এসএসসি পরীক্ষা ২০২৬—বাংলা ১ম পত্র: সৃজনশীল প্রশ্ন
ইতিহাসে জাতীয় বীরদের মৃত্যু নেই, তারা অনুপ্রেরণা জোগাতে ফিরে আসেন
বাংলা ১ম পত্র: সৃজনশীল প্রশ্ন
গদ্য: একুশের গল্প
ওসমান বলে, খিজির তুমি না মারা গেছ? রাতের মিছিলে মারা গেছ। ভোর তিনটা বাজার আগেই তোমার হাঁ করা মুখের ওপর বড় বড় মাছি ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছিল। জুম্মন নিজের চোখে দেখেছে, তোমার লাশ মিলিটারি ট্রাকে ওঠাতে।
প্রশ্ন
ক. তপুর স্ত্রী কে?
খ. ‘চেনার কোনো উপায় থাকলে তো চিনবে’—বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
গ. উদ্দীপকটিতে ‘একুশের গল্প’ ছোটগল্পের কোন ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে? ব্যাখ্যা করো।
ঘ. উদ্দীপকটি ‘একুশের গল্প’ ছোটগল্পের সমগ্র ভাব প্রকাশ করে না।—যুক্তিসহ তোমার মতামত উপস্থাপন করো।
উত্তর
ক. তপুর স্ত্রী রেণু।
খ. কঙ্কাল দেখে মানুষ চেনা যায় না বোঝাতে তপু প্রসঙ্গে প্রশ্নের উক্তিটি করা হয়েছে।
তপু ছিল মেডিকেলের ছাত্র। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহীদ হয়। পরিবারের পিছুটান উপেক্ষা করে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে যুক্ত হয় তপু। ভাষা আন্দোলনের মিছিলে অংশ নিলে কপালে গুলিবিদ্ধ হয়ে সে শহীদ হয়। মিলিটারিরা তুলে নিয়ে যায় তার মৃতদেহ। ঘটনার ধারাবাহিকতায় একদিন কলেজের হোস্টেলে আবিষ্কার হয় তপুর দেহের কঙ্কাল। তা দেখে রাহাতের মনে হয়, এটা যে তপুর দেহ, তা চেনার উপায় নেই। কেননা, কঙ্কাল দেখে রক্তমাংসের জীবিত মানুষকে শনাক্ত করা যায় না।
গ. উদ্দীপকটিতে ‘একুশের গল্প’ ছোটগল্পের তপুর কঙ্কালরূপে ফিরে আসার ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে।
‘একুশের গল্প’ রচনার কেন্দ্রীয় চরিত্র তপু মহান একুশের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত। অসীম সাহস আর মাতৃভাষার প্রতি গভীর আবেগ ও ভালোবাসা নিয়ে সে এগিয়ে যায় ভাষা আন্দোলনের মিছিলের অগ্রভাগে। কপালের মাঝখানে গুলি লেগে প্ল্যাকার্ডসহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে তপু। মৃত্যুবরণ করে সাহসী বীরের মতো। এ ঘটনার কয়েক বছর পর কলেজ হোস্টেলে তপুর সহপাঠীরা আবিষ্কার করে তপুর কঙ্কাল। তপুর এ কঙ্কাল হিসেবে ‘ফিরে আসা’ প্রতীকী তাৎপর্য বহন করে। অর্থাৎ ইতিহাসে বীরদের কোনো মৃত্যু নেই। তাঁরা বারবার ফিরে আসেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রেরণা জোগাতে।
উদ্দীপকে খিজিরের মারা যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তার লাশ রাতেই মিলিটারিরা ট্রাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়; কিন্তু ওসমানের মনে হয়, খিজির জীবিত। তাই ওসমান জিজ্ঞাসা করে তুমি না মৃত। জুম্মন নিজের চোখে তোমার মৃতদেহ দেখেছে। এখানে খিজিরের ফিরে আসাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখানো হয়েছে। ‘একুশের গল্প’ রচনায় যেমন তপুর মৃত কঙ্কালের মধ্য দিয়ে লেখক পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন আন্দোলন–সংগ্রামের প্রধান প্রেরণা হিসেবে দেখিয়েছেন।
ঘ. কেবল খিজির মারা যাওয়ার পর আবার ফিরে আসার বিষয়টি তুলে ধরায় উদ্দীপকটি ‘একুশের গল্প’ ছোটগল্পের ভাব প্রকাশ করতে পারেনি।
‘একুশের গল্প’ ছোটগল্পের লেখক ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে তপু নামের এক প্রাণোচ্ছল ও স্বপ্নবান তরুণের আত্মত্যাগের কথা তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে তুলে ধরেছেন তিন বন্ধুর আন্তরিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলাদেশের বাস্তবতার চিত্র। গল্পে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার অধিকার চাইতে গিয়ে ভাষা আন্দোলনে শহীদ হয় তপু। ঘটনার চার বছর পর কলেজের হোস্টেলে আবিষ্কার হয় তপুর কঙ্কাল। তপুর এই কঙ্কাল হিসেবে ফিরে আসার মাধ্যমে লেখক বোঝাতে চেয়েছেন, ইতিহাসে জাতীয় বীরদের মৃত্যু নেই, তাঁরা বারবার ফিরে আসেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগাতে।
উদ্দীপকে খিজির রাতের মিছিলে গিয়ে মারা যায় এবং তার লাশের ওপর বড় বড় মাছি ভনভন করে ঘুরতে দেখা যায়। একই সঙ্গে জুম্মন নিজেই দেখেছে, মিলিটারি ট্রাকে করে তার লাশ নিয়ে যেতে; কিন্তু ওসমানের কল্পনার জগতে খিজির বারবার ফিরে আসে। খিজিরের এই ফিরে আসা মূলত বাঙালির আন্দোলন–সংগ্রামের প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে। কেননা, জাতির ইতিহাসে বীরেরা চির অমর। তাঁরা বারবার ফিরে আসেন আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে। তেমনি ‘একুশের গল্প’ রচনায় তপুর কঙ্কাল হিসেবে ফিরে আসাও পরে বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের প্রেরণা দেয়।
‘একুশের গল্প’ ছোটগল্পে বিস্তৃত পরিসরে তপুর ভাষা আন্দোলনে আত্মত্যাগ ও মৃত্যুর চার বছর পর কঙ্কাল হিসেবে সহপাঠীদের কাছে ফিরে আসা স্ত্রী রেণু ও তার বৃদ্ধ মায়ের কথা উঠে এসেছে। একই সঙ্গে লেখক তিন বন্ধুর আন্তরিক সম্পর্ক ও ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার চিত্রও তুলে ধরেছেন; কিন্তু উদ্দীপকে কেবল খিজিরের ফিরে আসার সঙ্গে তপুর কঙ্কাল হিসেবে ফিরে আসার সাদৃশ্য পাওয়া যায়।
মোস্তাফিজুর রহমান, শিক্ষক
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজ, ঢাকা