শেয়ারের ক্রয়মূল্য না বাজারমূল্য, কোনটা ভালো

শেয়ারবাজার
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

শেয়ারবাজারে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের হিসাব শেয়ারের ক্রয়মূল্য না বাজারমূল্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে, তার নিষ্পত্তি হতে চলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠির জবাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ জানিয়েছে, ‘ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ২৬ক ধারা অনুযায়ী, পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগের ঊর্ধ্বসীমা (এক্সপোজার লিমিট) নির্ধারণের ক্ষেত্রে শেয়ারের ক্রয়মূল্যকে “বাজারমূল্য” হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।’

২০১০ সালে শেয়ারবাজারে ধসের আগে থেকেই পুঁজিবাজার–সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংকের বিনিয়োগ হিসাবের ক্ষেত্রে শেয়ারের ক্রয়মূল্যকে বাজারমূল্য হিসেবে বিবেচনার দাবি জানিয়ে আসছিল। এক যুগের বেশি সময় ধরে এ দাবি অমীমাংসিত রয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর হিসেবে আব্দুর রউফ তালুকদার দায়িত্ব নিয়ে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত এ বিষয় সমাধানের উদ্যোগ নেন। সে অনুযায়ী গত ১৭ জুলাই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের মতামত চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়। ওই চিঠির জবাবে মন্ত্রণালয় গত মঙ্গলবার ফিরতি চিঠিতে তাদের মতামত জানায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এখন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের এখতিয়ারাধীন।

ব্যাংক ও শেয়ারবাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মন্ত্রণালয়ের মতামতের পর বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে নির্দেশনা জারি না করা পর্যন্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক যদি শেয়ারের ক্রয়মূল্যকে ‘বাজারমূল্য’ ধরে পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ হিসাব করে, তাহলে ভবিষ্যতে বাজারে এর প্রভাব পড়বে।

শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ হিসাব ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে করার উদ্যোগটি বাস্তবসম্মত। তাতে বাজারে শেয়ারের দাম বাড়ুক বা কমুক—ব্যাংকের ধারণকৃত শেয়ার বিক্রির চাপ তৈরি হবে না। আবার বিনিয়োগও আইনি সীমার মধ্যে থাকবে।
— সেলিম আর এফ হোসেন, চেয়ারম্যান, এবিবি ও এমডি ব্র্যাক ব্যাংক।

এ নিয়ে গতকাল কথা হয় ব্যাংকের বিনিয়োগের পোর্টফোলিও বা পত্রকোষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত একাধিক ব্রোকারেজ হাউস ও মার্চেন্ট ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর সঙ্গে। তাঁরা বলেন, শেয়ারের ক্রয়মূল্যকে বাজারমূল্য হিসেবে বিবেচনা করা হলে বাজারে শেয়ারের দাম বাড়লেও বিক্রির চাপ তৈরি হবে না। তাঁরা বলেন, এখন প্রায়ই দেখা যায়, শেয়ারের দাম বাড়তে শুরু করলে ব্যাংকের দিক থেকে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। কারণ, দাম বাড়লে তাতে বিনিয়োগসীমাও বাড়ে। তখন বিনিয়োগকে আইনি সীমার মধ্যে রাখতে তাদের বাধ্য হয়ে শেয়ার বিক্রি করতে হয়।

জানতে চাইলে ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সেলিম আর এফ হোসেন বলেন, শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ হিসাব ক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে করার উদ্যোগটি বাস্তবসম্মত। তাতে বাজারে শেয়ারের দাম বাড়ুক বা কমুক, ব্যাংকের ধারণকৃত শেয়ার বিক্রির চাপ তৈরি হবে না। আবার বিনিয়োগও আইনি সীমার মধ্যে থাকবে।

ক্রয়মূল্য বাজারমূল্য হলে লাভ কী
বাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে তাতে শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ বাড়ুক বা না বাড়ুক, শেয়ার বিক্রির চাপ কমবে। উদাহরণ হিসেবে তাঁরা বলেন, ধরা যাক, আইনি সীমার মধ্যে থেকে কোনো ব্যাংকের শেয়ারবাজারে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করার সুযোগ রয়েছে। ব্যাংকটি সেই বিনিয়োগ করল। এরপর বাজারে শেয়ারের দাম বেড়ে যাওয়ায় ওই বিনিয়োগের বাজারমূল্য বেড়ে দাঁড়াল ৮০০ কোটি টাকা। তাতে শেয়ারবাজারে ব্যাংকটির বিনিয়োগ আইনি সীমা ছাড়িয়ে যায়।

তখন বাধ্য হয়ে ওই ব্যাংককে ৩০০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগকে আইনি সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে হয়। তাতে উঠতি বাজারে শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়ে যায়। অন্যদিকে ক্রয়মূল্যকে যদি বাজারমূল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে ওই ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে শেয়ারের দাম যতই বাড়ুক, তাতে নতুন করে ব্যাংকটিকে ওই ৩০০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করতে হবে না। কারণ, ক্রয়মূল্যের বিবেচনায় ব্যাংকটির বিনিয়োগ আইনি সীমার মধ্যে থাকবে।

তবে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী মনে করেন, মন্দা বাজারের ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্যকে বাজারমূল্য ধরা হলে তাতে হয়তো কিছু ব্যাংকের বিনিয়োগ সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু কখনো যদি বাজার অতিমূল্যায়িত হয়ে পড়ে, তখন কী হবে? তিনি বলেন, যেকোনো আইন বা বিধিবিধান করা হয় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব চিন্তা করে। সাময়িক চিন্তা থেকে কোনো আইন বা বিধিবিধান পরিবর্তন করা সমীচীন নয়। ব্যাংকের বিনিয়োগ হিসাব বাজারমূল্যের ভিত্তিতে করা হলে তাতে একধরনের ভারসাম্য বজায় থাকে।

শেয়ারবাজারে প্রভাব
অর্থ মন্ত্রণালয় গত মঙ্গলবার লিখিতভাবে এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিজেদের মতামত জানায়। রাতে বিষয়টি জানাজানি হয়। শেয়ারবাজার–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রাতেই ওই মতামতসংবলিত চিঠিটি পৌঁছে যায়। তার প্রভাবে গতকাল লেনদেন শুরুর ৩০ মিনিটের মধ্যে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১০০ পয়েন্টের বেশি বেড়ে যায়। যদিও দিনের শেষ ভাগে এসে সেই উত্থান বজায় থাকেনি। ফলে এদিনের লেনদেন শেষ হয় ডিএসইএক্স সূচকের ৫০ পয়েন্ট বেড়ে। আর লেনদেন হয় ১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকার।