ছিল, তা বুঝতে দুটি তথ্যই যথেষ্ট। প্রথমত, স্বাভাবিকের চেয়ে ৮১ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে গত মাসে। দ্বিতীয়ত, স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বেশি ছিল। চলতি মে মাসেও দেশের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেশি থাকতে পারে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর এসব তথ্য জানিয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, মে মাসে দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার গড় হলো ৩২ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। গতকাল বৃহস্পতিবার আবহাওয়া অধিদপ্তর মে মাসের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস দিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, মে মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিই হতে পারে। দেশের কোথাও কোথাও এক থেকে তিনটি মৃদু ও মাঝারি এবং এক থেকে দুটি তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এ মাসে দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকবে।
মে মাসে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা অন্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। বিশেষ করে যশোর, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা ও ঝিনাইদহ অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।আবহাওয়াবিদ আজিজুর রহমান
সদ্য শেষ হওয়া এপ্রিল মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এমন অবস্থা গত ৭৬ বছরে হয়নি বলে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে। তবে মে মাসের তাপমাত্রা এপ্রিল মাসের চেয়ে কিছুটা কম থাকবে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আজিজুর রহমান। তিনি গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, মে মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টি হলেও তাপমাত্রা একটু বেশি থাকতে পারে। তবে তা এপ্রিলের মতো অবস্থায় যাবে না। তাপপ্রবাহ এত দীর্ঘ সময় ধরে থাকবে না।
আবহাওয়াবিদ আজিজুর রহমান বলেন, মে মাসে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে তাপমাত্রা অন্য অঞ্চলের চেয়ে বেশি থাকতে পারে। বিশেষ করে যশোর, চুয়াডাঙ্গা, পাবনা ও ঝিনাইদহ অঞ্চলে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ঢাকা বিভাগের মধ্যে টাঙ্গাইল, গোপালগঞ্জ ও মানিকগঞ্জে তাপমাত্রা ১ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। আর ঢাকা মহানগরের তাপমাত্রাও ১ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি থাকবে।
বিশ্বের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞরা গত বছরই বলেছিলেন, ২০২৪ সাল অপেক্ষাকৃত উষ্ণ হতে পারে। এর পেছনে দায়ী প্রশান্ত মহাসাগরের জলবায়ু পরিস্থিতি ‘এল নিনো’। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এল নিনো সক্রিয় হয়। এপ্রিলের মাঝামাঝি এটি নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করে।
এত তাপ কেন
গতকাল দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় চুয়াডাঙ্গায়, ৪১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গা ও যশোরে ৪২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর গতকাল ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এর আগের দিন বুধবার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৯ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গতকাল তাপমাত্রা তুলনামূলক কম ছিল।
গতকাল সকালে চট্টগ্রামসহ দেশের কিছু এলাকায় বৃষ্টি হয়। রাত সাড়ে ৮টার পর বৃষ্টি হয় রাজধানীর কিছু এলাকাতেও। তবে তা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও শনির আখড়া এলাকায় সাত–আট মিনিটের মতো সামান্য বৃষ্টি ঝরেছে।
যাত্রাবাড়ী এলাকার এক গৃহবধূ গত রাত ১০টার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, রাত সাড়ে ৮টার পর আকাশে বিদ্যুৎ চমকায়। এর পর কয়েক মিনিট বৃষ্টি হয়।
রাত ১২টার দিকে বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হয় মিরপুর, শ্যামলী এলাকায়। রাত ১টার দিকে নিউমার্কেট, কারওয়ান বাজারসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় মুষল ধারে বৃষ্টি হয়।
তবে কোথাও কোথাও বৃষ্টি হলেও তাপপ্রবাহের ধারাবাহিকতা দ্রুতই চলে যাবে না বলে মনে করেন আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক। তিনি বলেন, উপমহাদেশে যে তাপবলয় সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রশমনে বড় ধরনের বৃষ্টির দরকার। আগামী রোববার থেকে এমন বৃষ্টি হতে পারে। এরপর তাপমাত্রা খানিকটা কমতে পারে।
গ্রীষ্ম মৌসুমে এবার উপমহাদেশজুড়ে আবহাওয়া আগের চেয়ে তপ্ত থাকবে। আবার বর্ষা মৌসুমে লা নিনার সক্রিয়তার কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে।অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম, বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক
বিশ্বের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিশেষজ্ঞরা গত বছরই বলেছিলেন, ২০২৪ সাল অপেক্ষাকৃত উষ্ণ হতে পারে। এর পেছনে দায়ী প্রশান্ত মহাসাগরের জলবায়ু পরিস্থিতি ‘এল নিনো’। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এল নিনো সক্রিয় হয়। এপ্রিলের মাঝামাঝি এটি নিষ্ক্রিয় হতে শুরু করে।
স্প্যানিশ শব্দ এল নিনোর অর্থ হলো ‘লিটল বয়’ বা ‘ছোট ছেলে’। পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলীয় প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ থাকে, তখন তাকে এল নিনো বলা হয়। আর এর বিপরীত অবস্থার নাম ‘লা নিনা’, যার অর্থ ‘লিটল গার্ল’ বা ‘ছোট মেয়ে’। পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলীয় প্রশান্ত মহাসাগর এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকে, তখন তাকে লা নিনা বলা হয়।
তবে এল নিনো নিষ্ক্রিয় হলেও তাপ কমতে আরও দেরি হতে পারে বলে মনে করেন বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম। তিনি জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত আন্তসরকার প্যানেলের সঙ্গে যুক্ত।
অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, গ্রীষ্ম মৌসুমে এবার উপমহাদেশজুড়ে আবহাওয়া আগের চেয়ে তপ্ত থাকবে। আবার বর্ষা মৌসুমে লা নিনার সক্রিয়তার কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে।
মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকবে। আর এ মাসে তাপপ্রবাহের দিন স্বাভাবিকের চেয়ে চার দিন বেশি হতে পারে।ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান সোমনাথ দত্ত
তাপপ্রবাহের জন্য দায়ী পশ্চিমা বায়ু ভারতের মধ্যপ্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে এবার রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা গেছে। ভারতীয় আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান সোমনাথ দত্ত গতকাল মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকবে। আর এ মাসে তাপপ্রবাহের দিন স্বাভাবিকের চেয়ে চার দিন বেশি হতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর গতকাল দেওয়া পূর্বাভাসে জানিয়েছে, চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপ সৃষ্টি হতে পারে। এ থেকে ঘূর্ণিঝড়ও হতে পারে। আর উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের জন্য দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু নদীর পানি বেড়ে যেতে পারে এবং কিছু স্থানে তা বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যেতে পারে।
বছরের এই সময়টায় বিশেষ করে হাওর অঞ্চলে পাহাড়ি ঢল হয়। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, আগামী সাত দিনে বড় ধরনের ঢলের আশঙ্কা কম।