লাশহীন এক তদন্তে খুনের রহস্যভেদ

প্রতীকী ছবিছবি: প্রথম আলো গ্রাফিকস

মুঠোফোনে শেষবার মার্জিয়া কান্তা তাঁর বাবাকে বলেছিলেন, ‘ভারতে যাচ্ছি, দোয়া করবেন।’ এরপর কেটে যায় দিন, সপ্তাহ, মাস। কিন্তু মার্জিয়া কান্তা ফেরেন না।

মেয়ের কোনো খোঁজ না পেয়ে বাবা সোহরাব হোসেন যান জামাতা শহিদুল ইসলামের কাছে। জবাব আসে—ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন মার্জিয়া কান্তা। কিন্তু কোথায় দুর্ঘটনা, লাশ কোথায়—এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর মেলেনি।

সন্দেহের শুরু সেখান থেকেই। তখন নরসিংদীর আদালতে অপহরণ মামলা করেন সোহরাব হোসেন। সেই মামলার তদন্তেই একে একে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—ভারতে নয়, কান্তাকে হত্যা করা হয়েছিল পটুয়াখালীর কুয়াকাটার একটি হোটেলকক্ষে।

পারিবারিক কলহের জেরে এক সহযোগীকে নিয়ে স্বামী শহিদুল ইসলাম পরিকল্পিতভাবে মার্জিয়া কান্তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। এরপর লাশ লুকিয়ে রাখেন বক্স খাটের ভেতরে। এরপর দুজনই হোটেল থেকে পালিয়ে যান।

মার্জিয়া কান্তাকে স্বামী ও স্বামীর বন্ধু মিলে খুন করে পালিয়েছিলেন, হোটেল কর্তৃপক্ষ সেই লাশ গুম করে দেয়। এমন একটি ক্লুলেস খুনের কূলকিনারা করেছে পিবিআই। এরপর আদালতে শাস্তিও হয়েছে খুনি ও লাশ গুমকারীদের।

এদিকে দুই দিন পর সেই লাশ পান হোটেলের মালিক ও কর্মীরা। কিন্তু তাঁরাও পুলিশকে জানাননি কিছু। হোটেলে খুনের বিষয়টি গোপন রাখতে লাশ ফেলে দেন সাগরে।

নরসিংদীর মেয়ে মার্জিয়া কান্তা ঢাকার আশুলিয়া থেকে নিখোঁজ হন ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। ঘটনার চার মাস পর ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারিতে তাঁর বাবা সোহরাব হোসেন নরসিংদীর আদালতে অপহরণ মামলা করেন। এই মামলার তদন্তে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ওই বছরের ৩১ অক্টোবর মার্জিয়ার স্বামী শহিদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। তারপর এই হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটিত হয়। পরবর্তীকালে খুনের সহযোগী এবং লাশ গুমে জড়িত আরও চারজনকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই।

আরও পড়ুন
নিহত মার্জিয়া কান্তা
ছবি: পিবিআই

তবে লাশ উদ্ধার না হওয়ায় তদন্তে দেখা দেয় জটিলতা। কারণ, নেই লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন, নেই ময়নাতদন্ত, এমনকি কোনো প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীও নেই। তবু তদন্তকারীরা থেমে থাকেননি। দীর্ঘ তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দুজন এবং লাশ গুমে সহায়তাকারী তিনজনের বিরুদ্ধে আদালতে দণ্ড নিশ্চিত করা সম্ভবপর হয়।

লাশ না থাকা সত্ত্বেও একটি হত্যার বিচার প্রতিষ্ঠা করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ক্লুলেস হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনের পাশাপাশি গুণগত তদন্তের মাধ্যমে লাশহীন হত্যায় বিচার নিশ্চিত করা যায়, এটি একটি উদাহরণ।
মোস্তফা কামাল, পিবিআই প্রধান

পিবিআইয়ের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, লাশ না থাকা সত্ত্বেও একটি হত্যার বিচার প্রতিষ্ঠা করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ক্লুলেস হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটনের পাশাপাশি গুণগত তদন্তের মাধ্যমে লাশহীন হত্যায় বিচার নিশ্চিত করা যায়, এটি একটি উদাহরণ।

চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারিতে পিবিআই সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত বইয়ে মার্জিয়া কান্তা হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

হত্যার কারণ ও রহস্য উদ্‌ঘাটন

শহিদুল ইসলাম মামলা করার দুই মাস পর ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে তদন্ত শুরু করে পিবিআই। তখন প্রযুক্তিগত তদন্তে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর (নিখোঁজ হওয়ার সময়) মার্জিয়া কান্তা ও তাঁর স্বামী শহিদুল ইসলাম শরীয়তপুরে একটি আবাসিক হোটেলে ছিলেন। এরপর ওই এলাকার সব আবাসিক হোটেলের খোঁজ নেওয়া হয়। একটি হোটেলের রেজিস্টারে দেখা যায়, তাঁরা ২১ সেপ্টেম্বর ওই হোটেলে অবস্থান করেছিলেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে একই হোটেলে ছিলেন শহিদুল ইসলামের বন্ধু মামুন মিয়া।

পরবর্তীকালে আরও তথ্য সংগ্রহ করে দেখা যায়, শরীয়তপুর থেকে তাঁরা পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় চলে যান। তখন পিবিআইয়ের কর্মকর্তারা নিশ্চিত হন, মার্জিয়া কান্তা ও তাঁর স্বামী শহিদুল ইসলাম ভারতে যাননি।

প্রযুক্তিগত তদন্তে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণের পর ২০১৯ সালের অক্টোবরে শহিদুল ইসলামকে কুড়িগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর তিন মাস পর ২০২০ সালের জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার করা হয় শহিদুল ইসলামের বন্ধু মামুন মিয়াকে। পাশাপাশি কুয়াকাটার হোটেল আল মদিনার দুই মালিক মো. দেলোয়ার হোসেন ও তাঁর ভাই আনোয়ার হোসেন এবং ওই হোটেলের ব্যবস্থাপক আমির হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আরও পড়ুন

তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে।

জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, মার্জিয়া কান্তা আশুলিয়ায় একটি বিউটি পারলার চালাতেন। সেখানেই শহিদুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তারপর তাঁরা ভালোবেসে বিয়ে করেন। শহিদুল ইসলাম প্রথম বিয়ের কথা গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করেছিলেন। এমনকি একাধিক নারীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে কলহ শুরু হয়। একপর্যায়ে মার্জিয়া কান্তা নরসিংদীতে বাবার বাড়িতে ফিরে যান। সেখান থেকে মার্জিয়া কান্তাকে ভারতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে আশুলিয়ায় নিয়ে আসেন শহিদুল ইসলাম। পরে ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে—এমন খবর রটিয়ে দেন।

দণ্ডিত খুনি শহিদুল ইসলাম (বাঁয়ে) ও মামুন মিয়া
ছবি: পিবিআই

তদন্তে জানা যায়, ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর মার্জিয়াকে প্রথমে আশুলিয়া থেকে শরীয়তপুরে নিয়ে হত্যার পরিকল্পনা ছিল। এ জন্য শহিদুল তাঁর বন্ধু মামুনকে সঙ্গে নেন। কিন্তু শরীয়তপুরে হোটেলে নিজের প্রকৃত নাম-ঠিকানা ব্যবহার করেছিলেন শহিদুল ইসলাম। এ কারণে মার্জিয়া কান্তাকে কুয়াকাটায় নিয়ে হত্যার পরিকল্পনা করেন তিনি। ২২ সেপ্টেম্বর কুয়াকাটার একটি হোটেলে ভুয়া নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে কক্ষ ভাড়া নেন। সেখানে কান্তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর লাশ বক্স খাটের ভেতরে রেখে পালিয়ে যান দুজন।

আরও পড়ুন

কক্ষটি দীর্ঘ সময় বন্ধ দেখে হোটেল কর্তৃপক্ষ থানায় খবর দেয়। পুলিশ তালা ভেঙে কক্ষে ঢুকে কিছু আলামত জব্দ করলেও লাশের সন্ধান পায়নি। দুই দিন পর কক্ষ পরিষ্কার করতে গিয়ে এক কর্মচারী বক্স খাটের ভেতরে লাশ দেখতে পান। কিন্তু হোটেলের সুনামের কথা বিবেচনায় নিয়ে হোটেলের মালিক ও কর্মচারীরা রাতের আঁধারে লাশটি মোটরসাইকেলে করে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেন।

তদন্ত শেষে পিবিআই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত দুজন এবং আলামত নষ্ট করার অভিযোগে আরও তিনজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে।

প্রায় দুই বছর বিচারকাজ চলার পর ২০২১ সালে আদালত এ মামলার রায় দেন। রায়ে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত শহিদুলকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং তাঁর বন্ধু মামুনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া লাশ গুমে জড়িত হোটেলের দুই মালিক ও ব্যবস্থাপককে সাত বছর করে বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) লোগো

প্রাথমিক তদন্তে ঘাটতি

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, কুয়াকাটার হোটেলকক্ষে মৃতদেহ থাকার পরও স্থানীয় থানা-পুলিশ তা শনাক্ত করতে পারেনি। এমনকি নরসিংদীতে মামলা হওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট থানা–পুলিশ নরসিংদী, ঢাকার আশুলিয়া, শরীয়তপুর বা পটুয়াখালীর কোনো স্থানেই সরেজমিন অনুসন্ধান করেনি। বরং খুনের শিকার নারীর স্বামীর দেওয়া ‘ভারতে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু’—এ বক্তব্যই প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করা হয়।

চলতি বছরের (২০২৬) জানুয়ারিতে পিবিআই সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ‘পরিচয়হীন অজ্ঞাতনামা মৃতদেহ এবং ক্লুলেস মার্ডার মামলার তদন্ত’ শিরোনামে প্রকাশিত বইয়ে এ ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়, শুরুতেই ঘটনাস্থলগুলোতে গিয়ে তথ্য যাচাই করা হলে এবং হোটেলকক্ষটি যথাযথভাবে তল্লাশি করা হলে মৃতদেহ উদ্ধারসহ হত্যার রহস্য অনেক আগেই উদ্‌ঘাটন করা সম্ভব ছিল।

এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি শিক্ষণীয় দিক সামনে আসার বিষয়টি তুলে পিবিআইয়ের বইয়ে লেখা হয়েছে, অভিযোগ পাওয়ার পর প্রতিটি তথ্য সরেজমিন সূক্ষ্মভাবে যাচাই করা জরুরি। বিশেষ করে হত্যা মামলায় মৃতদেহ উদ্ধার, সুরতহাল প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত সাধারণত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে এসব অনুপস্থিত থাকলেও প্রযুক্তিগত তথ্য, পারিপার্শ্বিক প্রমাণ, আলামত ও স্বীকারোক্তির সমন্বয়ে হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করা যে সম্ভব, তা–ও লেখা হয় বইয়ে।