ফিরে দেখা নির্বাচন ২০০৮
ঘটনাবহুল সময়, সংশয়, পরে ভোট
আওয়ামী লীগ ২৩০ আসনে জয়ী হয়। ভোটের হার ছিল ৮৬.২৯%। আগের ৮টি সংসদ নির্বাচনে কখনো এত ভোট পড়েনি।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর সম্ভবত নাগরিকদের সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন ‘নির্বাচন কি হবে?’ সাংবাদিকতা করার সুবাদে যেকোনো অনুষ্ঠানে গেলে অন্যদের তুলনায় এই প্রশ্ন বেশি শুনতে হয়। প্রশ্নটা যতবার শুনি, ততবার আমি ১৮ বছর আগে ২০০৭ সালে ফিরে যাই। আমি তখন দৈনিক জনকণ্ঠতে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বিটে কাজ করি। অ্যাসাইনমেন্ট, পারিবারিক পরিসর থেকে পাড়ার দোকান—যেখানে যাই লোকজনের জিজ্ঞাসা থাকত ‘নির্বাচন কি হবে?’ ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনের আগের প্রায় দুই বছর জুড়ে ছিল বড় ধরনের প্রস্ততি। একই সঙ্গে ছিল গভীর সংশয়ও।
এত সংশয় প্রকাশের কারণ একেবারে অমূলকও ছিল না। খুব পুরোনো ঘটনা নয়, অনেকেরই হয়তো মনে আছে, তা–ও সংক্ষেপে একটু প্রেক্ষাপটটা জানাচ্ছি। নব্বইয়ের গণ–অভ্যুত্থানের পর ‘নির্দলীয় সরকার’–এর অধীনে প্রথম নির্বাচন দেখে বাংলাদেশ। ১৯৯১ সালের সেই নির্বাচনে বিএনপি যায় ক্ষমতায়। তবে মাগুরা উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠলে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া নিয়ে ওঠে প্রশ্ন। এরপর তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ), জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর লাগাতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত হয় শাসনতন্ত্রে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১৯৯৬ সালের জুন মাসের নির্বাচনে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ। ২০০১ সালে পরের নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট যায় ক্ষমতায়। ২০০৪ সালে চারদলীয় জোট সরকার সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করে। নিজেদের পছন্দের ব্যক্তি যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান হতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যেই এই সংশোধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলে আওয়ামী লীগসহ বিরোধী অন্যান্য দল। বিরোধী দলের আপত্তির মুখে ২০০৬ সালে বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টা হতে অসম্মতি জানান। পরে ওই সময়ের রাষ্ট্রপতি মো. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, যিনি বিএনপির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, তিনি নিজেকেই প্রধান উপদেষ্টা ঘোষণা করেন। তাঁর এই দায়িত্ব নেওয়াকে ঘিরে তুমুল বিতর্ক এক পর্যায়ে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতায় রূপ নেয়।
সে সময় ১/১১ (এক-এগারো) পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট দেখার অভিজ্ঞতাও আমার হয়। আমরা সাংবাদিকদের একটি দল বসে থাকতাম বঙ্গভবনের ফটকের বাইরে। ঘোষণা ছিল ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি হবে নির্বাচন। কিন্তু তা সংশয়ের মধ্যেই ছিল। ভয়াবহ রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। তিনি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন, বাতিল করেন ২২ জানুয়ারির নির্বাচন। বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত গভর্নর ফখরুদ্দীন আহমদকে প্রধান উপদেষ্টা করে সেনাসমর্থিত একটি সরকার দেশ শাসন শুরু করে। ওই সময় সেনাপ্রধান ছিলেন মইন উ আহমেদ। তখনই প্রথমবার কারফিউ পাস নিয়ে আমাকে সাংবাদিকতা করতে হয়েছিল। এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখা হয়নি।
নির্বাচন নিয়ে ‘দীর্ঘায়িত’ সংশয়
দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০০৭ সালের ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদ ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি দুই বছরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আভাস দিয়েছিলেন। এম এ আজিজের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) বাতিল করে ৪ ফেব্রুয়ারি পুনর্গঠন করা হয় ইসি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হন এ টি এম শামসুল হুদা, দুই নির্বাচন কমিশনার (ইসি) ছিলেন মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।
কিন্তু মানুষের মনে নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয় ও সন্দেহের দানা তখন শক্ত হয়ে বিঁধে গেছে। কোনো কিছুই যেন প্রমাণ করে না যে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হবে। এত দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনে সংশয় এত গভীর ছিল কি না, আমার জানা নেই।
আমরা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে (ওই সময় সেটি ছিল শেরেবাংলা নগরে পরিকল্পনা কমিশনে) বসে থাকি। সিইসি অফিস থেকে বের হওয়ার পথে তাঁর পথ আটকে কথা বলার চেষ্টা করি আমরা, উত্তর আসে না। দেশি-বিদেশি নানান পর্যবেক্ষকেরা আসেন, কথা বলেন সিইসিসহ নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে। মাঝেমধ্যে পর্যবেক্ষকেরা চলতে-ফিরতে আমাদের সঙ্গেও কথা বলতেন। একবার এমনই একজন বিদেশি পর্যবেক্ষক আমার সঙ্গে টুকটাক কথা বলছিলেন, ফট করে মন্তব্য করে বসলাম, ‘এর চেয়ে খারাপ গণতন্ত্রও ভালো।’ তখনো জানতাম না এটা ‘নোটেড’ হয়ে গেছে। পরবর্তী সময়ে ওই সংস্থার প্রতিবেদনে অ্যানোনিমাস (নামহীন) হিসেবে ‘কোটেড’ লাইনটি দেখে বুঝলাম, আমারই সেই মন্তব্য!
২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘নির্বাচন কমিশনে পাঁচ বছর (২০০৭-২০১২)’ শিরোনামে এম সাখাওয়াত হোসেনের লেখাতেও উঠে এসেছে এই সংশয়ের কথা। তিনি লিখেছেন, ‘শ্রীপুর পাইলটের (ছবিসহ ডিজিটাইজড ভোটার তালিকা) সফলতার পরও রাজনৈতিক অঙ্গনে আমাদের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ পোষণ অব্যাহত ছিল। ...শুধু রাজনীতিবিদদের মধ্যেই নয়, এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও বেশ সন্দেহ ছিল।’ আরেক জায়গায় তিনি নিজের সন্দেহ নিয়ে লিখেছেন, ‘আমার মনে হয়েছিল, যেকোনো অজুহাতে নির্বাচন পিছিয়ে যেতে পারত। আমার এমন ধারণা অমূলক ছিল না।’
তবে নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ তখন পর্যন্ত অনিশ্চিত ছিল। নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাসখানেক আগে নভেম্বর মাসে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। বিএনপি সময় চাইলে নির্বাচন ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১১ দিন পিছিয়ে ভোটের দিন ঠিক করা হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর।
নির্বাচনী ‘রোডম্যাপ’ ও হাসিনা-খালেদা গ্রেপ্তার
যখন প্রতিদিন নির্বাচন হবে কি হবে না, সেই সংশয়ের মধ্যে দিন যাচ্ছে, তখন একটি নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণার কাঙ্ক্ষিত সময়টি এল। আমরা জানতাম, এটা শুধু নির্বাচনের তারিখ জানান দেবে না, একই সঙ্গে বোঝাবে এই সরকার আসলে কত দিন থাকবে। কারও কোনো আন্দাজ নেই। সবাই অধীর আগ্রহে। রাজনৈতিক দলগুলোও প্রস্তুত প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য।
২০০৭ সালের ১৫ জুলাই সেই বহুল প্রতীক্ষিত দিন এল। শামসুল হুদা কমিশন ওই দিন ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন হবে জানিয়ে নির্বাচনী রোডম্যাপ বা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করে। দীর্ঘ ১৮ মাসের নির্বাচনী পরিকল্পনা। যাক! একটা তারিখ তো পাওয়া গেল! প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানাল। তবে নির্বাচন নিয়ে দ্বিতীয় দফা শঙ্কা শুরু হলো পরদিনই। ওই দিন ভোরবেলায় অর্থাৎ ১৬ জুলাই দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে। দুই মাস পর ৩ সেপ্টেম্বর দুর্নীতির মামলায় গ্রেপ্তার হন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াও।
জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনকে বিশেষ কারাগার ঘোষণা করে রাখা হয় যথাক্রমে খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনাকে। ২০০৮ সালের ১১ জুন শেখ হাসিনা ও ১১ সেপ্টেম্বর খালেদা জিয়া মুক্তি পান।
‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ তত্ত্ব ও বিএনপি নিয়ে বিতর্ক
নির্বাচন কমিশন ২০০৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে। পুরো দেশের নজর ছিল এই সংলাপে। এর মধ্যে বিএনপিকে চিঠি দেওয়া নিয়ে শুরু হলো বিতর্ক। খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হওয়ার আগে দলের মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়াকে বহিষ্কার করেন। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে মহাসচিব নিযুক্ত করেন। নির্বাচন কমিশন আমন্ত্রণ জানায় সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিত মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে। সিইসি শামসুল হুদা এই আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিকে উল্লেখ করেছিলেন ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’ হিসেবে। তিনি বলেছিলেন, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে নির্বাচনী রোডম্যাপ ব্যাহত হতে পারে।
তবে বিতর্কের মধ্যে পরবর্তী সময়ে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির মূলধারার সঙ্গে সংলাপ করেছিল ইসি। এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে পাঁচ বছর বইয়ে সাখাওয়াত হোসেন স্বীকার করেছেন, হাফিজ উদ্দিন আহমদকে চিঠি দেওয়া ছিল ভুল। তিনি লিখেছেন, ‘সংস্কারপন্থীদের প্ররোচনায় আমরা বিভ্রান্ত হয়েছিলাম।’
তবে নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণ তখন পর্যন্ত অনিশ্চিত ছিল। নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাসখানেক আগে নভেম্বর মাসে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। বিএনপি সময় চাইলে নির্বাচন ১৮ ডিসেম্বর থেকে ১১ দিন পিছিয়ে ভোটের দিন ঠিক করা হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর।
কেমন ছিল ভোট
১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১–এর পর ২০০৮ নির্দলীয় সরকারের অধীনে চতুর্থ নির্বাচন। তবে এই নির্বাচনও একেবারে প্রশ্নাতীত ছিল না। বিএনপি ৭২টি আসনের ২২০টি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ করেছিল। জোর আলোচনা ছিল, প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দীন আহমদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার একটি সমঝোতা হয়েছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত তদন্ত কমিশন ২০০৮ সালের নির্বাচনকে সন্দেহজনক উল্লেখ করে ওই নির্বাচন নিয়েও তদন্ত করার সুপারিশ করেছে।
তবে এটা বলা যায়, ২০০৮ সালের নির্বাচন ঘিরে উৎসবমুখর পরিবেশ ছিল, নিরাপত্তাও ছিল। বোমা উদ্ধার ও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া ছোট-বড় কোনো সহিংসতা ছিল না। তবে নির্বাচনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা, লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল।
নির্বাচনে আচরণবিধি মেনে ভোটে দেয়াললিখন ছিল না। দেয়ালে পোস্টার লাগানো হয়নি। সাদা–কালো পোস্টার ঝোলানো হয়েছিল সুতা দিয়ে। প্রার্থী ও নেতাদের ছবিসংবলিত বিশাল তোরণ বা ফটক তৈরি করা হয়নি। মোটরসাইকেল মহড়া ছিল না। যত্রতত্র মাইকিং ছিল না।
নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতত্বাধীন মহাজোট এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের মধ্যে। বৈধ ভোটের হার ছিল ৮৬ দশমিক ২৯ শতাংশে। তবে এই হার নিয়ে ছিল বিতর্ক। এর আগের ৮টি সংসদ নির্বাচনে এত সংখ্যক ভোট পড়েনি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ২৩০টি আসন। বিএনপি পেয়েছিল ৩০টি আসন। চারদলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী ৩৯ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২টিতে জয় পেয়েছিল।
এরপরের ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনগুলো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভোট, রাতের ভোট, ভুয়া ভোট হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে বেশি। সাংবাদিক ও দেশের নাগরিক হিসেবে চাই, ভবিষ্যতে নির্বাচন নিয়ে যেন আর কখনো সংশয় সৃষ্টি না হয়, কখনো যেন একতরফা নির্বাচন না হয়।