উত্তরের ব্যবসা-বাণিজ্যের শহর বগুড়ার বিসিক শিল্পনগরীতে ওষুধ, বেকারি পণ্য, শর্ষে তেল উৎপাদন, প্লাস্টিক পণ্য, ফাউন্ড্রি ও ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, টিউবওয়েল, পানি তোলার সেন্টিফিউগাল পাম্প, কৃষি যন্ত্রপাতিসহ নানা পণ্য উৎপাদনকারী ৯৪টি শিল্প ইউনিট আছে। এর মধ্যে নানা সংকটে চারটি রুগ্ণ শিল্পকারখানা হিসেবে বন্ধ আছে। শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব নিয়ে প্রথম আলো ঢাকার বাইরে শিল্পঘন এলাকার ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে কথা বলছে। বগুড়ার বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি আজিজার রহমানের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আনোয়ার পারভেজ।
প্রশ্ন :
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম সম্প্রতি আবারও বেড়েছে। বেশ দীর্ঘ সময় ধরেই চলছে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধি বগুড়ার শিল্প খাতকে কতটা সমস্যায় ফেলেছে?
আজিজার রহমান : দীর্ঘ সময় ধরে গ্যাস আর বিদ্যুতের সংকটে উত্তরের ব্যবসা-বাণিজ্যের রাজধানী বগুড়ার শিল্পকারখানা ধুঁকছে। শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংযোগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুতের লোডশেডিংও চরমে। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে কারখানা বন্ধ থাকে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ-সংকট মোকাবিলায় শ্রম মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে মঙ্গলবার কলকারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে এখন কার্যত সপ্তাহে দুই দিন কারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বাকি পাঁচ দিন উৎপাদন চালু থাকলেও এখন দিনরাতে গড়ে ৩ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুতের লোডশেডিং চলছে। এতে করে শিল্পকারখানায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে। সপ্তাহে দুই দিন কারখানা বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে।
প্রশ্ন :
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সমস্যা সবচেয়ে বেশি কোন ধরনের শিল্পে?
আজিজার রহমান: বিদ্যুতের ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছে প্লাস্টিক পণ্য উৎপাদনকারী কারখানা। কারখানা চালু অবস্থায় বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়ে, ধীরে ধীরে প্লাস্টিক ঠান্ডা হয়ে যায়। আবার বিদ্যুৎ এলে তাপে প্লাস্টিক গলিয়ে উৎপাদন চালু করতে হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ খরচ বেশি হচ্ছে, পণ্যের উৎপাদন খরচও বাড়ছে। অন্যদিকে গ্যাসের সংকটে অ্যালুমিনিয়াম শিল্পপণ্য উৎপাদনকারী কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটে ফাউন্ড্রি, বেকারিসহ নানা ধরনের ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রমে বিপর্যয় নেমে এসেছে।
প্রশ্ন :
বিদ্যুতের দাম বেড়েছে, বেশ অনেকটা বেড়েছে গ্যাসের দামও। গ্যাস-বিদ্যুতের এই মূল্যবৃদ্ধি শিল্পকারখানায় কতটা প্রভাব ফেলবে?
আজিজার রহমান: সপ্তাহে দুই দিন কারখানা বন্ধ থাকায় উৎপাদন এরই মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এতে পণ্যের সরবরাহও কমেছে। আবার সরবরাহের ঘাটতির কারণে ভোক্তা পর্যায়ে দামও বেড়ে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
প্রশ্ন :
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে টিকে থাকতে হলে পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং কর্মী ছাঁটাই করতে হবে বলে অনেকেই বলছেন। তেমন কোনো আশঙ্কা কি আপনি করছেন?
আজিজার রহমান: গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধিতে ব্যবসায়ী ও শিল্পকারখানা মালিকদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিপর্যয় নেমে এসেছে। নানামুখী সংকটে টিকে থাকতে না পেরে অনেক শিল্পকারখানা রুগ্ণ ও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, হয়তো আরও শিল্পকারখানা বন্ধ হবে।
প্রশ্ন :
বিদ্যুৎ আর গ্যাসের দাম বাড়ানোর আগে দাম বেড়েছিল জ্বালানি তেলেরও। মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, মূল্যবৃদ্ধি। এর বাইরে রয়েছে ডলার-সংকট, ব্যাংকে এলসি খোলা নিয়ে সমস্যা। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে?
আজিজার রহমান: ফাউন্ড্রি শিল্পসহ বেশ কিছু শিল্পে ৪০ শতাংশ কাঁচামাল বাইরে থেকে আমদানি করতে হয়। ডলার-সংকট ও এলসি জটিলতায় কাঁচামাল আমদানি প্রায় বন্ধ। এলসি খোলা নিয়ে ব্যাংক খাতে চলছে একধরনের অরাজকতা। বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা ছাড়াই এলসি খোলা বন্ধ রাখা হচ্ছে। কাঁচামাল আমদানির জটিলতায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বেড়েছে, তেমনি কাঁচামাল আমদানি-জটিলতায়ও পণ্যের দাম বাড়ছে। ফলে ব্যবসা টিকে রাখা দায় হয়ে পড়েছে।
প্রশ্ন :
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিতে ব্যবসার ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেই ক্ষতি থেকে বেরিয়ে আসতে ব্যবসায়ীদের করণীয় কী?
আজিজার রহমান: বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখা অনেক চ্যালেঞ্জের। পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় তা ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। আর অনেক ব্যবসায়ী কারখানা বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন।
প্রশ্ন :
সংকট উত্তরণে সরকারের কী করার আছে? সরকারের কাছে কী প্রত্যাশা?
আজিজার রহমান: কারখানা চালু রাখতে সবার আগে কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার। কাঁচামাল আমদানিতে সহজ শর্তে এলসি খোলা কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়বে ভোক্তাদের ওপর। গ্যাস-বিদ্যুতের ঘন ঘন মূল্যবৃদ্ধি বন্ধ করতে হবে। বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে হবে। শুক্রবার ছাড়া ব্যাংকিং দিনে (মঙ্গলবার) কারখানা বন্ধ রাখার নির্দেশনা প্রত্যাহার করতে হবে।