নির্বাচনী ডামাডোলে ‘মাউশি’ বিভাজন: শিক্ষা প্রশাসন সংস্কার, না অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি

মাউশি

দেশ এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। জাতীয় নির্বাচন সন্নিকটে। এ সময় রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে প্রয়োজন সর্বোচ্চ আস্থা, স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতা। বিশেষত প্রশাসনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন এ সময় স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন এক বাস্তবতায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বিভাজনের মতো একটি মৌলিক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কতটা সময়োপযোগী—সে প্রশ্ন আজ অনিবার্যভাবেই সামনে এসেছে।

সম্প্রতি (গত ১৮ জানুয়ারি ২০২৬) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় মাউশিকে ভেঙে মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য পৃথক ‘মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ এবং উচ্চমাধ্যমিক, স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের জন্য ‘উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর’ বা ‘উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অধিদপ্তর’ গঠনের প্রস্তাব সামনে এসেছে। এ খবরে শিক্ষা প্রশাসনে যে অসন্তোষ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে।

মাউশি কোনো সাধারণ দপ্তর নয়। এটি দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রশাসনিক মেরুদণ্ড। লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারী, হাজারো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং কোটি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। ফলে মাউশির বিভাজন মানে কেবল একটি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস নয়; এর সঙ্গে নীতিনির্ধারণ, জনবল ব্যবস্থাপনা, বাজেট–কাঠামো, প্রশাসনিক ক্ষমতার বণ্টন এবং মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে মৌলিক পরিবর্তন যুক্ত।

আরও পড়ুন

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিক্ষা প্রশাসনে বিভাজনের ধারাটি নতুন নয়। ১৮৫৪ সালের উডস ডেসপাচের ভিত্তিতে ব্রিটিশ আমলে মাউশির মাতৃপ্রতিষ্ঠান ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন (ডিপিআই) গঠনের মধ্য দিয়ে উপমহাদেশে সমন্বিত শিক্ষা প্রশাসনের সূচনা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৫৫ সালে বাংলায় প্রথম ডিপিআই কার্যালয় স্থাপিত হয়, যা প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরের শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব পালন করত। দীর্ঘ সময় ধরে প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরের দায়িত্ব পালন করলেও সময়ের প্রয়োজনে ধাপে ধাপে সেই কাঠামো ভাঙতে থাকে।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল মিলিয়ে প্রায় এক শতাব্দীর বেশি সময় ডিপিআই সমন্বিতভাবে শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনা করলেও তৎকালীন পাকিস্তান আমল থেকেই বিভাজনের প্রবণতা স্পষ্ট হতে থাকে। ১৯৬০ সালে ডিপিআইয়ের সমান্তরালে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, ১৯৭০-এর দশকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং সর্বশেষ ১৯৮১ সালে ডিপিআই বিলুপ্ত করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) প্রতিষ্ঠা—সবই সেই ধারাবাহিকতার অংশ। মাউশির আওতায় ন্যস্ত হয় মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, মাদ্রাসা, কলেজ ও উচ্চশিক্ষা। বিভাজনের এই ধারাবাহিকতা এখানেই থেমে থাকেনি। পরে ২০১৫ সালে মাদ্রাসা শিক্ষা পৃথক হয়ে যায়। মাউশি বিভাজনের বর্তমান প্রস্তাব সেই বিভাজনের প্রবণতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো সময়টি কি উপযুক্ত? নির্বাচনের প্রাক্কালে যেকোনো সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত চলমান প্রশাসনিক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখা এবং বড় নীতিগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন থেকে বিরত থাকা। মাউশির মতো একটি সংবেদনশীল ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের বিভাজন কোনো রুটিন সিদ্ধান্ত নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবসম্পন্ন একটি কাঠামোগত সংস্কার। এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক অংশীজন পরামর্শ, আইনি ও আর্থিক সক্ষমতা যাচাই ও সুস্পষ্ট রোডম্যাপ— যা নির্বাচনকালীন বাস্তবতায় যথাযথভাবে সম্পন্ন হওয়া কঠিন।

আরও পড়ুন

শিক্ষা প্রশাসন ইতিমধ্যে নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন, শিক্ষক–সংকট, ডিজিটাল রূপান্তর এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। এ সময়ে দপ্তর বিভাজনের উদ্যোগ প্রশাসনিক মনোযোগকে মূল সমস্যা থেকে সরিয়ে কাঠামোগত টানাপোড়েনে আবদ্ধ করার ঝুঁকি তৈরি করবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের ওপর।

এ ছাড়া নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় শিক্ষা প্রশাসনের ভূমিকা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রিসাইডিং অফিসার থেকে শুরু করে পোলিং অফিসার—নির্বাচনী জনবলের বড় একটি অংশই আসে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রশাসন থেকে। এমন পরিস্থিতিতে মাউশি বিভাজনকে কেন্দ্র করে যদি অসন্তোষ, অনিশ্চয়তা বা মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, তবে তা নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালনে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষা প্রশাসনের ভেতরে স্থিতিশীলতা ও আস্থা বজায় রাখা তাই শুধু শিক্ষা খাতের নয়, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্যও অপরিহার্য।
বিভাজনের আর্থিক ও প্রশাসনিক দায়ও কম নয়। নতুন দপ্তর মানেই কেন্দ্র থেকে মাঠপর্যায় পর্যন্ত সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো, অতিরিক্ত জনবল, অবকাঠামো ও পরিচালন ব্যয়। এ ব্যয় নির্বাহ রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে। বিশেষ করে নির্বাচন-পরবর্তী একটি নতুন সরকারের জন্য এটি একটি বড় আর্থিক ও প্রশাসনিক বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে, যা তার নিজস্ব নীতিগত অগ্রাধিকার ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সংকুচিত করতে পারে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো এই বিভাজনের প্রকৃত লক্ষ্য কী? এটি কি সত্যিই শিক্ষাব্যবস্থার দক্ষতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ, নাকি নবগঠিত দপ্তরগুলোর মাধ্যমে শিক্ষা সার্ভিসবহির্ভূত জনবলের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার একটি পথ সুগম করা হচ্ছে? অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, দপ্তর বিভাজনের পরও নিয়োগবিধির মাধ্যমে শিক্ষা ক্যাডারের ন্যায্য অংশগ্রহণ অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হয়েছে। ফলে নতুন করে একই আশঙ্কা তৈরি হওয়া অমূলক নয়। ইতিপূর্বে মাউশি ভেঙে ‘প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর’ ও ‘মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর’ হলেও ১৯৮০ সালের বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) কম্পোজিশন ও ক্যাডার রুলস অনুযায়ী এ দুটি অধিদপ্তর এখনো বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের অন্তভু৴ক্ত। অর্থাৎ অধিদপ্তর ভাগ হলেও ক্যাডার ভাগ হয়নি। এতদ্সত্ত্বেও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (কর্মচারী) নিয়োগবিধিমালা ২০২৩ ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা ২০২০-এর মাধ্যমে এ দুটি অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে শিক্ষা ক্যাডারের ন্যায্য অংশগ্রহণকে উপেক্ষা করা হয়েছে। সেখানে সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে শিক্ষা সার্ভিস–বহির্ভূত জনবল পদায়ন করে শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনার জন্য প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

শিক্ষা প্রশাসন একটি বিশেষায়িত ক্ষেত্র, যেখানে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, একাডেমিক বাস্তবতা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তব জ্ঞান অপরিহার্য। এই জায়গায় শিক্ষা সার্ভিসকে পাশ কাটিয়ে অন্য সার্ভিস বা ক্যাডারকে প্রাধান্য দেওয়া হলে কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতা আসার বদলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ আরও বিচ্ছিন্ন ও বাস্তবতা-বিচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মাউশি বিভাজনের মূল লক্ষ্য যদি হয় শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, তবে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বে শিক্ষা সার্ভিসের কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিশ্চিত করা ছাড়া সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। আর যদি বিভাজনের আড়ালে প্রশাসনিক কর্তৃত্বের ভারসাম্য অন্য দিকে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা থাকে, তবে সেটি শিক্ষাকাঠামো ব্যবস্থাপনায় গতিশীলতা নয়— বরং নতুন ধরনের জটিলতা ও অসন্তোষই সৃষ্টি করবে।

মাউশি বিভাজন ভবিষ্যৎ আলোচনাযোগ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে। প্রয়োজন হলে গবেষণা, পাইলট প্রকল্প ও জাতীয় সংলাপের মাধ্যমে তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে; কিন্তু নির্বাচন সন্নিকটে থাকা অবস্থায় এ ধরনের বড় ও দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ সময়োচিত নয়; বরং এটি শিক্ষা প্রশাসনে অপ্রয়োজনীয় অস্থিরতা সৃষ্টি করার ঝুঁকি বহন করে। তাই মাউশি বিভাজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকাই হবে সবচেয়ে যুক্তিসংগত ও দায়িত্বশীল পথ।

লেখক পরিচিতি: সাব্রী সাবেরীন ও সৌরভ জাকারিয়া, শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তা ও সদস্য, The Edvisers: A Think Tank for Bangladesh Civil Education Service.