৫ বছরে ১ কোটি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য: কতটা প্রস্তুত আমাদের দক্ষতা প্রশিক্ষণ

মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ছাড়ার আগে বাংলাদেশী কর্মীরাছবি: প্রথম আলো

বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর রেকর্ডসংখ্যক কর্মী বিদেশে গেলেও তাঁদের একটি বড় অংশই যান হাতে-কলমে দক্ষতা ছাড়া। অথচ জাপান, ইউরোপসহ বিশ্বের উন্নত নতুন শ্রমবাজারগুলোতে এখন অদক্ষ কর্মীর সুযোগ কমছে, বাড়ছে দক্ষ কর্মীর চাহিদা। এ বাস্তবতার মধ্য দিয়েই আগামী পাঁচ বছরে বিদেশে মোট এক কোটি কর্মীর কর্মসংস্থানের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। তবে সরকার নিজেই স্বীকার করছে, এই লক্ষ্য পূরণে দেশের বর্তমান কারিগরি প্রশিক্ষণ সক্ষমতা এখনো অর্ধেকের কিছুটা বেশি।

আরও পড়ুন

প্রশিক্ষণ অবকাঠামো ও সক্ষমতার ঘাটতি

এক কোটি কর্মী পাঠানোর পথ সুগম করতে দেশে বর্তমানে ১১০টি সরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) এবং ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি। এসব কেন্দ্রে বর্তমানে ৫৫টি বিভিন্ন মেয়াদি প্রশিক্ষণ কোর্স চালু রয়েছে এবং প্রতিবছর ১২ লাখের বেশি মানুষকে কারিগরি সনদ দেওয়া হচ্ছে।

তবে পাঁচ বছরের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে গড়ে প্রতিবছর অন্তত ২০ লাখ কর্মীকে বিদেশ পাঠাতে হবে। কিন্তু ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) আয়োজিত এক জাতীয় পরামর্শ সভায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সাইফুল হক চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য বাংলাদেশের বর্তমান সক্ষমতা ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ।’ অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ে লক্ষ্য স্পর্শ করতে হলে বিদ্যমান প্রশিক্ষণ অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে।

আরও পড়ুন

চাহিদানুগ প্রশিক্ষণ ও সমন্বিত উদ্যোগ

বিদেশের বাজারে অদক্ষ কর্মীর চাহিদা কমে যাওয়া এবং সমন্বিত প্রশিক্ষণের গুরুত্ব প্রসঙ্গে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোখলেছুর রহমান আকন্দ প্রথম আলোকে বলেন, ‘দেশের বাইরে অদক্ষ শ্রমিকের বাজার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে। দেশের বাইরে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের কাজগুলো সমন্বিতভাবে করার চেষ্টা চলছে। ইতিমধ্যে জাপানে কর্মসংস্থান সম্পর্কিত কাজগুলো সমন্বয়ের জন্য ‘জাপানি সেল’ গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশজুড়ে অবস্থিত টিটিসিগুলো প্রশিক্ষণের কাজগুলো নিয়মিত করছে। দক্ষ জনবল ছাড়া বর্তমানে বিদেশের শ্রমবাজারে কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব।’

গত জুলাই মাসে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সংসদে জানান, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশ মিশনগুলোর মাধ্যমে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ কর্মীর সম্ভাব্য বৈশ্বিক চাহিদার পূর্বাভাস সংগ্রহ করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বিদেশি নিয়োগদাতাদের সুনির্দিষ্ট চাহিদার সঙ্গে দেশীয় প্রশিক্ষণ কারিকুলামের পুরোপুরি সমন্বয় হয়নি। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) অধীনে ২ হাজার ৩০০টির বেশি প্রতিষ্ঠানে সাত লাখের বেশি কর্মী সনদ পেলেও বৈশ্বিক বাজারে এই সনদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার বিষয়টি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

কর্মসংস্থান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যা সমাধানে দেশের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা পৃথক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিগুলোকে একটি অভিন্ন সরকারি সনদের আওতায় আনা এবং আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কাজ জরুরি ভিত্তিতে শুরু করা প্রয়োজন।

প্রশিক্ষণ থেকে বিদেশযাত্রার সরকারি চিত্র

দক্ষ কর্মী তৈরি করে নিরাপদভাবে বিদেশে পাঠানোর কাজে বড় ভূমিকা রাখছে সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ১৯৭ জন কর্মী বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে জর্ডানে সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ৫৪৩ জন, ব্রুনেইয়ে ১ হাজার ৮১২ জন এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ১ হাজার ৪০৪ জন কর্মী গেছেন।

আরও পড়ুন

এর পাশাপাশি প্রযুক্তিভিত্তিক ‘ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্ম’ (OEP) চালু করা হয়েছে। যার মাধ্যমে বিদেশি নিয়োগদাতা, প্রার্থী, প্রশিক্ষণকেন্দ্র ও বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসে ভিসা যাচাই ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য অর্জন করতে হলে বহির্বিশ্বের চাহিদার সঙ্গে দেশীয় প্রশিক্ষণকে মেলাতে হবে। প্রশিক্ষণের সনদকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রশিক্ষিত কর্মীদের সরাসরি বিদেশের চাকরির সঙ্গে যুক্ত করাই এখন প্রধান কাজ।