৪৫তম বিসিএসের গেজেট কবে, ক্যাডার হওয়ার খবর পেয়েও প্রজ্ঞাপন দেখা হলো না তানভীরের

ফাইল ছবি

মীর তানভীর আহমেদ ৪৫তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছিলেন। বাড়ি মাদারীপুরে। পড়েছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিসিএসের ফল প্রকাশের পর নতুন পরিচয়ে কর্মজীবন শুরুর অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। বাকি ছিল সরকারের চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন। এরপর কর্মস্থলে যোগদান। কিন্তু সেই প্রজ্ঞাপন আর দেখে যাওয়া হয়নি তানভীরের। নীলফামারীতে ১৮ আগস্ট ট্রেনে কাটা পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

তানভীরের এই পরিণতি সামনে এনেছে ৪৫তম বিসিএসের সুপারিশপ্রাপ্তদের দীর্ঘ অপেক্ষার করুণ চিত্র। এই বিসিএসে ক্যাডার পদে সুপারিশ পেয়েছেন ১ হাজার ৮০৭ জন। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের ৯ মাস পরও তাঁদের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন হয়নি।

পিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ৩ লাখ ১৮ হাজার প্রার্থীর আবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ৪৫তম বিসিএসের নিয়োগপ্রক্রিয়া। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১২ হাজার ৭৮৯ জন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৬ হাজার ৫৫৮ জন। এরপর মৌখিক পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে পিএসসি, যেখানে ১ হাজার ৮০৭ জনকে ক্যাডার পদে সুপারিশ করা হয়। তার পর থেকে প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা শেষ হয়নি।

গত ৩০ জুলাই ২০২৬ তারিখে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী প্রথম আলোকে জানিয়েছিলেন, ‘আগামী আগস্ট মাসের মধ্যে সব ভেরিফিকেশন শেষ করে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।’ এ মাসের আর ৫ কর্মদিবস রয়েছে। কবে গেজেট হতে পারে, তা জানতে রোববার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি।

আরও পড়ুন

একবার ভেরিফিকেশন, আবারও ভেরিফিকেশন

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্রে জানা গেছে, ৪৫তম বিসিএসের ভেরিফিকেশন রিপোর্ট একটি গোয়েন্দা সংস্থা গত জুলাই মাসে মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছিল। তবে এখন নতুন করে সিদ্ধান্ত হয়েছে, অপর একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের পুনরায় ভেরিফিকেশন করানো হবে। জোড়া ভেরিফিকেশনের কারণে চলতি আগস্টের মধ্যে ৪৫তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।

শুধু ৪৫তম বিসিএস নয়, একই ধরনের পুনঃ ভেরিফিকেশনের জটিলতায় আটকে আছে ৪৬তম ও ৪৯তম (বিশেষ) বিসিএসের চূড়ান্ত নিয়োগ ও প্রজ্ঞাপন প্রক্রিয়াও। অর্থাৎ পিএসসির পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশ ও সুপারিশ—সবই শেষ। কিন্তু নিয়োগের চূড়ান্ত ধাপে এসে আবারও দীর্ঘ অপেক্ষায় ফাঁদে পড়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা।

এই নিদারুণ অপেক্ষার মধ্যেই তানভীরের মতো সুপারিশ পাওয়া আরেক প্রার্থী মুমতাহিনা মিমুও পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। তিনি লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশ পেয়েছিলেন। পড়েছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে গত ১৭ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়। তানভীর ও মিমু—দুজনের নামই এখনো ৪৫তম বিসিএসের সুপারিশপ্রাপ্তদের তালিকায় উজ্জ্বল, কিন্তু প্রজ্ঞাপন দেখে কর্মজীবনে যোগ দেওয়ার সুযোগ তাঁদের হলো না।

আরও পড়ুন

‘ক্যাডার’ পরিচয় আছে, চাকরিতে যোগদান নেই

দীর্ঘ এই অপেক্ষার প্রভাব পড়ছে প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনেও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ৪৫তম বিসিএসে সুপারিশ পাওয়া এক প্রার্থী বলেন, চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর নতুন চাকরির আশায় আগের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘চার বছর ধরে একটি নিয়োগপ্রক্রিয়া ঝুলে আছে। জমানো টাকা শেষ হয়ে গেছে। পরিবারকে মুখ দেখানোর জায়গা নেই। আমি মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়েছি।’

আরেক প্রার্থী নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। তাঁর পড়াশোনার খরচ চালাতে বাবা পরিবারের শেষ সম্বল জমি বিক্রি করেছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেই প্রার্থী বলেন, ‘সামাজিক মর্যাদা মিলেছে। কিন্তু বাস্তব জীবনে নুন আনতে পান্তা ফুরাচ্ছে। এই ঝুলন্ত পরিচয় বহন করা কঠিন। পুরো পরিবার আমার ক্যাডার হওয়ার খবরের ওপর ভরসা করে আছে। প্রশাসনিক জটিলতার এমন শিকার যেন আর কোনো পরিবারকে হতে না হয়।’

আরও পড়ুন

প্রায় চার বছরেও একটি বিসিএস শেষ হলো না

গত জুলাইয়ে প্রাক্-নিয়োগ ভেরিফিকেশন দ্রুত শেষ করার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছিলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী। তিনি জানিয়েছিলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে। আগস্টের মধ্যেই ভেরিফিকেশনের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা হবে। প্রার্থীরাও সেই আশ্বাসে অপেক্ষা করছিলেন।

কিন্তু আগস্টের শেষ সপ্তাহে এসে আবার নতুন করে ভেরিফিকেশনের সিদ্ধান্তের কথা জানা যাচ্ছে। ফলে প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা আরও দীর্ঘ হচ্ছে।

প্রায় চার বছর ধরে চলা একটি বিসিএসের নিয়োগপ্রক্রিয়া কেন এখনো শেষ হয়নি? পুনঃ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজনই বা কেন হলো? এসব বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য জানতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর মুঠোফোনে আজ যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি।

৪৫তম বিসিএসের ১ হাজার ৮০৭ জন প্রার্থী এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন। তাঁদের মেধার স্বীকৃতি আছে। সুপারিশ আছে। সামাজিকভাবে ‘ক্যাডার’ পরিচয়ও আছে। নেই শুধু চাকরিতে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত নিশ্চয়তা।

প্রার্থীদের জোর দাবি, পুনঃ ভেরিফিকেশন দ্রুত শেষ করে ৪৫তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপন অবিলম্বে জারি করা হোক।