অধ্যাপনা ছেড়ে সহকারী কমিশনারে যোগদান: শিক্ষকতার গালে চপেটাঘাত নয়, নিগূঢ় বাস্তবতা
বাংলাদেশে প্রতিবার বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর এক চেনা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক টানাপোড়েন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। জনপরিসরে ভেসে আসে কিছু নিয়তিবাদী অভিঘাতের চিত্র, বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কোনো সদস্য বা বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষক মাঠ প্রশাসনের চিত্তাকর্ষক চৌহদ্দিতে পা বাড়াচ্ছেন শিক্ষকতার আঙিনা ছেড়ে, কেউ যুক্ত হচ্ছেন পুলিশ কিংবা শুল্ক বিভাগে। অন্যদিকে দশম গ্রেডের কোনো চাকুরে নবম গ্রেডের শিক্ষকতার মোহময় আহ্বান উপেক্ষা করে পূর্বপদে আসীন থাকছেন কিংবা অন্য পেশায় নিয়তি খুঁজছেন। এসব ঘটনাপ্রবাহের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বভাবসুলভ ভাবাবেগের এক ঝড় ওঠে। নীতিবাগীশ উচ্চারণ শোনা যায়, ‘শিক্ষকতা তো পরম মহান ব্রত, তবে কেন এই দলছুট হওয়ার প্রবণতা?’
সাম্প্রতিক সময়ে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ অধ্যাপক হতে শুল্ক ও আবগারি ক্যাডারে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগদানের ঘটনা এই চিরায়ত বিতর্ককে বিস্ময়ের সঙ্গে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
সমালোচনা কিংবা বিস্ময় প্রকাশ সামাজিক অধিকারের পর্যায়ভুক্ত হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি কখনো এই আপাত-পলায়নবৃত্তির মূল উৎস সন্ধানে গভীরে অবগাহন করার প্রয়াস পেয়েছি? তলিয়ে দেখেছি কি, কেন একজন শিক্ষক বহু বছরের তিল তিল করে গড়ে তোলা বিদ্যায়তনিক পরিমণ্ডল, শ্রেণিকক্ষ, প্রিয় শিক্ষার্থী এবং অর্জিত বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় বিসর্জন দিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রশাসনিক কাঠামোর তলবদার হতে কুণ্ঠিত হচ্ছেন না? এটি কি স্রেফ ব্যক্তিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার মোহ, নাকি রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত অবহেলা ও দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যের এক দীর্ঘায়িত কৃষ্ণছায়া?
বাস্তবতা হলো, শিক্ষকতা কোনো যান্ত্রিক জীবিকামাত্র নয়; অনেকের কাছে এটি আত্মিক তাড়না, এক গভীর দায়বদ্ধতা এবং জীবনদর্শন। একজন শিক্ষক যখন জ্ঞানের ব্যাসপীঠে অধিষ্ঠিত হন, তিনি কেবল পাঠ্যসূচির পুনরুৎপাদন করেন না; তিনি একটি জাতির ভবিষ্যৎ প্রজ্ঞা নির্মাণ করেন। কিন্তু সেই জাতিনির্মাতাকেই যদি বছরের পর বছর প্রাতিষ্ঠানিক অবমূল্যায়ন, পদোন্নতির দীর্ঘসূত্রতা, বৈষম্য এবং প্রশাসনিক সংকোচনের সংকীর্ণ গোলকধাঁধায় শ্বাসরুদ্ধকর জীবন অতিবাহিত করতে হয়, তবে তাঁর পেশাগত সত্তায় তীব্র নৈরাশ্য ও অস্তিত্বের সংকট গ্রাস করা একেবারেই স্বাভাবিক এবং মনস্তাত্ত্বিকভাবে অনিবার্য।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৮০ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সরকার বিসিএস সাধারণ শিক্ষাসহ ১৪টি ক্যাডারকে সমন্বিত করে একটি একীভূত সিভিল সার্ভিস কাঠামোর পত্তন করেছিল। বিসিএস (জেনারেল এডুকেশন) কম্পোজিশন অ্যান্ড ক্যাডার রুলস, ১৯৮০ অনুযায়ী, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্ট যাবতীয় প্রশাসনিক নীতিনির্ধারণী পদকে শিক্ষা ক্যাডারের আওতাভুক্ত করা হয়। বিশেষত, ওই বিধিমালার ধারা ৬(১)(খ)-এ দ্ব্যর্থহীনভাবে বিধৃত ছিল যে স্কুল ও কলেজ শাখা ষষ্ঠ গ্রেড পর্যন্ত পৃথক অস্তিত্ব রক্ষা করলেও পরবর্তী উচ্চতর সোপানে তা একীভূত হয়ে অভিন্ন ক্যাডারে রূপান্তরিত হবে। এর অন্তর্নিহিত দর্শনটি ছিল অত্যন্ত দূরদর্শী—শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনায় এমন কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত করা, যাঁদের রয়েছে প্রত্যক্ষ বিদ্যায়তনিক ও ফলিত অভিজ্ঞতা।
বড় কাঠামোগত অসংগতি হলো, শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ ‘অধ্যাপক’-কে জাতীয় বেতন স্কেলের চতুর্থ গ্রেডে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ সমান্তরালভাবে অনেক নন-ক্যাডার কর্মকর্তাও কর্মজীবনের স্বাভাবিক নিয়মে তৃতীয় গ্রেডে আরোহণের সুযোগ পাচ্ছেন।
এ সিদ্ধান্তের পেছনে যুক্তি ছিল অকাট্য—যিনি নিজে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের বাস্তব অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, শিক্ষার্থীর মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বোঝেন এবং শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক সীমাবদ্ধতা ও অমিত সম্ভাবনা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন, তিনিই তো শিক্ষা প্রশাসনে সবচেয়ে গতিশীল ও দূরদর্শী ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। এই মননশীল চেতনা থেকেই শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরগুলোকে শিক্ষা ক্যাডারের তফসিলভুক্ত (শিডিউলভুক্ত) করা হয়েছিল। এমনকি পরবর্তীকালে ‘বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস নিয়োগ বিধিমালা, ১৯৮১’-তেও কলেজ শিক্ষকতার এই একাডেমিক ধারা থেকে প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পদে গমনের অবাধ সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখা হয়।
কিন্তু কালক্রমে এই উদাত্ত দর্শনের সমান্তরালে শুরু হয় এক বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস। ধীরে ধীরে শিক্ষা ক্যাডারের প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক পরিধিকে সুকৌশলে সংকুচিত করা হতে থাকে। কারিগরি শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা, ব্যানবেইস, এনটিআরসিএ এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মতো শিক্ষাসংশ্লিষ্ট প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে শিক্ষা ক্যাডারকে নতুন নতুন নিয়মের মারপ্যাঁচে ফেলে প্রান্তিক ও অপাঙ্ক্তেয় করে তোলা হয়েছে। এমনকি আঞ্চলিক শিক্ষা দপ্তর বা বিভাগীয় শহরের কলেজগুলোর প্রশাসনিক পদায়ন বা বদলি নিয়ন্ত্রণের ন্যূনতম ক্ষমতাটুকুও ‘দুর্নীতি’র একদেশদর্শী অজুহাতে মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীভূত চক্রে কুক্ষিগত করা হয়েছে।
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করা জরুরি—অন্য কোনো ক্ষমতাশালী ক্যাডারের বিরুদ্ধে যখন আর্থিক বা প্রশাসনিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তখন কি রাষ্ট্র সেই ক্যাডারের অন্তর্নিহিত প্রশাসনিক এখতিয়ার বা ডোমেইন কেড়ে নেয়? নিশ্চয়ই নেয় না। তবে শিক্ষাব্রতীদের ক্ষেত্রেই কেন এই নিগ্রহমূলক ব্যতিক্রমী নীতি?
বর্তমানে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) বিভাজন এবং পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) পৃথক্করণের যে প্রশাসনিক তোড়জোড় চলছে, তা বাস্তবায়িত হলে শিক্ষা ক্যাডারের প্রশাসনিক মেরুদণ্ড চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়বে। শিক্ষাবিদদের অনেকেই গভীর আশঙ্কা ব্যক্ত করছেন যে অদূর ভবিষ্যতে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কার্যত একটি প্রান্তিক ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক কলেজ ক্যাডারে’ সংকুচিত ও পর্যবসিত হবে।
যদি রাষ্ট্র তাঁদের কেবলই তত্ত্বীয় শিক্ষক হিসেবে সংকীর্ণ ফ্রেমে বন্দী রাখতে চায়, তবে প্রশ্ন জাগে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সহ-উপাচার্য কিংবা কোষাধ্যক্ষের মতো উচ্চতর প্রশাসনিক পদগুলোয় কেন শিক্ষা ক্যাডারের জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের পদায়নে রাষ্ট্র কুণ্ঠাবোধ করে? কেন তাঁদের জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মতো একটি স্বাভাবিক, স্বয়ংক্রিয় এবং সময়ভিত্তিক পদোন্নতির অনমনীয় কাঠামো গড়ে তোলা হয় না? কেন একজন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাকে সহকারী অধ্যাপক পদের ন্যূনতম স্বীকৃতি পেতেই যৌবনের সোনালি সময় বিসর্জন দিয়ে বছরের পর বছর চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকতে হয়? কেন সহযোগী অধ্যাপক কিংবা অধ্যাপক পদে পদোন্নতির বিষয়টি সব সময় এক অনিশ্চয়তার গোলকধাঁধায় বন্দী থাকবে?
তার চেয়েও বড় কাঠামোগত অসংগতি হলো, শিক্ষা ক্যাডারের সর্বোচ্চ পদ ‘অধ্যাপক’-কে জাতীয় বেতন স্কেলের চতুর্থ গ্রেডে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। অথচ সমান্তরালভাবে অনেক নন-ক্যাডার কর্মকর্তাও কর্মজীবনের স্বাভাবিক নিয়মে তৃতীয় গ্রেডে আরোহণের সুযোগ পাচ্ছেন। শিক্ষা ক্যাডারের অধ্যাপকদের জন্য প্রথম গ্রেডের আকাশছোঁয়া তো দূরের কথা, মোট কর্মকর্তার ন্যূনতম ২৫ শতাংশের জন্যও সেই উচ্চতর গ্রেডের তোরণ উন্মোচন করা হয়নি। নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক যাতায়াত বা ব্যক্তিগত গাড়ির সুবিধা, নেই সময়োপযোগী পদোন্নতির নিশ্চয়তা; আর শিক্ষা প্রশাসনের প্রতিটি শাখায় সক্রিয় উপস্থিতি কিংবা শিখরে আরোহণ তো সেখানে এক অলীক কল্পনা। অথচ একই সময়ে, একই প্রক্রিয়ায় সিভিল সার্ভিসে যোগদানকারী অন্যান্য ক্যাডারের সহকর্মীরা বহু আগেই ক্ষমতার অলিন্দে এবং উচ্চতর গ্রেডে আসীন হয়েছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা আধুনিক জনপ্রশাসনের একটি অমোঘ সত্য হলো, মেধাবী মানবসম্পদ স্বভাবগতভাবেই সেই পেশার প্রতি আকৃষ্ট হয়, যেখানে সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক প্রণোদনা ও পেশাগত উল্লম্ফনের দিগন্ত উন্মুক্ত।
বক্ষ্যমাণ বাস্তবতা আজ এতটাই রূঢ় ও বৈসাদৃশ্যপূর্ণ যে ৩৭তম বা ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে অন্য ক্যাডারে যোগদানকারী অনেক কর্মকর্তা ইতিমধ্যে ষষ্ঠ গ্রেডের স্বাদ গ্রহণ করেছেন। এমনকি ব্যাংকিং খাতের সমসাময়িক কর্মকর্তাদের পদোন্নতির ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফও পঞ্চম গ্রেড স্পর্শ করেছে। বিপরীতে শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬তম বিসিএসের কর্মকর্তারা এখনো পদোন্নতির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত, আর ৩৮তম বিসিএসের সদস্যদের পদোন্নতি তো সুদূরপরাহত।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা আধুনিক জনপ্রশাসনের একটি অমোঘ সত্য হলো, মেধাবী মানবসম্পদ স্বভাবগতভাবেই সেই পেশার প্রতি আকৃষ্ট হয়, যেখানে সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক প্রণোদনা এবং পেশাগত উল্লম্ফনের দিগন্ত উন্মুক্ত। একজন প্রখর মেধাবী তরুণ কেন এক স্থবির, নিশ্চল ও সম্ভাবনাহীন কাঠামোর ভেতর নিজের সম্ভাবনাকে অপচয় করবেন? একজন শিক্ষক যখন দেখেন তাঁরই সমকক্ষ সহপাঠী অন্য ক্যাডারে যোগ দিয়ে দ্রুততম সময়ে পদোন্নতি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও বিপুল বৈষয়িক সুবিধা ভোগ করছেন, আর তিনি নিজে বছরের পর বছর একই তিমিরে স্থবির হয়ে আছেন, তখন তাঁর অবচেতন মনে বিকল্প মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হওয়া কোনো অপরাধ নয়; বরং তা মানবীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের স্বাভাবিক প্রতিফলন।
অতএব কোনো তিলকধারী অধ্যাপক বিদ্যায়তনের চৌকাঠ ডিঙিয়ে সহকারী কমিশনার হিসেবে যোগ দিলে সেটিকে ‘শিক্ষকতা নামক মহান পেশার গালে চপেটাঘাত’ বলে যে সরল আবেগনির্ভর ও নীতিবাদী ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়, তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। এর আগে প্রয়োজন পেশাগত গতিশীলতার সীমাবদ্ধতা এবং বিদ্যমান প্রশাসনিক বাস্তবতার গভীর পর্যালোচনা। রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের নিজেদেরই প্রশ্ন করা উচিত, কেন একজন শিক্ষক তাঁর পরম ভালোবাসার শ্রেণিকক্ষ, ব্ল্যাকবোর্ড আর ডাস্টার ফেলে প্রশাসনের শীতল করিডরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
কারণ, কোনো শিক্ষকই আনন্দের আতিশয্যে বা স্বেচ্ছায় শ্রেণিকক্ষ বর্জন করেন না। তিনি যান এক চরম মনস্তাত্ত্বিক অবদমন, দীর্ঘ বঞ্চনা এবং সম্ভাবনাহীনতার দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি ও অস্তিত্বের হাহাকার থেকে মুক্তি পেতে।
শিক্ষাব্যবস্থার মূল চালিকা শক্তি হলেন শিক্ষক। তাঁরা যদি সামাজিকভাবে সম্মানিত ও আর্থিকভাবে সুরক্ষিত না হন, তবে ‘মানসম্মত শিক্ষা’র স্লোগানটি কেবলই এক ফাঁকা আওয়াজে পরিণত হবে। রাষ্ট্রের টেকসই উন্নয়ন, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি ও একটি প্রাজ্ঞ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণ কোনো করুণা বা দাক্ষিণ্য নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের আত্মোৎকর্ষের দীর্ঘমেয়াদি ও সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।
পরিসংখ্যানের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, ২০২০ সালে যোগদানকারী অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে পদোন্নতির সোপান অতিক্রম করেছেন; অথচ ২০১৮ সালে সিভিল সার্ভিসে যোগদানকারী শিক্ষকেরা আজ অবধি পদোন্নতিবঞ্চিত। এমনিতেই শিক্ষকেরা ব্যাংকারদের মতো লাঞ্চ ভাতা, স্বল্প সুদে গৃহঋণ, গাড়ি কিংবা মোটরবাইকের সুবিধা, ল্যাপটপ ক্রয়ের প্রণোদনা পান না। অথচ একই দেশে, একই বাজার অর্থনীতির রূঢ় বাস্তবতায় এবং একই মুদ্রাস্ফীতির চাপের মধ্যে তাঁদের যাপিত জীবনের মৌলিক চাহিদাগুলো মেটাতে হয়।
উপরন্তু মুদ্রাস্ফীতি তাঁদের ক্রয়ক্ষমতাকে সংকুচিত করেছে, যা সামাজিকভাবে হীনম্মন্যতার ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
এমন পরিস্থিতিতে যদি সময়মতো প্রাপ্য পদোন্নতির স্বীকৃতিটুকুও না মেলে, তবে রাষ্ট্র ও সমাজ শিক্ষকতাকে পরোক্ষভাবে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির জীবিকা’ হিসেবে বিবেচনা করছে—এমন ধারণা কি অযৌক্তিক?
একবিংশ শতাব্দীতে এসেও এক অদ্ভুত নিয়মে শিক্ষকদের, বিশেষ করে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের, আর্থিক সংশ্লেষবিহীন পদোন্নতি দেওয়া হয়। অর্থাৎ পদোন্নতি হয় ঠিকই, কিন্তু বেতন বৃদ্ধি হয় না।
শিক্ষকদের পদোন্নতির প্রশ্নটি উত্থাপিত হলেই তা ‘আর্থিক সংশ্লেষ’-এর এক জটিল ও কৃপণ অঙ্কে আটকে দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগার সেই সামান্য ব্যয়ভার বহন করতে পারবে কি না, এই সংকীর্ণ হিসাবই তখন মুখ্য হয়ে ওঠে। অথচ বিগত বছরগুলোর ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শিক্ষকদের পদোন্নতি কখনোই নিয়মিত ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয়নি। কেবল দীর্ঘ বিলম্বই নয়, বহু ক্ষেত্রে পদোন্নতির প্রজ্ঞাপন জারি হলেও যোগ্যতা অর্জনের তারিখ থেকে আর্থিক সুবিধাসহ ‘ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি’ না দিয়ে শুধু পদবি পরিবর্তনের কাগুজে স্বীকৃতির মধ্যেই তা সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। আজকাল আর্থিক সংশ্লেষবিহীন পদোন্নতিই যেন শিক্ষকদের ললাটলিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেশাগত আত্মমর্যাদা কিংবা বাস্তব প্রণোদনার প্রতিফলন সেখানে প্রায় অনুপস্থিত। পদোন্নতি সত্ত্বেও বেতন বৃদ্ধি হয় না, তথাপি ‘সান্ত্বনাসূচক’ পদোন্নতি নামক কাগুজে স্বীকৃতি দিতেও অনীহা ও দীর্ঘসূত্রতা লক্ষণীয়। বাস্তবে শূন্য পদের কৃত্রিম সীমাবদ্ধতার অজুহাতে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতির চাকা বহু বছর ধরে স্তব্ধ করে রাখা হয়েছে। পক্ষান্তরে একই ব্যাচের প্রশাসন, পুলিশ, কৃষি কিংবা কর ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়মিত ও স্বয়ংক্রিয় পদোন্নতির মাধ্যমে দায়িত্ব ও মর্যাদার উচ্চতর স্তরে পৌঁছে যাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের উৎসব ভাতা মূল বেতনের ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা কিংবা এটা আরও বাড়িয়ে ৬০ শতাংশে উন্নীত করার বর্তমান যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক। কিন্তু বিপরীত বাস্তবতায় দেখা যায়, সরকারি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি ও শিক্ষাবিষয়ক নীতিনির্ধারণী আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার প্রশ্নে এক চরম স্থবিরতার মধ্যে অবস্থান করছেন। ২০০৯ সালের জাতীয় বেতনকাঠামোয় সরকারি কলেজের অধ্যাপকদের জন্য তৃতীয় গ্রেডে উন্নীত হওয়ার একটি যৌক্তিক ও সুনির্দিষ্ট পথ উন্মুক্ত ছিল; কিন্তু ২০১৫ সালের বেতনকাঠামো সেই পথকেও কার্যত রুদ্ধ করে দেয়। এর ফলে দীর্ঘকাল রাষ্ট্রকে সেবা দেওয়ার পরও বহু শিক্ষক উচ্চতর স্কেল বা গ্রেডের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
একই গ্রেডের অন্যান্য পেশাজীবীদের সঙ্গে শিক্ষকদের এই গভীর ও দৃশ্যমান বৈষম্য দূর করে সবাইকে অভিন্ন মর্যাদা, সমতা ও যৌক্তিক প্রণোদনার আওতায় আনা এখন আর কোনো সুদূরপরাহত দাবি নয়; বরং সময়ের এক অনিবার্য দাবি।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই শ্রেষ্ঠ মেধাবী সন্তানদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে চায় কিংবা ধরে রাখতে চায়, তবে নীতিনির্ধারণী মঞ্চে দাঁড়িয়ে কেবল মুখে ‘শিক্ষক হলেন জাতি গঠনের কারিগর’—এই আপ্তবাক্য উচ্চারণ করলেই চলবে না। বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের বিদ্যমান কাঠামোগত ও পদ্ধতিগত বৈষম্যের অবসান ঘটাতে হবে; নিশ্চিত করতে হবে সময়োপযোগী ও জটমুক্ত পদোন্নতি; ফিরিয়ে দিতে হবে তাঁদের হৃত প্রশাসনিক ও সামাজিক মর্যাদা এবং শিক্ষকতাকে বাস্তব অর্থে একটি আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ পেশা হিসেবে পুনর্নির্মাণ করতে হবে।
তা না হলে আগামী দিনে আরও অনেক প্রাজ্ঞ অধ্যাপক তাঁদের প্রিয় শ্রেণিকক্ষ, গবেষণাগার ও বইয়ের মলাট ছেড়ে মহাকরণের বা মাঠ প্রশাসনের শীতল করিডরে নিজেদের বিলীন করে দেবেন। আর সেদিন কোনো এক ক্যাডারের সাময়িক জয় দৃশ্যমান হলেও চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে গোটা জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক ও মননশীল ভবিষ্যৎ।
*লেখক: সচিব তালুকদার, মনিরুজ্জামান ও অরিয়ন তালুকদার, শিক্ষক ও সহপ্রতিষ্ঠাতা (দ্য ইডভাইজরস, থিঙ্কট্যাংক অব সিভিল এডুকেশন ক্যাডার)।