সংসদ ভবনের সামনে লাঠিপেটা করে শিক্ষার্থীদের ছত্রভঙ্গ করল পুলিশ

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর মারমুখী পুলিশ। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনের প্রধান ফটকের সামনেছবি: নোমান ছিদ্দিক

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভের এক পর্যায়ে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশের চেষ্টা করলে লাঠিপেটা করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে পুলিশ। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে পুলিশ ছাত্রদের ওপর লাঠিপেটা করে। এতে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আঘাত পেয়েছেন। প্রাথমিকভাবে তাঁদের নাম-পরিচয় জানা যায়নি।

সকাল থেকে সারা দিন ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ করে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নেন এই শিক্ষার্থীরা। জাতীয় সংসদে অধিবেশন চলার মধ্যে সংসদের সামনে অবস্থান নিয়ে ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন তাঁরা।

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা ‘দফা এক দাবি এক, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’সহ নানা স্লোগান দিতে থাকেন। এ সময় পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ফাহমিদ খান সাব্বির বলেন, ‘আমরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া এই স্থান থেকে যাব না।’

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর মারমুখী পুলিশ। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনের প্রধান ফটকের সামনে
ছবি: নোমান ছিদ্দিক

সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে প্রথমে পুলিশ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে সন্ধ্যা পৌনে সাতটার দিকে শিক্ষার্থীরা জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ওপর লাঠিপেটা করে।

পুলিশ লাঠিপেটা শুরু করলে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এ সময় কয়েকজন শিক্ষার্থী পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপের চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ ধাওয়া দিয়ে তাঁদের জাতীয় সংসদ ভবনের প্রধান ফটক থেকে আসাদগেট পর্যন্ত নিয়ে যায়। এরপর সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দিয়ে আসাদ গেটের দিকে সরিয়ে দেয় পুলিশ। আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে
ছবি: নোমান ছিদ্দিক

পুলিশের লাঠিপেটায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থী সংসদ ভবনের সামনে থেকে চলে গেলেও কিছুক্ষণ পর ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী আবারও সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নেন। তবে এবার তাঁরা আর কোনো স্লোগান না দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁদের হাতে কোনো প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুনও দেখা যায়নি। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময়ও ওই শিক্ষার্থীদের সেখানে অবস্থান করতে দেখা যায়।

টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মধ্যে গতকাল সোমবার এইচএসসি পরীক্ষা নেওয়ার প্রতিবাদে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবিতে আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা। তাঁরা এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্রে ভুল ও কঠিন প্রশ্ন করার অভিযোগও তুলেছেন। অভিন্ন প্রশ্নপত্র অতীতের চেয়ে কঠিন হওয়ার অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন
শিক্ষার্থীদের অবরোধে সড়কের একপাশে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়
ছবি: মীর হোসেন

সকালে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধের মধ্য দিয়ে আন্দোলন শুরু করেন। এরপর তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে গিয়ে অবস্থান নেন। সেখান থেকে পুলিশ সরিয়ে দিলে যান বকশীবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে। সেখান থেকে ফিরে বিকেল পৌনে চারটার দিকে আবার সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন।

সায়েন্স ল্যাবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলার মধ্যে জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তরে শিক্ষার্থীদের বিষয়গুলো দেখার আশ্বাস দিয়ে তাঁদের পড়ার টেবিলে ফেরার অনুরোধ জানান শিক্ষামন্ত্রী। এইচএসসির পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ভুল প্রশ্নের জন্য পরীক্ষার্থীরা পূর্ণ নম্বর পাবেন জানিয়ে তিনি বলেন, যেসব কেন্দ্রে সমস্যা হয়েছে, সেসব কেন্দ্রে প্রয়োজনে আবার পরীক্ষা নেওয়া হবে।

বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। আজ দুপুরে
ছবি: মীর হোসেন

শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণার পর বিকেল ৫টা ২০ মিনিটের দিকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি তুলে ধরেন শিক্ষার্থীরা। সেগুলো হলো অনতিবিলম্বে আজ সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে এবং অসংগতিপূর্ণ কথাবার্তার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে; যারা ১৩ জুলাই অস্বস্তিকর পরিবেশে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে এবং যারা করেনি, সব শিক্ষার্থীর আবার পরীক্ষা নিতে হবে; এবং আগামীকালের অর্থাৎ ১৫ জুলাইয়ের পরীক্ষা স্থগিত করতে হবে, পরীক্ষার নতুন রুটিন প্রকাশ করতে হবে এবং প্রশ্নপত্র শিক্ষার্থীবান্ধব হতে হবে।

আরও পড়ুন
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবি জানিয়ে জাতীয় সংসদ অভিমুখে যাত্রা করেছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। আজ মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় এলাকায়
ছবি: সাজিদ হোসেন

এসব দাবি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা সায়েন্স ল্যাব মোড় থেকে মিছিল নিয়ে জাতীয় সংসদ অভিমুখে যাত্রা করেন। সংসদে অধিবেশন চলার মধ্যেই সন্ধ্যা ছয়টার দিকে শিক্ষার্থীরা সংসদ ভবনের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে নানা স্লোগান দিতে থাকেন।

সায়েন্স ল্যাব মোড়ে আন্দোলন শিক্ষার্থীদের পক্ষে তিন দফা ঘোষণা করেছিলেন ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মিরাজুল ইসলাম। সায়েন্স ল্যাব থেকে কেন জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে এসেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল থেকে বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনের পরও আমাদের পক্ষে কোনো ঘোষণা আসেনি। তাই আমরা সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছি, যাতে তাঁরা দেখেন শিক্ষার্থীরা কীভাবে সাফার (কষ্ট ভোগ) করছে।’

সংসদ ভবনের সামনে শিক্ষার্থীরা, দিচ্ছেন ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান
ছবি: নোমান ছিদ্দিক

যাঁরা পরীক্ষা দিতে পারেননি, তাঁদের আবার পরীক্ষা নেওয়ার কথা শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন—এর পরও আন্দোলন কেন করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা সিটি কলেজের শিক্ষার্থী মিরাজুল বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণা আমরা মানি না। এর আগেও তিনি অনেক ঘোষণা দিয়েছেন, কোনো কিছুই তিনি বাস্তবায়ন করেননি। তিনি যে ঘোষণা দিয়েছেন তার বাস্তবায়ন হবে কি না, সে নিশ্চয়তা নেই। তাই আমরা শিক্ষামন্ত্রীকে এই পদে যোগ্য মনে করছি না।’

আরও পড়ুন
ভিসি চত্বরের সামনে শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যেতে বাধা দেয় পুলিশ। আজ দুপুরে
ছবি: মীর হোসেন

দিনভর আন্দোলন

সকালে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড় এক ঘণ্টা অবরোধ করেন। এতে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ ওই সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা সেখানে অবস্থান করেন। এরপর তাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে যান। বেলা সোয়া একটার দিকে ভিসি চত্বরের সামনে থেকে তাঁদের সরিয়ে দেয় পুলিশ। পরে শিক্ষার্থীরা পলাশীর মোড় হয়ে বকশীবাজারে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সামনে যান।

শিক্ষার্থীরা বেলা পৌনে তিনটার দিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে অবস্থান নেন। সেখানে তাঁরা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন এবং ‘ভুয়া’, ‘ভুয়া’ স্লোগান দেন। একপর্যায়ে ইট ছোড়েন। গেটে ধাক্কাধাক্কি করেন।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে শিক্ষার্থীদের অবস্থান। আজ মঙ্গলবার দুপুরে
ছবি: মীর হোসেন

এরপর শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে সরে আবার সায়েন্স ল্যাব মোড়ের দিকে আসেন। বিকেল চারটার কিছু আগে তাঁরা সায়েন্স ল্যাব মোড় অবরোধ করেন। এ সময় বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী মো. সামির বলেন, কোথায় গিয়ে দাবি সঠিকভাবে তুলে ধরবেন, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি। এ কারণে টিএসসিতে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সামনে ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ বাধা দিয়েছে, হামলা করেছে এবং অনেকে আহত হয়েছেন।

ঢাকার মধ্যে এই অবরোধ-বিক্ষোভের পাশাপাশি ঢাকার অন্যতম প্রবেশমুখ উত্তরায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া বরিশাল, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, বগুড়াসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-অবরোধ হয়েছে।