default-image

‘জাওয়াদ আলম, সাইনিং আউট।’

নিজের বক্তৃতা শেষে এ কথা বলে জাওয়াদ নেমে গেলেন বটে, কিন্তু দর্শক সারির পেছন থেকে ভেসে আসা চিৎকার শুনে বোঝা গেল, এই মঞ্চ কেউ ছেড়ে যায় না। পেছনে ভিড় করে যে মানুষগুলো দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাঁরা নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাবের (এনডিডিসি) সাবেক সদস্য। আর জাওয়াদ? তিনি সদ্য সাবেক সভাপতি। ‘সাবেক’ শব্দটা এখানে অবশ্য বেমানান লাগছে। কলেজে শিক্ষার্থীদের সময়কাল মাত্র দুই বছর। কিন্তু এনডিডিসির সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকেন আরও বহুদিন।

সম্প্রতি ২৯তম এনডিডিসি ন্যাশনালস ২০১৮ বিতর্ক প্রতিযোগিতার মঞ্চে নতুন একটা দলের হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন জাওয়াদ। এখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। কলেজের হয়ে বিতর্কে লড়ার, অনুষ্ঠান আয়োজন করার সময় ফুরিয়েছে। এবার অন্যদের পালা। এভাবেই একের পর এক বিতার্কিক আসছেন, বিদায় নিচ্ছেন। এই ধারা বজায় আছে অনেক বছর ধরে। কত বছর? প্রশ্নের উত্তরটা চোখ কপালে তোলার মতো। ১৯৫৩ সালের ২৮ মার্চ নটর ডেম কলেজের প্রথম ক্লাব হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল এনডিডিসি। পাঠক, এবার বয়সটা নিজেই হিসাব করে দেখুন!

শুধু নিজেদের ক্যাম্পাসেই নয়, জাতীয় অঙ্গনেও আরও কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রথম নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাব, এমনটা দাবি করলেন জাওয়াদ আলম। বললেন, ‘১৯৮২ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা আয়োজন করি আমরা। “এনডিডিসি জাতীয় বিতর্ক প্রতিযোগিতা” শিরোনামে প্রতিবছর এই আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া, ২০০১ সাল থেকে আমরা আয়োজন করি “জাতীয় ইংরেজি বিতর্ক প্রতিযোগিতা”। আমাদের ক্লাবের দুটি বাৎসরিক প্রকাশনা আছে—দ্রোহ ও দ্বৈরথ। আর সব সময় আমাদের সঙ্গে থেকে সাহস জোগানোর কাজটা করেন মডারেটর শহিদুল হাসান পাঠান স্যার।’

বিতর্ককে নতুনত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে ক্লাবটির নব সংযোজন—লীগ পদ্ধতির বিতর্ক। সাধারণ বিতর্ক প্রতিযোগিতার নিয়মের চেয়ে একেবারেই আলাদা এটি। ‘গত বছরের জুন মাসের ১ তারিখে বসেছিল “এনডিডিসি ডিবেটারস লীগ: সিজন ১০”-এর আসর। ১২টি দলের মধ্যে চলে সেরা হওয়ার তুমুল লড়াই। দল গঠন করা হয় নিলামের মাধ্যমে। প্রতিটি দলের একজন ম্যানেজার থাকেন। বিতার্কিকেরা থাকেন তিনটি পুলে। প্রতি পুল থেকে একজন করে নিয়ে তিনজনের দল গঠন করতে হয়।’ বললেন জাওয়াদ।

নতুন বিতার্কিক তৈরিতেও এনডিডিসির জুড়ি নেই। জাওয়াদের কাছে ক্লাবের বিশেষত্বটা এখানে। ‘আমাদের বিশেষত্বই হচ্ছে আমরা নবীন বিতার্কিক তৈরি করি। দীর্ঘ বাছাই প্রক্রিয়ার পর নির্বাচন করা হয় এনডিডিসি গোল্ড, ব্লুসহ সব দলের সদস্যদের। প্রথম ছয় মাস তারা বিভিন্ন কর্মশালায় অংশ নেয়। কর্মশালাগুলো পরিচালনা করেন সংগঠনের সাবেক সদস্যরা, যাঁরা প্রত্যেকে তাঁদের সময়ের অন্যতম সেরা বিতার্কিক। এরপর শুরু হয় বাছাই প্রক্রিয়া। প্রথমে লিখিত পরীক্ষা হয়, যেখানে বিতর্কের নিয়ম-কানুন ও সাম্প্রতিক বিষয়াবলি নিয়ে প্রশ্ন থাকে। এরপর হয় আন্তগ্রুপ বিতর্ক প্রতিযোগিতা। সেখান থেকে প্রাক্‌-বারোয়ারি, বারোয়ারি বিতর্কের পর সর্বশেষ ১২ জনকে নটর ডেম গোল্ড, ব্লু, সিলভার ও গ্রিন দলে জায়গা দেওয়া হয়।’

বোঝা গেল, দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েও আসলে দায়িত্ব ছাড়া হয় না এনডিডিসির সাবেক সদস্যদের। বড়দের সঙ্গে ছোটদের সম্পর্ক নিয়ে বলছিলেন ক্লাবের বর্তমান সভাপতি ফারহান আনজুম, ‘আমাদের কাছে ক্লাবটা একটা পরিবারের মতো। বড়রা একসময় এই জায়গাটায় কাজ করে গিয়েছেন। তাঁদের হাত ধরেই আজ এখানে পৌঁছাতে পেরেছি আমরা। এখন ক্লাবের কোনো আয়োজনে দায়িত্বে থাকি আমরা ছোটরা, কিন্তু অনেক সাবেক সদস্যই সেখানে উপস্থিত থাকেন। তাঁদের ওপর কিন্তু কোনো দায়িত্ব দেওয়া থাকে না, তবু ক্লাবের প্রতি ভালোবাসার জায়গা থেকে তাঁরা আসেন। প্রয়োজনের সময় গাইডলাইন দিয়ে আমাদের পাশে থাকেন। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় একটা পাওয়া।’

সাবেক সভাপতি ইথার আদিব রহমান বর্তমানে পড়ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। এনডিডিসির সঙ্গে কাগজে-কলমে সম্পর্ক চুকে গেছে কয়েক বছর আগে। কিন্তু এখনো কোনো উপলক্ষ পেলে ছুটে যান প্রাণের ক্লাবে। ‘আমার মতে, এখানে কেউ আলাদা নয়। সিনিয়র-জুনিয়র-মডারেটর সবাই মিলে একটা সত্তা। কর্মশালা, বিচারকার্যসহ যেকোনো কাজে আমরা সব সময় পাশে থাকার চেষ্টা করি। এ ছাড়া যেকোনো পরামর্শ তো থাকেই।’ বললেন আদিব রহমান।

আগামী মাসে ক্লাবের বর্ষপূর্তি। অপেক্ষা করছে নতুন-পুরোনোর আরেকটি মিলনমেলা। পুরোনোর অভিজ্ঞতা আর নতুনের উদ্যম মিলিয়ে বয়সের মুকুটে নতুন আরেকটি পালক পরতে যাচ্ছে নটর ডেম ডিবেটিং ক্লাব।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0