গভীর সাগরে ১১ দিন মাছ ধরা শেষে ৩ অক্টোবর বাড়িতে ফিরেছেন ফরিদপুর সদরের আবদুর রব ব্যাপারী। এ সময় তাঁরা ৪১ মণ ইলিশ ধরেছেন। আবদুর রব প্রথম আলোকে বলেন, গভীর সাগরে আগের তুলনায় কম ইলিশ ধরা পড়ছে। ৩–৪ বছর আগেও ১০ থেকে ১২ দিন গভীর সাগরে থাকলে সাধারণত ৬০ থেকে ৮০ মণ ইলিশ পাওয়া যেত। এখন সেখানে ৩০ থেকে ৫০ মণ ইলিশ পাওয়া যায়।

গভীর সাগরে ইলিশ কম ধরা পড়ার কারণ জানতে চাইলে চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক মো. শরীফ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, এখন ইলিশ মাছের গড় আকার বড় হয়েছে। আকার যত বড় হয়, মাছের গতি তত বেড়ে যায়। আর গভীর সমুদ্রে ট্রলার মাছ তাড়া করে ধরে। গতি বেড়ে যাওয়ায় গভীর সাগরে ট্রলার কম ইলিশ ধরতে পারছে।

তবে বিশেষজ্ঞ ও জেলেরা বলছেন, বাংলাদেশের জলসীমায় অনেক ভারতীয় জেলেরা মাছ ধরেন। সরকারের নিষেধাজ্ঞার সময় বাংলাদেশের জেলেরা যখন মাছ ধরা বন্ধ রাখেন, তখন ভারতীয় জেলেরা ধরেন কি না, তা তদরকি করতে হবে। ভারতীয়রা যেন দেশের জলসীমায় আসতে না পারে, সেটাও দেখতে হবে। প্রজননের মৌসুমে মা ইলিশ যখন উপকূলে আসে, তখনো তারা ধরা পড়ে। সে জন্য নিষেধাজ্ঞার সময় তা ভালোভাবে তদারকি করতে হবে, যেন কেউ মাছ ধরতে না পারে। তাহলে গভীর সাগরে মাছ আরও বেশি পাওয়া যাবে বলেও তাঁরা মনে করছেন।

ইলিশ আহরণ বৃদ্ধির হার কমেছে

প্রতিবছর ইলিশ আহরণ বাড়লেও বৃদ্ধির হার কমেছে। ২০১৯–২০ অর্থবছরে মোট ইলিশ আহরণ হয় ৫ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনের বেশি, যা এর আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৩১ ভাগ বেশি। ২০২০–২১ অর্থবছরে মোট ইলিশ আহরণ হয়েছে ৫ লাখ ৬৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি, যা এর আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৬৮ ভাগ বেশি।

অর্থাৎ গত দুই বছরে ইলিশ আহরণ বৃদ্ধির হার কমেছে। তবে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, অতি আহরণ করলে ইলিশ কমে যায়। একসময় এ কারণে ইলিশের আহরণ কমে গিয়েছিল। এ জন্য কী পরিমাণ মাছ আছে এবং কী পরিমাণ ধরা যাবে, তা প্রতিবছর হিসাব করা হয়। এভাবে একটা টেকসই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগোনো হচ্ছে।

সুন্দরবন অঞ্চলেও কমছে

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, সুন্দরবন অঞ্চলের নদ–নদীগুলোতেও ইলিশ আহরণ কমছে। ২০১৫–১৬ অর্থবছরে সুন্দরবন অঞ্চলে মাত্র ১০৯ মেট্রিক টন ইলিশ ধরে পড়ে। তার পরের বছর থেকে এই অঞ্চলে ইলিশ আহরণ বাড়তে থাকে। এই অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ইলিশ ধরা পড়ে ২০১৯–২০ অর্থবছরে, ৮৯০ মেট্রিক টন। অবশ্য তার পরের অর্থবছরে সুন্দরবন অঞ্চলে ইলিশ আহরণ কমে দাঁড়িয়েছে ৭৪৩ মেট্রিক টনে।

টানা ২৭ দিন সুন্দরবন অঞ্চলের নদী–নালা ও সাগরে মাছ ধরে কয়েক দিন আগে বাড়ি ফিরেছিলেন বাগেরহাটের শরণখোলার বাসিন্দা সালাম শেখ। তিনি গত ১০ অক্টোবর প্রথম আলোকে বলেন, গত বছর সুন্দরবন এলাকার নদী–নালায় ইলিশ কম ধরা পড়েছিল। এতে তিনি ওই বছর ৫০ হাজার টাকার বেশি দেনায় পড়েন।

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের কর্মকর্তারা বলেন, সুন্দরবন অংশ বন অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সেখানে মৎস্য অধিদপ্তর কোনো কাজ করতে পারে না। যেমন মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দিলেও সেখানে তা তদারক করতে পারে না মৎস্য অধিদপ্তর। ইলিশ ব্যবস্থাপনার জন্য মৎস্য অধিদপ্তর যেসব কাজ করে, তাও সুন্দরবন অঞ্চলে করা যায় না।

এখন ইলিশ মাছের গড় আকার বড় হয়েছে। আকার যত বড় হয়, মাছের গতি তত বেড়ে যায়। আর গভীর সমুদ্রে ট্রলার মাছ তাড়া করে ধরে।
মো. শরীফ উদ্দিন, চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মৎস্য অধিদপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, সুন্দরবন অঞ্চলে ইলিশের মাইগ্রেশন রুট পরিবর্তন আরেকটি বড় কারণ। ইলিশ যেখানে বড় হয়, সেই অঞ্চলে ডিম ছাড়তে আসে।

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে তাদের মাইগ্রেশন রুট বা যে রুটে আসত, সেখানে হয়তো নাব্যতা–সংকট হয়ে গেছে। নদীর অনেক জায়গায় অনেক চর পড়েছে। ইলিশ যদি আসার পথে কোথাও বাধা পায়, তাহলে তারা আর আসে না। সুন্দরবন এলাকার ক্ষেত্রে এ সমস্যা রয়েছে। এই কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক কারণে সুন্দরবন এলাকায় ইলিশের প্রাপ্যতা কমে গেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আরও বলছেন, মোংলা বন্দরের তৎপরতা বাড়ায় সুন্দরবন অঞ্চলের নদ–নদীতে নৌযান চলাচল আরও বেড়েছে। এতে দূষণ বেড়েছে। ইলিশ কমার এটাও একটি কারণ। এ ছাড়া এই এলাকার খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ ধরা হয়, যা ইলিশসহ সব মাছের ক্ষতি করছে।