প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ পরীক্ষা ঢাকায়, ১০০ নম্বরের পরীক্ষায় চাকরি

নিয়োগ পরীক্ষায় প্রস্তুতি ভালো থাকলে সাফল্য আসবেইছবি: প্রথম আলো

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হওয়ার প্রক্রিয়ায় শামিল হচ্ছেন প্রায় ৭ লাখ চাকরিপ্রার্থী। ১ হাজার ১২২টি শূন্য পদের বিপরীতে অনুষ্ঠেয় এই পরীক্ষায় প্রতি আসনের জন্য আবেদন করেছেন গড়ে ৬২৪ জন প্রার্থী। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) আয়োজিত এই নিয়োগ পরীক্ষার আবেদনপ্রক্রিয়া ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর শেষ হয়েছে। পিএসসি এখন পরীক্ষা গ্রহণের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু করেছে। একটি পদের বিপরীতে ৬২৪ জন প্রার্থীর এই আবেদন মূলত দেশের শিক্ষিত বেকার সমস্যার ভয়াবহতাকেই নতুন করে স্পষ্ট করেছে।

প্রধান শিক্ষক নিয়োগের এই অবিশ্বাস্য প্রতিযোগিতার বিষয়টি ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক তারিক মনজুর। তাঁর মতে, প্রতিটি সরকারি নিয়োগ পরীক্ষার ক্ষেত্রেই এখন একটি পদের বিপরীতে বিপুলসংখ্যক প্রার্থীকে আবেদন করতে দেখা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হলো, পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষার্থীরা এখন সরকারি চাকরিকেই তাঁদের ক্যারিয়ারের একমাত্র ভরসা মনে করছেন। এই সামাজিক ও মানসিক পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেয়েও কোনোরকমে শুধু একটি ‘সার্টিফিকেট’ পেতে মরিয়া হয়ে উঠছেন।

নিয়োগপ্রাপ্তদের মূল বেতন শুরু হবে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে, যার সর্বোচ্চ ধাপ ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা।
আরও পড়ুন

অধ্যাপক তারিক মনজুর আরও বলেন, ‘আমাদের কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষাক্রম ও সিলেবাস শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতা নিশ্চিত করতে পারছে না। ফলে দেশ কিংবা বিদেশের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রবেশ পর্যায়ে (এন্ট্রি লেভেল) এই শিক্ষিত তরুণদের যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।’ তাঁর মতে, পদ্ধতিগতভাবে নিয়োগ পরীক্ষায় আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। প্রধান শিক্ষক নিয়োগের মতো সংবেদনশীল পরীক্ষায় কেবল তাঁদেরই সুযোগ দেওয়া উচিত, যাঁরা বিশেষ ফলাফলধারী কিংবা সহকারী শিক্ষক পদে যাঁদের অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

প্রথম আলো ফাইল ছবি

চাকরি–সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রধান শিক্ষক পদের প্রতি চাকরিপ্রার্থীদের এই প্রবল আকর্ষণের অন্যতম প্রধান কারণ বেতন গ্রেডের উন্নয়ন। বিদ্যমান ১১তম গ্রেড থেকে পদটি এখন ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়েছে। এর ফলে নিয়োগপ্রাপ্তদের মূল বেতন শুরু হবে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে, যার সর্বোচ্চ ধাপ ৩৮ হাজার ৬৪০ টাকা। আগে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের মূল বেতন শুরু হতো ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে। মর্যাদা ও বেতন বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত মেধাবী প্রার্থীদের এই পদের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী করে তুলেছে।

পরীক্ষা হবে ঢাকায়

প্রধান শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষাটি কবে অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে পিএসসির চেয়ারম্যান মোবাশ্বের মোনেম প্রথম আলোকে জানান, প্রায় সাত লাখ পরীক্ষার্থীর এই বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ কাজ। পরীক্ষাটি শুধু ঢাকা কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে। কমিশন এখনো পরীক্ষার সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করেনি, তবে একটি যৌক্তিক সময়ের মধ্যে স্বচ্ছপ্রক্রিয়ায় পরীক্ষা সম্পন্ন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। দ্বিতীয় শ্রেণির এই পদের পরীক্ষা আয়োজনে যেন কোনো ধরনের ত্রুটি না থাকে, সে বিষয়ে পিএসসি বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করছে বলে জানা গেছে।

আরও পড়ুন

বিধিমালায় পরিবর্তনের ফলে পদসংখ্যা হ্রাস

প্রধান শিক্ষক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিটি ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট প্রথম প্রকাশিত হয়। পিএসসি শুরুতে ২ হাজার ১৬৯টি শূন্য পদের কথা উল্লেখ করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালা’ সংশোধিত হওয়ায় পদের সংখ্যায় বড় পরিবর্তন আসে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদের মোট শূন্য পদের ৮০ শতাংশ পদোন্নতির মাধ্যমে এবং বাকি ২০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণ করার বিধান জারি করা হয়। এই আইনি পরিবর্তনের ফলে সরাসরি নিয়োগের জন্য নির্ধারিত পদের সংখ্যা ২ হাজার ১৬৯ থেকে কমে ১ হাজার ১২২টি নির্ধারিত হয়েছে। পদসংখ্যা প্রায় অর্ধেক হয়ে যাওয়ায় এবং বেতন গ্রেড উন্নীত হওয়ায় প্রতিযোগিতার মাত্রা অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।

আরও পড়ুন

পরীক্ষা পদ্ধতি

পরীক্ষা পদ্ধতির বিষয়ে পিএসসি জানিয়েছে, মোট ১০০ নম্বরের ভিত্তিতে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এর মধ্যে ৯০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হবে। লিখিত পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি, গণিত, দৈনন্দিন বিজ্ঞান ও সাধারণ জ্ঞান (বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি) থেকে প্রশ্ন থাকবে। লিখিত পরীক্ষায় পাস করতে হলে প্রার্থীদের ন্যূনতম ৫০ শতাংশ নম্বর পেতে হবে। লিখিত পরীক্ষায় যাঁরা সফল হবেন, তাঁরা পরবর্তী ধাপে ১০ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।

প্রধান শিক্ষক নিয়োগের এই চিত্র দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান নীতির আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ৬২৪ জন প্রার্থীর এই তীব্র প্রতিযোগিতার ভিড়ে শেষ পর্যন্ত কারা যোগ্য শিক্ষক হিসেবে উত্তীর্ণ হবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।