মান যাচাই করে হেলমেট কিনছেন তো, আমদানির সাড়ে ২৪ শতাংশ নিরাপত্তা পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ

সড়কের ধারেই বিক্রি করা হচ্ছে হেলমেট। রাজধানীর সাইন্স ল্যাব এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

রাজধানীর বাংলামোটরের জনতা অটোস। দোকানটিতে মোটরসাইকেলের নানা যন্ত্রাংশের পাশাপাশি বিক্রি করার জন্য সাজানো রয়েছে বিভিন্ন ধরনের হেলমেট। বিক্রয়কর্মী জানান, তাঁদের দোকানের অধিকাংশ হেলমেটই ভারত থেকে আমদানি করা। বাকিগুলো স্থানীয় কোম্পানির হেলমেট। আমদানি করা হেলমেট ২৫০০ টাকা থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। আর দেশীয় হেলমেটগুলো মেলে ৫০০ থেকে ২৫০০ টাকায়।

রাজধানীর কয়েকটি হেলমেটের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ হেলমেটই মানহীন। এর মধ্যে কিছু হেলমেট পাওয়া যায় ১৫০ টাকায়ও, যা আসলে প্লাস্টিকের টুপি। প্লাস্টিকের আবরণে নিচে একটি পাতলা গেঞ্জি কাপড়ের আবরণে কোনো রকমে মাথায় পরা যায় এসব হেলমেট। মূলত আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে এসব হেলমেট ব্যবহার করা হয়।

আরও পড়ুন

রাইড শেয়ারিং অ্যাপে রাজধানীতে বাইক চালান আরিফুজ্জামান শাওন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘হেলমেট না থাকলে পুলিশ মামলা দেয়, সে জন্য আমরা হেলমেট দিই। অনেক যাত্রীই পরতে চান না। মামলা ও পুলিশের হাত থেকে বাঁচতেই অনেকে হেলমেট ব্যবহার করেন। সে জন্য আমরা হালকা হেলমেট রাখি।’

বাংলাদেশে আমদানি করা হেলমেটের মধ্যে বাজারে পাওয়া বেশির ভাগ হেলমেটই ভারতীয়। এ ছাড়া রয়েছে চীন, স্পেন ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু হেলমেট। দাম ও মানভেদে এসব হেলমেট সাড়ে ৩ হাজার টাকা থেকে ৭২ হাজার টাকায় পাওয়া যায়। এসব হেলমেট বাজারজাত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক। বাজারে পাওয়া আমদানি করা হেলমেটের বেশির ভাগের গায়েই বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ‘সিল’ রয়েছে।

বাংলামোটরের একটি দোকানের একজন হেলমেট বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা আমদানিকারকদের কাছ থেকে হেলমেট কিনে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করেন। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী তাঁদের বিক্রি করতে হয়, মান দেখা তাঁদের কাজ নয়। মানহীন হেলমেট বিক্রির বিষয়ে এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘মানুষ কেনে সে জন্য আমরা আনি। আমাদের তো ব্যবসা করতে হবে।’

বিএসটিআইয়ের হেলমেট টেস্টিং ল্যাব
ছবি: প্রথম আলো

তবে বিএসটিআইয়ের সাম্প্রতিক পরীক্ষাগুলোর ফলাফল বলছে, আমদানি করা হেলমেটের একটি অংশই মানসম্পন্ন নয়। গত ৬ মাসে সংস্থাটি ৪৯টি হেলমেটের নমুনা পরীক্ষা করে দেখেছে, এর মধ্যে ৩৭টি গুণগত মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। অকৃতকার্য হয়েছে ১২টি। শতাংশের হিসাবে যা প্রায় সাড়ে ২৪ শতাংশ।

হেলমেট আমদানি করে এমন প্রতিষ্ঠান ভালকান। প্রতিষ্ঠানটি ভালকান নামেই নিজেদের নকশায় চীন ও ভারত থেকে নিজেদের ব্র্যান্ডের নামে হেলমেট আমদানি করে। ভালকানের সহকারী বিপণন কর্মকর্তা ফারাবী আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের সব কটি হেলমেটই বিএসটিআইয়ের থেকে অনুমোদিত। আমদানি করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি বিএসটিআইয়ের শর্তাবলি অনুসরণ করে বলেও দাবি করেন তিনি।

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, মানসম্মত হেলমেট মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ৪৮ শতাংশ মৃত্যুঝুঁকি কমায়। এ জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিতে সচেতনতা কার্যক্রমের পাশাপাশি কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। পুলিশ চাইলেই মানহীন হেলমেট যাচাই-বাছাই করে জরিমানা করতে পারে। মানহীন হেলমেটের ব্যবহার থামাতে সরকার সড়কে প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করতে পারে।

আরও পড়ুন
সড়কে মোটরসাইকেলের চালক ও যাত্রীদের প্রায় সবাই হেলমেট পরেছেন। তবে এসব হেলমেটের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মঙ্গলবার রাজধানীর কাওরানবাজারে
ছবি: শুভ্র কান্তি দাস

যেভাবে পরীক্ষা করে বিএসটিআই

বর্তমানে ৩৩৫ ধরনের পণ্য আমদানি ও বাজারজাত করার ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। এই তালিকায় রয়েছে দুই ধরনের হেলমেট। এর মধ্যে টু-হুইলার বা মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য একধরনের এবং শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত নিরাপত্তা হেলমেট। অর্থাৎ এই দুই শ্রেণির হেলমেট বাজারজাত করতে হলে সংস্থাটির নির্ধারিত মান অনুযায়ী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং সনদ নেওয়া বাধ্যতামূলক।

দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট মডেল ও মানের হেলমেট আমদানি করতে হলে বিএসটিআইয়ের ল্যাবে একটি নমুনা পরীক্ষা করে নেওয়া বাধ্যতামূলক। প্রতিষ্ঠানটির হেলমেট পরীক্ষা করার ল্যাবে কয়েক ধাপে নিরাপত্তা পরীক্ষা করে। সে ক্ষেত্রে একটি কোনো একটি চালানের একটি হেলমেটের নমুনা পরীক্ষা করলেই হয়।

নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিএসটিআই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠাকে হেলমেট বাজারজাত করার অনুমতি দেয়। বিএসটিআইয়ের মানচিহ্ন হেলমেটে বসিয়ে তা বাজারে ছাড়তে হয়। কিন্তু বাজারে গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হেলমেটে মানচিহ্ন থাকে না।

বিএসটিআই বলছে, পরীক্ষাগারে কৃত্রিম উপায়ে হেলমেটে আঘাত লাগলে সেটি কতটা আঘাত শোষণ করতে পারে, তা পরীক্ষা করা হয়। ধারালো বা শক্ত কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করলে সেটি হেলমেট ভেদ করে মাথায় পৌঁছাতে পারে কি না, তা দেখা হয়।

আরও পড়ুন

এই পরীক্ষাগুলো বিভিন্ন পরিবেশগত অবস্থায় করা হয়। এর মধ্যে বেশি তাপমাত্রায় রেখে পরীক্ষা; কম তাপমাত্রায় রেখে পরীক্ষা; সূর্যের অতিবেগুনি (ইউভি) রশ্মির প্রভাবে রেখে পরীক্ষা; বৃষ্টি বা পানির সংস্পর্শে রাখার পর পরীক্ষা করা হয়।

বিএসটিআই সাধারণত হেলমেটের ওজন, আকার, ধরন, রং, ঘর্ষণ, চাপ, তাপ, পানি সহনশীলতা, সামনের স্বচ্ছ অংশে (ভিজর) আলো আসা-যাওয়াসহ আরও কিছু বিষয় বাধ্যতামূলকভাবে পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ওজন ১৫০০ গ্রাম বা দেড় কেজিকে আদর্শ মান ধরা হয়। নিখুঁত পরীক্ষার অংশ হিসেবে দেখা হয়, হেলমেট মাথায় (চিন স্ট্র্যাপ) আটকানোর সক্ষমতাও। সব ধাপে উত্তীর্ণ হলেই মেলে বিএসটিআইয়ের সনদ।

বিএসটিআইয়ের পদার্থ পরীক্ষণ উইংয়ের পরিচালক মুবিন উল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ব্যবসায়ীদের বিএসটিআইয়ের মান দেখে হেলমেট আমদানি করা উচিত, যেন নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়। আর ব্যবহারকারীদেরও হেলমেট কেনার ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষা করা হেলমেট কেনা উচিত।

রাজধানীর বাংলামোটর এলাকার একটি হেলমেটের দোকান
ছবি: প্রথম আলো

দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৪৮ লাখ ৭১ হাজার মোটরসাইকেল, যা মোট যানবাহনের প্রায় ৭৪ শতাংশ।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩ হাজার ২৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত হন ২ হাজার ৬৭২ জন, যা সড়কে মোট মৃত্যুর ৩৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের দেশে মোটরবাইকের ক্ষেত্রে হেলমেট ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সে জন্য সরকারের পলিসি হওয়া উচিত মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। পাশাপাশি উৎস পর্যায়ে মাননিয়ন্ত্রণ করা, আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে মান কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। সবার সম্মিলিত সচেতনতা নিশ্চিত করা গেলেই মানহীন হেলমেটের ব্যবহার বন্ধ করা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন