পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েও গেজেটে নেই ছেলের নাম, কৃষক হাতেম আলীর কান্না থামছে না...

রাজশাহীর পুঠিয়ার এক প্রান্তিক গ্রাম নলপুকুরিয়া। বর্ষায় এখানকার মেঠোপথ কাদায় একাকার হয়ে যায়। সেই পথ মাড়িয়েই স্কুলে যেতেন কৃষক হাতেম আলীর ছেলে শামীম শাহরিয়ার। হাতেম আলীর নিজের অক্ষরজ্ঞান থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জোটেনি। তাই ফসলের মাঠে লাঙল চালাতে চালাতে তিনি স্বপ্ন বুনতেন—ছেলে একদিন দেশের সবচেয়ে বড় চাকরিটি করবে। বাবার সেই স্বপ্ন পূরণে শামীমও ছিলেন অদম্য। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি, এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি—সবই ছিল সেই স্বপ্নের একেকটি ধাপ।

মেধার চূড়ান্ত স্বাক্ষর রেখেছিলেন বিসিএস পরীক্ষায়। ৪৩তম বিসিএসে প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন শামীম। কিন্তু যেদিন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে যোগদানের তারিখ ছিল, ঠিক সেদিনই ছিল ৪৪তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা। পররাষ্ট্র ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন আর নিজের প্রতি অটুট বিশ্বাস থেকে তিনি প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেননি। ঝুঁকি নিয়েছিলেন। ফলও পেয়েছিলেন হাতেনাতে—৪৪তম বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করেন শামীম।

ছেলের এমন সাফল্যে কৃষক বাবার বুক গর্বে ভরে উঠেছিল। কিন্তু সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ প্রকাশিত ৪৪তম বিসিএসের গেজেটে শামীমের নাম নেই। কারণ সেই ‘পুরোনো’ পুলিশ ভেরিফিকেশন জটিলতা। প্রশাসন ক্যাডারের নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হয়েও শামীম এখন শূন্য হাতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

আরও পড়ুন

কৃষক হাতেম আলীর বোবা কান্না...

ছেলের নিয়োগ আটকে যাওয়ার খবরে ভেঙে পড়েছেন কৃষক হাতেম আলী। মুঠোফোনে কথা বলার সময় বারবার কেঁদে ফেলছিলেন তিনি। ধরা গলায় বললেন, ‘আপনারা আমার গ্রামে আসুন। পাড়া-প্রতিবেশীর কাছে খোঁজ নিন। কেউ আমার ছেলে সম্পর্কে একটা খারাপ কথা বলতে পারবে না। সকাল-সন্ধ্যা কঠোর পরিশ্রম করে জমিতে ফসল ফলিয়েছি। রাজনীতির ধারেকাছেও যাইনি কোনো দিন। তারপরও আমার ছেলের প্রতি এই অবিচার কেন?’

হাতেম আলী আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমার বাড়ি থেকে বাজারে যাওয়ার রাস্তাটা এখনো কাঁচা। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থেকে অনেক দূরে থেকেও শুধু কঠোর পরিশ্রম আর নিষ্ঠার কারণে আমার ছেলে সফল হয়েছে। কিন্তু এই অভাগা দেশে কৃষকের ছেলের পরিশ্রম, মেধার কোনো দাম আছে বলে এখন আর মনে হয় না।’ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে হাতেম আলীর আকুল আবেদন, ‘আপনারা আবার তদন্ত করুন। আমি রাষ্ট্রের কাছে ন্যায়বিচার চাই।’

আরও পড়ুন

এ প্রসঙ্গে নিয়োগবঞ্চিত শামীম শাহরিয়ার বলেন, ‘ছাত্রজীবনে গণরুমে এক বছর কেটেছে। এরপর সাড়ে তিন বছর ছয়জন মিলে হলের একটি ছোট রুমে ছিলাম। যদি কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থাকত, তাহলে হলজীবনে অনেক আরাম-আয়েশে থাকতে পারতাম। প্রথম বর্ষ থেকেই মেডিকেলে পড়ার পাশাপাশি বাবাকে দেওয়া কথা রাখতে বিসিএসের প্রস্তুতি নিয়েছি। নিজের প্রতি আস্থা ছিল, তাই আগের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার সঙ্গে এমনটা ঘটবে, স্বপ্নেও ভাবিনি।’ তিনি ন্যায়বিচারের আশায় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পুনঃ তদন্তের আবেদন করেছেন।

পুলিশের নেতিবাচক প্রতিবেদনে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁরা পুনঃ তদন্ত চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারেন। মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিয়ে আবেদনগুলো বিবেচনা করবে।
মানসুর হোসেন, জনসংযোগ কর্মকর্তা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়

মেধার সব পরীক্ষায় সেরা, তবু গেজেটে নেই লেলিন ও মসিউর

পুলিশ ভেরিফিকেশনের এই ‘অদৃশ্য’ জটিলতায় স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের শিক্ষার্থী রাব্বি লেলিন আহমেদেরও। স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে ঈর্ষণীয় ফল করা লেলিন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় দ্বিতীয় এবং ফার্মেসি কাউন্সিলে প্রথম হয়েছিলেন। ৪৪তম বিসিএসই ছিল তাঁর প্রথম বিসিএস, যেখানে তিনি প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন।

আরও পড়ুন

লেলিন আক্ষেপ করে বলেন, ‘অন্য কারও পদ নষ্ট করব না ভেবে ৪৫তম বিসিএসে শুধু পররাষ্ট্র চয়েস দিয়েছিলাম। ৪৬ ও ৪৭তম প্রিলিমিনারিতে টিকেও রিটেন দিইনি। এমনকি ৫০তম বিসিএসে আবেদনও করিনি। নিজের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস ছিল। বাবা সেনাবাহিনীর সার্জেন্ট ছিলেন, আমরা কখনো রাজনীতির সঙ্গে ছিলাম না। ক্যাম্পাসে আমার কোনো পদ-পদবি ছিল না। তারপরও আমার সঙ্গে কেন এমন অন্যায় হলো?’

একই হাহাকার সিরাজগঞ্জের মসিউর রহমানের। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এই শিক্ষার্থী মোট সাতটি বিসিএসে অংশ নিয়েছেন। ৪৪তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়েও গেজেটে নাম আসেনি। ৪৫তম বিসিএসের ভাইভা দিলেও টেকেননি। হতাশ মসিউর বলেন, ‘আমার সরকারি চাকরির বয়স শেষ। পরিবারে কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই। তারপরও কেন বাদ পড়লাম? এখন আমি কী করব? মানসিকভাবে আমি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছি।’

আরও পড়ুন

নিয়োগবঞ্চিতের তালিকায় আরও যাঁরা

পুলিশ ভেরিফিকেশন জটিলতায় ৪৪তম বিসিএসে নিয়োগবঞ্চিত হয়েছেন এমন ১১ জন চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে প্রথম আলো যোগাযোগ করতে পেরেছে। তবে ভুক্তভোগীর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। যোগাযোগ করা প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—মসিউর রহমান (লাইভস্টক), শরিফুল আলম সুমন (লাইভস্টক), শফিউল ইসলাম সজন (সাধারণ শিক্ষা), শান্তনু দাশ (প্রশাসন), সাদমান ফাহিম (স্বাস্থ্য), সোহানা আরেফিন (সাধারণ শিক্ষা), রোহান ইসলাম (মৎস্য), সম্রাট আকবর (কৃষি), খালেদ সাইফুল্লাহ ইলিয়াস (কারিগরি শিক্ষা) ও সোয়ান ইসলাম সজিব (প্রশাসন)।

৫ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ৪৪তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপন জারি করে। পিএসসি ১ হাজার ৬৭৬ জনকে সুপারিশ করলেও গেজেটে নাম এসেছে ১ হাজার ৪৯০ জনের। অর্থাৎ ১৮৬ জন বাদ পড়েছেন।

এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মানসুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গেজেটে নাম না থাকা অধিকাংশ প্রার্থী স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নেননি। আর পুলিশের নেতিবাচক প্রতিবেদনের কারণে যাঁরা বাদ পড়েছেন, তাঁরা পুনঃ তদন্ত চেয়ে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে পারেন। মন্ত্রণালয় গুরুত্ব দিয়ে আবেদনগুলো বিবেচনা করবে।’

নেতিবাচক পুলিশ প্রতিবেদনের প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর আল–মতিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রার্থীর নিজের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো ফৌজদারি অপরাধের প্রমাণ না থাকলে, কেবল পুলিশি প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে কাউকে নিয়োগবঞ্চিত করা সংবিধান ও মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রার্থীর যোগ্যতা তাঁর মেধা দিয়ে বিচার হওয়া উচিত, তাঁর আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক পরিচয় বা স্থানীয় কোন্দল দিয়ে নয়।’