৫০তম বিসিএস: এক বছরে নিয়োগ শেষ করার চ্যালেঞ্জ পিএসসির
২০২৬ সালের প্রথম বিসিএস হিসেবে ৫০তম বিসিএসের আবেদনপ্রক্রিয়া ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) জানিয়েছে, এই বিসিএসে ঠিক কতজন চাকরিপ্রার্থী আবেদন করেছেন, তার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে আগামীকাল ৩ জানুয়ারি। তবে আবেদনের শুরু থেকেই প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। এবারের বিসিএসের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো পিএসসির নতুন কর্মপরিকল্পনা বা রোডম্যাপ। কমিশন চাচ্ছে ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে। অর্থাৎ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে শুরু করে চূড়ান্ত সুপারিশ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া এক বছরের মধ্যে শেষ করার একটি জোরালো প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে এই ৫০তম বিসিএস থেকেই।
পরীক্ষার সময়সূচি ও কমিশনের রোডম্যাপ
পিএসসি সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিসিএস পরীক্ষাগুলোর দীর্ঘসূত্রতা কমাতে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করেছে। সেই পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিবছর নভেম্বর মাসে নতুন বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং পরবর্তী বছরের ৩০ অক্টোবরের মধ্যে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ৫০তম বিসিএসের ক্ষেত্রেও এই লক্ষ্যমাত্রা বজায় রাখতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। কমিশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৩০ জানুয়ারি ৫০তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রিলিমিনারির ফল প্রকাশ করে ৯ এপ্রিল থেকে লিখিত পরীক্ষা শুরু করার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মৌখিক পরীক্ষা শুরুর সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ আগস্ট। পিএসসির কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই নির্ধারিত সূচি মেনে কাজ করতে পারলে চাকরিপ্রার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবে।
পদবিন্যাস ও ক্যাডার সংখ্যা
৫০তম বিসিএসে এবার ক্যাডার ও নন-ক্যাডার মিলিয়ে মোট ২ হাজার ১৫০ জনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। এর মধ্যে ১ হাজার ৭৫৫টি পদ রাখা হয়েছে ক্যাডার সার্ভিসের জন্য। সাধারণ ক্যাডারের মধ্যে বরাবরের মতোই প্রশাসন ও পুলিশে বড় নিয়োগ থাকছে। প্রশাসন ক্যাডারে নেওয়া হবে ২০০ জন এবং পুলিশ ক্যাডারে ১১৭ জন কর্মকর্তা। তবে এবারের বিসিএসে সবচেয়ে বড় নিয়োগটি হতে যাচ্ছে স্বাস্থ্য ক্যাডারে, যেখানে মোট ৬৫০ জন চিকিৎসক নিয়োগ পাবেন। এ ছাড়া কৃষি ক্যাডারে ১২০ জন এবং শিক্ষা ক্যাডারে সাধারণ কলেজগুলোর জন্য ১৩৯ জন প্রভাষক নেওয়া হবে। মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার জন্যও আলাদা পদ রাখা হয়েছে। ক্যাডার পদের বাইরেও ৩৯৫টি নন-ক্যাডার পদের জন্য সুপারিশ করা হবে এই বিসিএস থেকে। যার মধ্যে নবম গ্রেডে ৭১ জন, দশম গ্রেডে ৪২ জন এবং ১১ ও ১২তম গ্রেডে বড় একটি অংশ নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় নম্বরের রদবদল
এবারের বিসিএসে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার নম্বর বণ্টন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনেছে পিএসসি। ২০০ নম্বরের এমসিকিউ পরীক্ষায় মোট নম্বর অপরিবর্তিত থাকলেও ছয়টি বিষয়ের নম্বরে ভারসাম্য আনা হয়েছে। বিগত ৪৭তম বিসিএস পর্যন্ত বাংলা ও ইংরেজি উভয় বিষয়ে প্রিলিমিনারিতে ৩৫ নম্বর করে বরাদ্দ থাকলেও ৫০তম বিসিএসে এই দুই বিষয়ে ৫ নম্বর করে কমিয়ে ৩০ নম্বর করা হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ বিষয়াবলির নম্বরও ৫ কমিয়ে ২৫ করা হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি, গাণিতিক যুক্তি এবং নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন—এই তিন বিষয়ে ৫ নম্বর করে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে এখন থেকে আন্তর্জাতিক বিষয়াবলিতে ২৫, গাণিতিক যুক্তিতে ২০ এবং নৈতিকতা ও সুশাসনে ১৫ নম্বরের পরীক্ষা দিতে হবে প্রার্থীদের। পিএসসি মনে করছে, এই পরিবর্তন প্রার্থীদের যৌক্তিক ও নৈতিক মানদণ্ড যাচাইয়ে আরও সহায়ক হবে।
প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের জন্য বিশেষ নির্দেশনা
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন বা প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের মধ্যে যাদের পরীক্ষার জন্য শ্রুতিলেখক প্রয়োজন, তাদের জন্য আলাদা নির্দেশনা জারি করেছে পিএসসি। আগ্রহী প্রার্থীদের ৮ জানুয়ারির মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করতে হবে। এই আবেদনের সঙ্গে প্রার্থীর সিভিল সার্জনের দেওয়া ডাক্তারি প্রত্যয়নপত্র, সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের ছবি এবং প্রতিবন্ধী পরিচয়পত্রের সত্যায়িত কপি যুক্ত করে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) বরাবর জমা দিতে হবে। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে পিএসসি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত যোগ্যতাসম্পন্ন ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রুতলেখক প্রদান করবে। নির্ধারিত সময়ের পর আবেদন করলে শ্রুতলেখক পাওয়ার কোনো সুযোগ থাকবে না বলে কমিশন সতর্ক করে দিয়েছে।
বিগত বিসিএসগুলোতে আবেদনের পরিসংখ্যান
বিগত কয়েক বছরের বিসিএস পরীক্ষার আবেদনের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে বিসিএসের প্রতি আগ্রহ সব সময়ই তুঙ্গে থাকে। ৪৩তম বিসিএসে রেকর্ড ৪ লাখ ৩৫ হাজার ১৯০টি আবেদন জমা পড়েছিল। পরবর্তী ৪৪তম বিসিএসে আবেদন করেছিলেন ৩ লাখ ৫০ হাজার ৭১৬ জন এবং ৪৫তম বিসিএসে আবেদন জমা পড়ে ৩ লাখ ১৮ হাজার। ৪৬তম বিসিএসে এই সংখ্যা কিছুটা বেড়ে ৩ লাখ ৩৮ হাজারে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ৪৭তম বিসিএসে অংশ নিতে ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৭৪৭ জন প্রার্থী আবেদন করেছিলেন। ৫০তম বিসিএসেও এই সংখ্যার কাছাকাছি আবেদন পড়বে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।