যতটা জানি, এই সাফারি পার্কের ধারণা ও পরিকল্পনা বন বিভাগেরই কোনো না কোনো কর্মকর্তার। বাস্তবে এটি আফ্রিকা বা ভারতের মানদণ্ডের কোনো প্রাকৃতিক সাফারি পার্ক নয়। যে এলাকায় এটি করা হয়েছে, বন বিভাগের ভুল বন সংরক্ষণ নীতি ও ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় লোকজনের বনজ সম্পদ চুরির দাপট, বনে জনবসতি গড়ে ওঠা, বনের জমিতে বসতি নির্মাণ, বনের জমি জবরদখল ইত্যাদি কারণে সেখানকার বন এরই মধ্যে বিলীন হয়েছে বা বিলুপ্তির পথে রয়েছে।

আইইউসিএন-২০১৬-এর বাংলাদেশের লাল তালিকা এবং অন্যান্য তথ্য অনুযায়ী সেখানে বিলুপ্ত ও বিপদগ্রস্ত প্রাণীর তালিকায় আছে দুই প্রজাতির গন্ডার, দুই প্রজাতির ভালুক, বনগরু, বুনো মহিষ, বান্টেং, রামকুত্তা, নেকড়ে, সবুজ ময়ূর, বাদি হাঁস, গোলবাহার সাপসহ বহু জানা-অজানা ছোট ছোট প্রজাতির স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর, মাছ এবং অমেরুদণ্ডী প্রাণী ও উদ্ভিদ।

ডুলাহাজারায় অবস্থিত সাফারি পার্কটি মূলত একটি খণ্ডিত বন, যেখানে ৭০ থেকে ১০০ বছর আগে প্রাকৃতিক বন ছিল। এখানে কিছু বড় বড় গর্জন ও চাপালিশ গাছ আছে। এর নিচে আছে বহুল পরিমাণে ভিনদেশি আগাছার প্রজাতি নিয়ে গড়ে ওঠা গৌণ বন বা সেকেন্ডারি ফরেস্ট। একসময় এখানে শিথিল উদ্যমে একটি হরিণ প্রজননকেন্দ্র পরিচালনা করা হয়। তাতে বনের অনেকটা জায়গা ঘিরে তারের জালের বেষ্টনী দেওয়া সম্ভব হয়। পরে এটিকেই পরিণত করা হয় সাফারি পার্কে।

নানা জায়গায় ধরা পড়া হাতি, হরিণ, সাম্বার প্রভৃতি প্রাণী ছাড়া হয় এখানে। পরে পুরো এলাকার পরিমাণ বাড়িয়ে চারপাশে প্রাচীর দেওয়া হয়। ১৫-২০ ফুট উঁচু প্রাচীর বা তারের বেড়া দিয়ে বাঘ-ভালুকের ঘেরও তৈরি করা হয়। কোথাও নামমাত্র পরিখা আছে—বড়ই দৃষ্টিকটু এবং প্রাণী ও পরিবেশ-অবান্ধব। বেশির ভাগ প্রাণীকে চিড়িয়াখানার বন্দী প্রাণীর মতো খাবার ও পানি পরিবেশন করা হয়। ঘের বা প্রদর্শনী এলাকা কেবল প্রজাতিভেদে চিড়িয়াখানার চেয়ে বড়। গাড়ি বা বাসে চড়ে প্রাণী দেখার জন্য প্রশস্ত রাস্তা আছে বটে, বাকি সব ব্যবস্থাপনা চিড়িয়াখানার মতো।

ডুলাহাজারার আদলে রাজধানীর কাছে গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক নামে আরেকটি পার্ক তৈরি করা হয়েছে।

সমস্যার শেষ নেই

দুটি সাফারি পার্কের নামের সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম যুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু এর একটিও বিশ্ব মান তো দূরের কথা, ভারতীয় সাফারি পার্কের মানে গড়ে তোলার কথাও কেউ ভাবেননি।

সমস্যাগুলো বলি—

১. কোনো সাফারি পার্কই থিম বেজড বা বিষয়ভিত্তিক নয়।

২. কোনো পার্কেই বাংলাদেশি প্রাণীর প্রজাতিকে নিজ পরিবেশে বসবাসের জন্য কোনো পরিকল্পনা, নকশা বা নীতি প্রণয়ন করা হয়নি।

৩. বাংলাদেশে বিদেশি প্রাণীর সংখ্যা দেশি প্রাণীর চেয়ে বেশি। ভারতের সরকারি সাফারি পার্কে কোনো ভিনদেশি প্রাণী ঢোকানোর কোনো অনুমোদন নেই। এ অনুমোদন আছে শুধু চিড়িয়াখানা বা ব্যক্তিমালিকানাধীন সাফারি পার্কে।

৪. প্রাণীদের জন্য তৈরি করা স্থাপনা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। প্রাকৃতিক বন স্থাপনা, থিয়েটার বা জাদুঘর বানানো হয়েছে।

৫. চিড়িয়াখানার আদলে খাঁচাবন্দী প্রাণী প্রদর্শন করা হচ্ছে। বিশাল প্রাচীর বা উঁচু তারের বেড়া ১৯৫০-এর দশকের প্রাচীন মডেলের চিড়িয়াখানার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

৬. বাংলাদেশের বাঘের বদলে আফ্রিকার খামারে প্রজননকৃত বাঘ রাখা হয়েছে। এটি বিশেষভাবেই ন্যক্কারজনক। কারণ, বিশ্বের যে গুটিকয় দেশে প্রাকৃতিকভাবে বেঙ্গল টাইগার বিচরণ করে, বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। উপরন্তু বাঘ বাংলাদেশের জাতীয় প্রাণী। এখানে কোন যুক্তিতে ভিনদেশি খামারে প্রসূত বাঘ প্রদর্শিত হবে?

৭. দেশি বা বিদেশি প্রাণীর বসবাসের জন্য যে প্রাকৃতিক পরিবেশ তৈরি করতে হয়, তা পরিকল্পনায় যেমন, বাস্তবেও নেই।

৮. প্রকৃতিতে একাধিক প্রজাতির প্রাণীর দল যে রকম একসঙ্গে ঘাসবনে বিচরণ করে, খাবার খায় বা বিশ্রাম করে, তার প্রতি বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করা হয়নি।

৯. জেব্রা, ওয়াইল্ড বিস্ট, ইলান্ড, জিরাফ, গেজেল, ওয়াটারবাক প্রভৃতি আফ্রিকার প্রাণী মূলত আধা মরুভূমি বা শুষ্ক এলাকার। এরা দলেবলে নিষ্পাদপ যে প্রান্তরে থাকে, সেখানে তৃণ আচ্ছাদিত অঞ্চলে খণ্ড খণ্ড বাবলা বা গুচ্ছাকার গাছের বন থাকে। গাজীপুর বা ডুলাহাজারার কোথাও সে পরিবেশ নেই কিংবা সে রকম কিছু সৃষ্টির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়নি।

১০. বাংলাদেশে আফ্রিকার প্রাণীগুলো আছে সম্পূর্ণ বিরূপ পরিবেশে। এখানে আর্দ্রতা বেশি। এ কারণে আফ্রিকার প্রাণীগুলোর চামড়ার রোগ হওয়ার আশঙ্কা অত্যধিক।

১১. আফ্রিকার প্রাণীগুলোর জন্য জীবনধারণের উপযোগী প্রাকৃতিক বন না থাকায় তাদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি, ভিটামিন ও মিনারেলসের অভাব ঘটছে। প্রাকৃতিক খাবারের পরিবর্তে পরিবেশিত একঘেয়ে খাবারের কারণে প্রাণীগুলো পুষ্টির অভাবে ভোগে, তাদের রুগ্ণ দেখায় এবং দ্রুত তারা মারাও যায়।

১২. সাফারি পার্কগুলোকে পরিবেশগতভাবে দৃষ্টিনন্দন করার কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। আধা প্রাকৃতিক বড় হ্রদের পরিমিত ঢালুর ঘাসবনে বিচরণ করবে তৃণভোজী প্রাণীর পাল। তাদের সঙ্গে খেলাধুলায় মেতে থাকবে বানর আর হনুমান। তাদের পাশ দিয়ে হেঁটে বেড়াবে গুঁইজাতীয় প্রাণী। হ্রদের পাড়ে রোদ পোহাবে মিঠাপানির কুমির ও ঘড়িয়াল। পানিতে লাফাবে হরেক দেশি মাছ, ব্যাঙ, দলপিপি, জল ময়ূর, ডাহুক বা মাছরাঙা পাখি। সাঁতার কাটবে সাপ ও কাছিম, সরালি, পানকৌড়ি বা উদবিড়াল। পাড়ের ছোট ছোট ঝোপঝাড়ে ফুলে ফুলে ঘুরে বেড়াবে প্রজাপতি আর ফড়িং। মৌটুসি পাখিরা ব্যস্ত থাকবে মধু পানে। কিছু দূরে বনের উঁচু উঁচু শিমুল-পলাশ-মান্দারগাছের ফুল থেকে মধু আহরণ করবে ধনেশ, টিয়া, হরিয়াল, কোকিল, ময়না, শালিক প্রভৃতি। পেছনের প্রকাণ্ড সব বট, পাকুড়, অশ্বত্থ, চাপালিশ, ডেউয়াগাছের ফলে হামলা চালাবে উল্লুক, গেছো বানর ও কাঠবিড়ালির দল। আর এসব হ্রদকে বেষ্টন করে থাকবে ঝোপঝাড়ে ঘেরা মেঠো পথ। সে পথে আস্তে আস্তে চলবে দর্শক বহনকারী সুরক্ষিত যান। যেমনটা দেখা যায় ভারতে বা আফ্রিকায়। বাংলাদেশের কোনো সাফারি পার্কে এমন অনুপম দৃশ্য রচনার তোয়াক্কাই করা হয়নি।

১৩. আমার ওপরে পেশ করা কল্পনাকে আরও অর্থবহ করে তোলার জন্য দিঘির প্রশস্ত পাড়ের কোনো কোণে বাঘ, চিতাবাঘ বা সিংহের ঘের সৃষ্টি করা যেতে পারে। সেটি দেখলে মনে হবে খুরেলা প্রাণী ধরার জন্য দিঘির পাড়েই খাদক প্রাণীরা ঘাপটি মেরে বসে আছে। কিন্তু তারা মনুষ্যসৃষ্ট ঘের বা পরিখা পেরিয়ে কোনো প্রাণী শিকার ধরতে পারবে না। এ ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যুক্ত করা দরকার সাফারি পার্ক প্রতিষ্ঠায় অভিজ্ঞ স্থপতি ও ডিজাইনারদের। বাংলাদেশের কোনো সাফারি পার্কের জন্যই এটা করা হয়নি।

১৪. সাফারি পার্ক পরিচালনার জন্য শিক্ষিত জনবলও আমাদের নেই। দেশের বন বিভাগের আওতাধীন কর্মীদের মূল কাজ বনে গাছ লাগানো ও কাটা, আর তা থেকে অর্জিত অর্থ সরকারকে বা জনগণের সঙ্গে ভাগে সৃজন করা বনের মালিকদের বুঝিয়ে দেওয়া। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন এবং জনবল কাগজে যা আছে, বাস্তবে তা নেই। উপরন্তু বন বিভাগের চাকরি বদলিযোগ্য। আজ যিনি সাফারি পার্কের দায়িত্বে, তিন-চার বছর পরে তিনি হয়তো শালবনের রেঞ্জার। সাফারি পার্কে প্রাণী পরিচারক বা অ্যানিমেল কিপারদের বেশির ভাগেরই প্রাণিবিদ্যার ডিগ্রি নেই। একইভাবে ডিগ্রি নেই বেশির ভাগ অ্যাসিস্ট্যান্ট কনজারভেটর অব ফরেস্ট এবং এর ওপরের পদবির চাকুরেদের।

১৫. বিশ্ব মানদণ্ডে সাফারি পার্কের প্রাণীদের খাদ্য পরিবেশনের কিছু রীতি আছে; যেমন প্রতিটি প্রজাতির পুষ্টিভিত্তিক দৈনিক খাদ্যতালিকা তৈরি করে সে অনুযায়ী খাবার পরিবেশন, প্রতিদিন একই খাবার পরিবেশন না করে খাদ্যে ভিন্নতা আনা, তাজা ও কারখানাসৃষ্ট দানাদার খাবারে সমতা রাখা, মাংসাশী প্রাণীর ক্ষেত্রে মহিষ বা গরুর মাংসের সঙ্গে পালকসহ মুরগি-হাঁস-কবুতর এবং পশমসহ খরগোশ-ছাগল-ভেড়ার মাংস পরিবেশন করা। এসবের জন্য লিখিত প্রটোকল থাকে। আর প্রাণী পরিচারক, তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও পশু চিকিৎসকেরা তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। এসব পালিত হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্বে থাকেন ব্যবস্থাপকেরা।

১৬. সাফারি পার্কে প্রতিটি প্রাণীর প্রজাতিভিত্তিক একটি চিকিৎসা প্রটোকল থাকে। কোনো প্রাণী আনার প্রথম দিন থেকে প্রাত্যহিক ও সাংবাৎসরিক শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং চিকিৎসার সব বিবরণ ও রুটিন সেখানে বলে দেওয়া হয়। এটিই চিকিৎসক থেকে ব্যবস্থাপক পর্যন্ত সবার জবাবদিহির পরিমাপক।

দরকার স্বাধীন বন্য প্রাণী বিভাগ

বিশ্বমানের সব সাফারি পার্কেই একটি মানসম্পন্ন পরিচালন পদ্ধতি বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) থাকে। বাংলাদেশের কোনো সাফারি পার্কে এ জিনিসের বালাই নেই। বন্য প্রাণী ও পরিবেশ সংরক্ষণ বা এ–সংক্রান্ত সচেতনতামূলক দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি কোথাও আছে বলে দেখিনি; কোনো বুলেটিন, পুস্তিকা, হ্যান্ডআউট বা ডিজিটাল বিলবোর্ডও নয়। সাদা কথায় বললে, দেশের দুটি সাফারি পার্কই নিম্নমানের চিড়িয়াখানার বৃহদাকার সংস্করণমাত্র। বিশ্বের কোনো সাফারির মানদণ্ডেই এরা টেকে না।

এই সাফারি পার্ক দুটিকে বিশ্বমানে উন্নত করা প্রয়োজন। আর এর জন্য জরুরি ভিত্তিতে দরকার সরকারের পক্ষ থেকে একটি বন্য প্রাণী নীতি প্রণয়ন এবং সেটির অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত বন্য প্রাণী বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা।

বন্য প্রাণী বিভাগ প্রথমেই বিশ্বের উঁচু মানের সাফারি ব্যবস্থাপক এবং ডিজাইনারদের নিয়ে সাফারি বিষয়ে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারে। আমাদের সাফারি পার্কগুলোকে তারই আওতায় ঢেলে সাজানো শুরু করতে হবে। (শেষ)

পরিবেশ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন