প্রাথমিকে শিক্ষক নিয়োগ ভেরিফিকেশনে এনএসআই যুক্ত: বাড়ছে চাকরিপ্রার্থীদের উৎকণ্ঠা

ছবি: ফ্রিপিকডটকম

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। তবে এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়া পর শুরু হবে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) ভেরিফিকেশন। সহকারী শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এবারই প্রথম যুক্ত হয়েছে এই গোয়েন্দা তদন্ত। এদিকে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের চার মাস পরও যোগদান আটকে থাকা এবং একের পর এক নতুন শর্ত যুক্ত হওয়ায় নির্বাচিত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীর উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা এখন চরমে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ও প্রশিক্ষণের আগে বিদ্যালয়ে পদায়নের দাবিতে প্রার্থীরা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে (ডিপিই) স্মারকলিপি দিয়েছেন।

পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষ পর্যায়ে, এরপর এনএসআই

মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, লালমনিরহাট, ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইলসহ দেশের প্রায় সব জেলার পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাজ এখন শেষ ধাপে রয়েছে। টাঙ্গাইল জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) কাজী শাহনেওয়াজ প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে আমরা প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়েছি। মোট ১৯৭ জন চাকরিপ্রার্থীর পুলিশ ভেরিফিকেশনের কাজ আমাদের এখানে চলমান। পুলিশ বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে এই তদন্তকাজ পরিচালনা করছে।’

লালমনিরহাট জেলা পুলিশের ডিআইও-১ (ডিএসবি) এস এম মঞ্জুরে মওলা প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলায় চূড়ান্তভাবে মনোনীত ২৩০ জন প্রার্থীর ভেরিফিকেশন কাজ আমরা করছি। আমাদের কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে পুলিশের এই ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।’

তবে মাঠপর্যায়ে পুলিশের এই যাচাই শেষ হলেও প্রার্থীরা এখনই নিয়োগপত্র পাচ্ছেন না। কারণ, এর পরপরই শুরু হবে নতুন যুক্ত হওয়া গোয়েন্দা তদন্তের প্রক্রিয়া। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহীনা ফেরদৌসী এ প্রসঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার প্রথম আলোকে বলেন, সহকারী শিক্ষক নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে জেলাগুলোতে পুলিশ ভেরিফিকেশন শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পুলিশি ভেরিফিকেশনের পর জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) আরও একটি ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। এই দুটি ভেরিফিকেশন প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ হওয়ার পর নির্বাচিত শিক্ষকদের যোগদান প্রক্রিয়া শুরু হবে। এরপর নির্বাচিত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের চূড়ান্ত পদায়ন করা হবে।

উল্লেখ্য, সহকারী শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল গত ৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হয়েছিল। এতে মোট ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের জন্য সাময়িকভাবে সুপারিশ পান। এরপর ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চের মধ্যে তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা (ডোপ টেস্টসহ) ও সব ধরনের সনদ যাচাইয়ের কাজ শেষ করা হয়।

চাকরি স্থায়ী করার শর্ত ও মন্ত্রীর আশ্বাস

মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার নতুন শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ীকরণের ক্ষেত্রে একগুচ্ছ নীতি অবলম্বন করা হচ্ছে। নতুন শিক্ষকদের যোগদানের পর প্রথম দুই বছর শিক্ষানবিশকাল হিসেবে গণ্য হবে। এই দুই বছর পর চাকরি স্থায়ী করার ক্ষেত্রে মোট চারটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা হবে। শর্তগুলো হলো অনুকূল পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্ট, সন্তোষজনক এনএসআই ভেরিফিকেশন রিপোর্ট, প্রশিক্ষণের সফল ফলাফল এবং এই দুই বছর চাকরিকালীন সময়ে বিদ্যালয়ে কাজের দক্ষতা। এই চার দিক ইতিবাচক হলেই চাকরি স্থায়ী করা হবে।

এর আগে গত ৩ মে ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আটকে থাকা ১৪ হাজারের বেশি প্রার্থীকে খুব শিগগির নিয়োগ দেওয়া হবে। এই তালিকা থেকে কাউকেই বাদ দেওয়া হবে না, তবে নিয়োগের ক্ষেত্রে কিছু শর্ত থাকবে। শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, শিক্ষকতা করার জন্য প্রার্থীদের যোগ্যতায় কোনো ঘাটতি আছে কি না, তা দেখা হবে। নিয়োগপত্র দেওয়ার পর তাঁদের প্রশিক্ষণের জন্য পিটিআইতে পাঠানো হবে। সেখানে যদি কেউ অকৃতকার্য হন, তবে তিনি শিক্ষক হতে পারবেন না। সবকিছুই করা হচ্ছে দেশের প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য।

ছবি: এআই/প্রথম আলো
আরও পড়ুন

প্রার্থীদের উদ্বেগ ও অধিদপ্তরে স্মারকলিপি

নিয়োগের এই নতুন নিয়ম ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে সুপারিশপ্রাপ্ত ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থীরা চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় দিন পার করছেন। চূড়ান্ত ফলাফলের পর চার মাস পার হয়ে গেলেও কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারায় অনেকেই অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন। নীলফামারী জেলার এক সুপারিশপ্রাপ্ত প্রার্থী নিয়োগের দুশ্চিন্তায় সম্প্রতি গুরুতর হৃদ্‌রোগে (হার্ট অ্যাটাক) আক্রান্ত হয়েছেন বলে তাঁর সহকর্মীরা জানিয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা জেলার এক প্রার্থী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা মেধার প্রমাণ দিয়ে নির্বাচিত হয়েছি। নিয়োগের আশায় আগের চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে এখন চরম আর্থিক অনটনে আছি। একেকবার একেক নিয়ম আসায় আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে ভুগছি।’

আরও পড়ুন
আরও পড়ুন

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক প্রার্থী বলেন, ‘আগে যোগদানের পরপরই পদায়ন হতো, এরপর শিক্ষকেরা ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ নিতেন। এখন নিয়ম বদলে আগে প্রশিক্ষণের পর পদায়নের কথা বলা হচ্ছে। আমাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া আগের নিয়মে সম্পন্ন করার জন্য আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।’

এই পরিস্থিতিতে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর একটি স্মারকলিপি দিয়েছেন। স্মারকলিপিতে প্রার্থীরা প্রচলিত বিধিমালা অনুযায়ী দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার দাবি জানান। তাঁরা উল্লেখ করেন, প্রশিক্ষণের আগে নির্ধারিত বিদ্যালয়ে পদায়ন ও যোগদান নিশ্চিত করা একজন প্রার্থীর মর্যাদার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। এ ছাড়া নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নতুনভাবে যুক্ত হওয়া এনএসআই রিপোর্টের আইনগত ভিত্তি, প্রয়োজনীয়তা ও এর সময়সীমা সম্পর্কে অধিদপ্তরের কাছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন প্রার্থীরা। দীর্ঘদিন অপেক্ষায় থাকা প্রার্থীদের মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত একটি স্বচ্ছ ও সময়াবদ্ধ ‘রোডম্যাপ’ প্রকাশের জন্য তাঁরা কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন।

আরও পড়ুন