মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে ছোট উদ্যোক্তাদের খরচ বাড়ছে, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা

ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পর ইসরায়েলের ক্ষেপণাস্ত্রবিধ্বংসী ব্যবস্থা সক্রিয় হয়। আশকেলন, ইসরায়েল, ১৩ এপ্রিলফাইল ছবি: রয়টার্স

নাড়ু, নিমকি, মোয়াসহ বিভিন্ন ধরনের শুকনা খাবার তৈরি করে সেইফ ট্রেডিং নামের একটি কোম্পানি। গত এক মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন খরচ বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে দেশের বাজারে ভোজ্যতেল, চিনি, আটা ও গ্যাসের দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে বেড়েছে প্যাকেজিং (মোড়কজাতকরণ) ও পরিবহন ব্যয়।

সেইফ ট্রেডিংয়ের স্বত্বাধিকারী মোস্তফা কামাল জানান, খাবার তৈরিতে তাঁরা পাম (সুপার) তেল ব্যবহার করেন। গত এক মাসে এই তেলের দাম ড্রামপ্রতি (১৮৫ লিটার) দুই হাজার টাকা বেড়েছে। আবার ৩৫ লিটারের সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় এক হাজার টাকা।

মোস্তফা কামাল বলেন, ‘খরচ বাড়ায় পণ্যের দাম কিছুটা বাড়াতে হবে। কিন্তু যে হারে ব্যয় বেড়েছে, সে হারে দাম বাড়াতে পারব না। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আমাদের মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আরও খারাপ অবস্থার মধ্যে ফেলেছে।’

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন পণ্যের কাঁচামাল ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। যদিও প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে চলার পরে গত বুধবার থেকে যুদ্ধবিরতি চলছে। সর্বশেষ খবর অনুসারে, পাকিস্তানে উভয় পক্ষের চলমান শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেছে। ফলে আবার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে ব্যবসা–বাণিজ্য। গত এক মাসের যুদ্ধের কারণে ইতিমধ্যে দেশে দেশে নানাভাবে ব্যবসায়ের খরচ বেড়েছে।

খাদ্য ও শিল্প উৎপাদন থেকে শুরু করে সেবা খাত পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের উদ্যোক্তারা এই বাড়তি ব্যয়ে চাপের মধ্যে পড়েছেন। অন্যদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ায় এসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির শঙ্কা রয়েছে। এতে আবার ভোক্তাদের ব্যয় বাড়বে।

মার্বেল পাথর ও পলিরেজিন দিয়ে বিভিন্ন ধরনের স্যুভেনির পণ্য বানায় এসএমই প্রতিষ্ঠান হাতবাক্স। গত এক মাসে দেশে এই রেজিনের দাম অন্তত ২০ শতাংশ বেড়েছে। আগে এক ড্রাম (২২৫ কেজি) রেজিন কিনতে লাগত ৫৮ হাজার টাকা। এখন সেই দাম বেড়ে ৭০ হাজার টাকা হয়েছে। অর্থাৎ কেজিতে প্রায় ৫৩ টাকা দাম বেড়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শাফাত কাদির জানান, ‘স্যুভেনির পণ্যের জন্য এখন একটা মৌসুম চলছে। কিন্তু এ সময়ে কাঁচামাল ও অন্যান্য খরচ বাড়ায় আমাদের মুনাফা কমে গেছে। এই যেমন পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বেশ কিছু করপোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে কার্যাদেশ নিয়েছি। আমরা প্রাথমিকভাবে যে ব্যয় হিসাব করেছিলাম, সেটি অন্তত ২০ শতাংশ বেড়ে গেছে। কিন্তু আমরা তো গ্রাহকের কাছ থেকে বাড়তি দাম নিতে পারব না। এভাবে আমাদের লোকসান বেড়েছে।’

যেসব প্রতিষ্ঠান ভারী যন্ত্র তৈরি করে, সেখানেও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। কারখানার জন্য কুলিং যন্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিকসসামগ্রী তৈরি করে আর্টিজান ক্র্যাফট নামের একটি কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহেদ হাসান বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে আমাদের ব্যবসায়ে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। সরকারি একটি প্রকল্পের জন্য আমরা কুলিং ফ্যান তৈরির কার্যাদেশ পেয়েছিলাম। এটি তৈরিতে পিভিসি শিট লাগে, যা তৈরি হয় পেট্রোকেমিক্যাল রেজিন দিয়ে। এখন রেজিনের দাম বাড়ায় রাতারাতি আমাদের ১০ লাখ টাকা খরচ বেড়ে গেছে।’ তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অনেক ব্যবসায়ী অযাচিতভাবে কাঁচামালের দাম বাড়িয়েছেন বলে জানান তিনি।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় গত সপ্তাহ থেকে দোকান ও শপিং মল সন্ধ্যা সাতটায় বন্ধ হচ্ছে। ফলে আগের তুলনায় বেচাকেনার সময়সীমা দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত কমেছে। এতে তৈরি পোশাক, জুতা, গৃহস্থালিসহ অন্যান্য পণ্যের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিক্রি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কমেছে।

ব্যবসায়ীরা জানান, দৈনন্দিন বেচাকেনার ৬০ শতাংশ হয় সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত। ফলে সন্ধ্যা সাতটায় দোকান ও শপিং মল বন্ধের সিদ্ধান্তে বিক্রি কমেছে। রাজধানীর রিং রোডের একটি বিপণিবিতানে অবস্থিত টি গাঁও কারুশিল্প নামের প্রতিষ্ঠান প্রাকৃতিক ডায়িং করা পোশাক বিক্রি করে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী জগদীশ চন্দ্র রায় বলেন, ‘সন্ধ্যা সাতটার পরে দোকান বন্ধের সিদ্ধান্তে আমাদের বেচাকেনা ৩০–৪০ শতাংশ কমে গেছে। বেশি দিন এ অবস্থা চললে আমাদের বড় ধরনের লোকসানে পড়তে হবে।’

এদিকে নানা খাতে ব্যবসায়ের ব্যয় বৃদ্ধির কারণে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়াতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। তবে দাম বাড়লে তা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের ঘাড়ে গিয়েই পড়বে।

বেসরকারি চাকরিজীবী আফরিন নাহার বলেন, ‘এমনিতে যুদ্ধের অজুহাতে রাতারাতি তেল, মাছ ও মুরগির মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সামগ্রীর দাম বেড়েছে। এখন অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়তে থাকলে তা আমাদের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাবে।’

ইতিবাচক খবরও আছে

যুদ্ধের কারণে কোনো কোনো খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিও দেখা গেছে। যেমন চলমান জ্বালানিসংকট ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেকে বৈদ্যুতিক গাড়ি তৈরির দিকে ঝুঁকেছেন। এতে যাঁরা বৈদ্যুতিক গাড়ি বানান, তাঁদের ব৵বসা বেড়েছে।

রাজধানীর ডেমরা এলাকায় বৈদ্যুতিক ও জ্বালানিচালিত গাড়ি বানায় অগ্রণী অটোমোবাইলস নামের একটি এসএমই কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা রাশেদ নাসের বলেন, ‘যুদ্ধের কারণে আমাদের ব্যবসায়ে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের প্রভাবই পড়েছে। আমরা গত এক মাসে পণ্য পরিবহন করা যায়, এমন বেশ কিছু বৈদ্যুতিক গাড়ির (ছোট কাভার্ড ভ্যান ধরনের) কার্যাদেশ পেয়েছি। এগুলোর চাহিদা আগে ছিল না বললেই চলে। বিশেষ করে কুরিয়ার ও এফএমসিজি (দ্রুত বর্ধনশীল খাদ্যসামগ্রী) খাতে এই গাড়ির চাহিদা বেশি। ইতিমধ্যে এ ধরনের কয়েকটি গাড়ি বানিয়ে বিক্রিও করেছি। কিন্তু এ সময়ে জ্বালানিচালিত গাড়ি তৈরির চাহিদা কমেছে।’