জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি কেন ‘সেভাবে বাড়বে না’, সেই ব্যাখ্যা দিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ‘মূল্যস্ফীতি সেভাবে বৃদ্ধি পাবে না’ বলে দাবি করেছেন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতিটা সেভাবে বৃদ্ধি পাবে না কেন, এটা একটু বোঝা দরকার। সারা পৃথিবীতে জ্বালানির মূল্য যে অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে, তার তুলনায় বাংলাদেশে যে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে, সেটা অত্যন্ত সামান্য।’
আজ সোমবার জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির এ কথা বলেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা শিল্পমন্ত্রীর কাছে জানতে চান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, নিলে সেটা কী?
জবাবে মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির ব্যাখ্যা করেন, কেন মূল্যস্ফীতি বাড়বে না? তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে অঙ্গরাজ্যভেদে তেলের দাম ভিন্ন হয়, নিজস্ব ট্যাক্সের কারণে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে অনেক অঙ্গরাজ্যে প্রতি গ্যালনের দাম ২ ডলার ৮০ সেন্ট বা ৭০ সেন্ট ছিল, সেটি এখন ৫ ডলার ছাড়িয়েছে। আশপাশের যেকোনো দেশ অথবা বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনীয় যেকোনো অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে তুলনামূলকভাবে জ্বালানি পণ্যের মূল্য প্রতিটি দেশে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক দেশে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির এই প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়। এটার জন্য সরকারের আলাদা পদক্ষেপ নিতে হয় না।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘আমাদের এখানে যে বৃদ্ধিটা হয়েছে, ডিজেলের ক্ষেত্রে ১০০ টাকার ডিজেলকে আমরা ১১৫ টাকা করেছি। আমি শুধু বোঝার জন্য বলছি, একটা শিল্পকারখানায় তাদের যে কস্ট অব প্রোডাকশন (উৎপাদন খরচ) থাকে, তার মধ্যে ৭ থেকে ৮ শতাংশ থাকে জ্বালানির মূল্য। সেই ৭ থেকে ৮ শতাংশকে যদি ১০০ পারসেন্ট ধরি, তার ১৫ শতাংশ ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি পায়, তবে তা মোট খরচে খুব সামান্য প্রভাব ফেলে।’
শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, একইভাবে পরিবহনের ক্ষেত্রে, একটি বাস ২০০ কিলোমিটার চলার জন্য কমবেশি ২৫ থেকে ৩০ লিটার ডিজেল লাগে। এই ৩০ লিটার ডিজেলের ক্ষেত্রে সাড়ে চার শ টাকার মতো মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। ট্রাকের পণ্য পরিবহনের জন্য হিসাব করা হলে বাড়তি মূল্যের ভার পড়বে ১০ হাজার কেজি পণ্যের ওপর।
মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ‘তার মানে এমনি শুনলেই যেটা মনে হয় যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু আমরা যদি পরিবাহিত পণ্যের ইউনিটের হিসাব করি, তাহলে সেই বৃদ্ধিটা মূল্যস্ফীতির জন্য ওই রকম উদ্দীপক নয়। এটা ঠিক, আপনি অর্থনীতিকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারবেন না, যেখানে ফান্ডামেন্টাল ব্যালেন্সটা ইমব্যালেন্সড (মৌলিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া) হয়ে যায়। সে জন্য পৃথিবীর সব দেশ যে নীতি নিয়েছে, আমরা সেই নীতি মডেস্টলি নিয়েছি এবং খুবই একটা মডারেট মূল্য বৃদ্ধি করেছি।’
রেমিট্যান্সে চাপ তৈরির শঙ্কা
বিএনপির সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুলের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর চাপ পড়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের ওপরও চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতা (ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক উত্তেজনা) বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে প্রভাব ফেলার আশঙ্কা রয়েছে এবং বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ থেকে প্রধানত তৈরি পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য, চামড়াজাত ইত্যাদি পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের বাজারে রপ্তানি হয়ে থাকে।
শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে চলমান অস্থিরতা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ভূমিকা রয়েছে, যার আমদানি ব্যয়, শিপিং ও বিমা খরচ বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি হ্রাস, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে রপ্তানির ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, এটি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের ওপরও চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির জানান, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ছাড়া অন্য সব দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যঘাটতি রয়েছে।
মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি সবচেয়ে বেশি। ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ ৭ হাজার ৮৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ ছাড়া অন্যান্য দেশের মধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে ৬৮১ মিলিয়ন, আফগানিস্তানের সঙ্গে ১০ দশমিক ৭১ মিলিয়ন এবং ভুটানের সঙ্গে ২৯ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন ডলার বাণিজ্যঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে নেপালের সঙ্গে ২৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ও মালদ্বীপের সঙ্গে দুই দশমিক ৮৫ মিলিয়ন বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে।
বিএনপির সংসদ সদস্য আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির সংসদে গত পাঁচ বছরের রপ্তানি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৪৫ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন, ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৬০ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৫৩ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৫১ দশমিক ১১ বিলিয়ন এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ৫৫ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বিদেশে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি কর্মী কর্মরত
মৌলভীবাজার-১ আসনের নাছির উদ্দিন আহমেদের প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি কর্মী কর্মরত রয়েছেন।
মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর অনুপস্থিতিতে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূর সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাব দেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের প্রশ্নের জবাবে আরিফুল হক চৌধুরী জানান, ২০০৪ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিদেশে পাঠানো কর্মীর সংখ্যা ১ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৫।