জুলাইয়ে এক চোখের দৃষ্টি হারালেও ভাতা কম পান বললেন বেলাল
‘আমরা ন্যাকাপড়া জানি না। সাধারণ মানুষ তো! বুঝিও না কিছু। কুনটি যাওয়া লাগবে তাই বুঝিনি’—কথাগুলো বলছিলেন বেলাল হোসেন প্রামাণিক (৩৯)। বগুড়ার বেলাল জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে এক চোখ হারিয়েছেন।
আহত ব্যক্তিদের সরকারি তালিকায় নাম রয়েছে বেলালের। তালিকায় ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত তিনি। ভাতাও পান, কিন্তু জুলাইয়ে আহত ব্যক্তিদের ঢাকায় উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হতো, সেটা জানতেন না তিনি। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন থেকে সহায়তা পেয়েছেন, কিন্তু জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে কিছুই পাননি।
বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বেলালের বাড়ি। নদীভাঙন এলাকার বাসিন্দা তিনি। যমুনায় বসতভিটা হারিয়েছেন। একবার বা দুবার নয়, ১৫ বার অবস্থান বদলাতে হয়েছে তাঁকে। পরিবার নিয়ে ঘুরেছেন এক চর থেকে আরেক চরে। এখন সারিয়াকান্দি পৌরসভার কুরসাপাড়ায় নানাবাড়িতে স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে থাকছেন তিনি।
বেলালের বাবার নাম পল্টু প্রামাণিক। মায়ের নাম মোসা. মাজেদা। তাঁরা বেঁচে আছেন। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বেলাল তৃতীয়। তাঁর স্ত্রীর নাম শাহিদা আক্তার (২৮)। বড় মেয়ে মোসাম্মৎ আছিয়া (১৭) আর ছেলে মোহাম্মদ হুজাইফা (১১) মাদ্রাসায় পড়ে। ছোট ছেলে মোহাম্মদ আবু তালহার বয়স চার বছর।
সেদিন যা ঘটেছিল
ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালাতেন বেলাল। মাসে আয় হতো ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট ভ্যান চালিয়ে কাঠের মালামাল নিয়ে বগুড়া শহরে গিয়েছিলেন। দুপুরের দিকে ফেরার পথে নিউমার্কেটের কাছে কাঁঠালতলা বাজারে মিছিলের সামনে পড়ে যান বেলাল। হঠাৎ তাঁর ডান চোখে গুলি লাগে। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আন্দোলনকারী ব্যক্তিরা তাঁকে রাস্তা থেকে তুলে এক পাশে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যান। বেলাল বলেন, ‘আমার চোখ দিয়ে তখন রক্ত ঝরছিল। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছিল।’
সেখান থেকে রক্তাক্ত চোখ নিয়ে বাড়ি ফেরেন বেলাল। সেদিন হাসপাতালে না গিয়ে বাড়ি ফেরাকে জীবনের বড় ভুল বলে মনে করছেন বেলাল। কিন্তু হাসপাতালে কেন গেলেন না, এমন প্রশ্নের জবাবে বেলাল বললেন, পুলিশের ভয়ে।
বেলাল বলেন, ‘হাসপাতালে গেলে যদি পুলিশ ধরে! আব্বাও অনেক ভয় পাইল। সেদিন আহত চোখ নিয়ে ভয়ে বাড়ি ফিরে না গিয়ে হাসপাতালে গেলে হয়তো চোখটা রক্ষা পেত।’
বাড়ি ফিরে একজন পল্লিচিকিৎসকের কাছে গিয়েছিলেন বেলাল। জানান, ওই চিকিৎসক ওষুধ দিয়েছিলেন, কিন্তু ব্যথা কমেনি। সাত থেকে আট দিন পর চোখের অবস্থা গুরুতর হলে বেলাল বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। চিকিৎসক দেখে বলেন, এই চোখ আর ঠিক হবে না।
বেলাল বললেন, ঢাকায় জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে জুলাইয়ে আহত ব্যক্তিদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা হচ্ছে, তিনি জানতেন না সেটা। একদিন বিএনপি নেতা মোশারফ হোসেনের (বর্তমানে বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য) সঙ্গে তাঁর পথে দেখা হয়। বেলালকে কিছু আর্থিক সহায়তা দিয়ে তিনি ঢাকায় গিয়ে চোখের চিকিৎসক দেখাতে বলেন। এরপর আরও কিছু টাকা ধার করেন বেলাল। ঢাকায় এসে চিকিৎসক দেখিয়ে বগুড়ায় ফিরে যান।
এরপর বগুড়ার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি হন বেলাল। সেখানে তাঁর চোখে অস্ত্রোপচার হয়, তবে খুব বেশি উন্নতি হয়নি।
সহায়তা পেতে ঢাকায়
বেলাল জানান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে দুই লাখ টাকা ও জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে এক লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছেন। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে কোনো সহায়তা পাননি। ২০২৪ সালের শেষের দিকে ও ২০২৫ সালে তিনবার ঢাকায় এসে তিনি জুলাই ফাউন্ডেশনে গিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো অর্থসহায়তা পাননি। তাঁকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল পরে দেওয়া হবে। তিনি জুলাই আহত হিসেবে ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত। মাসে ১৫ হাজার টাকা পান।
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে নিহত ব্যক্তিদের ‘জুলাই শহীদ’ ও আহত ব্যক্তিদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন ৮৬৫ জন। তালিকাভুক্ত আহত যোদ্ধা ১৫ হাজার ৯০৩ জন।
অতি গুরুতর আহত ব্যক্তিদের ‘ক’ শ্রেণি, গুরুতর আহত ব্যক্তিদের ‘খ’ শ্রেণি ও সাধারণ আহত ব্যক্তিদের ‘গ’ শ্রেণিতে তালিকাভুক্ত করে গেজেট প্রকাশ করেছে সরকার। ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিদের আহত হওয়ার ধরনের বিবরণে বলা হয়েছে, ‘আংশিক দৃষ্টিহীন, মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত বা অনুরূপ আহত ব্যক্তি’। ‘খ’ শ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিরা প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা করে ভাতা পাচ্ছেন।
অন্যদিকে ‘ক’ শ্রেণিভুক্ত আহত হওয়ার ধরনের মধ্যে রয়েছে, ন্যূনতম এক চোখ বা হাত বা পা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অনুপযোগী। সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীন, সম্পূর্ণরূপে মানসিক বিকারগ্রস্ত, অঙ্গহানি, গুরুতর আহত হয়ে দৈনন্দিন জীবিকা নির্বাহের জন্য কাজ করতে অক্ষম। এ তালিকায় থাকা আহত ব্যক্তিরা মাসে ২০ হাজার টাকা ভাতা পাচ্ছেন।
সেই হিসাবে, এক চোখের দৃষ্টি হারানো বেলালের নাম ‘ক’ শ্রেণিতে থাকার কথা। তাঁর মাসে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা পাওয়ার কথা, কিন্তু বেলালের নাম রয়েছে ‘খ’ শ্রেণিতে। সহায়তা পাচ্ছেন মাসে ১৫ হাজার টাকা। তাঁর যে প্রতি মাসে আরও বেশি পরিমাণে সহায়তা পাওয়ার কথা, এটাও জানেন না বেলাল।
জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) কামাল আকবর প্রথম আলোকে বলেন, তহবিলে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় জুলাই শহীদ ও আহত প্রত্যেককে সম্পূর্ণ সহায়তা দেওয়া যায়নি। পাঁচ মাস ধরে ফাউন্ডেশনের কর্মীদের বেতন দেওয়া যাচ্ছে না। তিনি বলেন, জুলাই শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের সহায়তায় ফাউন্ডেশনের প্রয়োজন ছিল ৩৮৩ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকার ১০০ কোটি টাকা দিয়েছিল। মোট ৬ হাজার ৩০০ জনকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রত্যেককে সহায়তা দিতে ফাউন্ডেশনের আরও ২৬৩ কোটি টাকা প্রয়োজন উল্লেখ করে কামাল আকবর বলেন, বর্তমান সরকার টাকা শিগগিরই দেবে বলে জানিয়েছে।
বেলাল হোসেন জানান, শুধু সরকারি ভাতার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাঁর সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া এখন তাঁর ওষুধ খেতে হয় নিয়মিত। এক চোখে দেখতে না পাওয়ায় শুরুতে মনে অনেক কষ্ট পেতেন বলে জানান বেলাল। এখন নিজেকে সামলে নিয়েছেন। বলেন, ‘প্রথমে মনে অনেক কষ্ট পাইছিলাম। এখন ভাবি, বাঁইচা আছি এইটাই বিরাট ব্যাপার। একটা চোখ নষ্ট। আরেকটা চোখ তো আছে।’