উচ্চশিক্ষায় পরীক্ষার মূল্যায়নপদ্ধতি: কিছু ভাবনা
বাংলাদেশে আমার বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের প্রথম বর্ষের দিকে ফিরে তাকালে কয়েকটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় মানসপটে ভেসে ওঠে। গ্রামের স্কুল-কলেজে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। নতুন শ্রেণিকক্ষ, নতুন পাঠক্রম, নতুন পরিবেশ, নতুন মূল্যায়নপদ্ধতি, সঙ্গে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা। তার ওপর বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসে সমাজবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পরীক্ষার খাতায় কীভাবে উত্তর লিখলে ভালো নম্বর পাওয়া যাবে, মূল্যায়নের ধরন কেমন, এসব বিষয়ে আমার ধারণা ছিল সীমিত।
এই নতুন পদ্ধতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমার সময় লেগেছিল এবং প্রথম বর্ষে আমার ফলাফল প্রত্যাশামতো ভালো হয়নি। তবে দ্বিতীয় বর্ষে উঠে আমি পড়ালেখার সঙ্গে কিছুটা মানিয়ে নিতে শুরু করি। তখন ফলাফলও ধীরে ধীরে ভালো হতে থাকে এবং আমি প্রথম সারির কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে চলে আসি। এই লেখার মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এই ভূমিকাটুকু দিলাম, যাতে লেখাটির মূল সুর ধরতে সুবিধা হয়।
গত সেমিস্টারে আমি ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছি। এই এক সেমিস্টারের অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। মনে হয়েছে, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এমন ধরনের শিক্ষাগত সহায়তা পেলে আমার শেখার অভিজ্ঞতা হয়তো আরও সমৃদ্ধ হতে পারত এবং ফলাফলও আরও ভালো হতে পারত।
আমার অধীনে ৪৩ জন শিক্ষার্থী ছিল। টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে আমার কাজ ছিল নির্ধারিত কোর্সে এই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত দিকনির্দেশনা দেওয়া। এখানে একজন শিক্ষক দুই ঘণ্টার মূল ক্লাস নেন। ওই ক্লাসের বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে পরের সপ্তাহের টিউটোরিয়াল ক্লাসের জন্য কিছু নির্ধারিত পাঠ্যসামগ্রী দেওয়া হয় এবং সেখান থেকে কয়েকটি প্রশ্ন আলোচনার জন্য নির্ধারণ করা হয়। শিক্ষার্থীরা সেই নির্ধারিত পাঠ্যসামগ্রী পড়ে এবং প্রশ্নগুলোর সম্ভাব্য উত্তর প্রস্তুত করে টিউটোরিয়াল ক্লাসে আসে।
একজন টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে আমার কাজ ছিল শিক্ষার্থীদের কয়েকটি দলে ভাগ করে তাদের মধ্যে দলীয় আলোচনা পরিচালনা করা। দলীয় আলোচনা শেষে প্রতিটি দলের সদস্যরা নির্ধারিত প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর নিয়ে আলোচনা করত। অন্য দলের শিক্ষার্থীরা তা মনোযোগ দিয়ে শুনত এবং প্রয়োজন হলে প্রশ্ন করার সুযোগ পেত। ফলে প্রাণবন্ত দলীয় আলোচনার মাধ্যমে সবাই নির্ধারিত পাঠ্যসামগ্রী ও প্রশ্ন সম্পর্কে তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার ধারণা অর্জন করত। এর পাশাপাশি একটি সপ্তাহ বিতর্কের জন্য নির্ধারিত ছিল, যেখানে নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাণবন্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
টিউটোরিয়াল ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত দিকনির্দেশনা দেওয়াও ছিল আমার অন্যতম দায়িত্ব। তাদের পড়াশোনার বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া, অ্যাসাইনমেন্ট কীভাবে লিখতে হবে, সে বিষয়ে ধারণা দেওয়া, অ্যাসাইনমেন্ট লেখার সময় কোনো সমস্যায় পড়লে তা সমাধানে সহায়তা করা এবং তারা কোনো ভাবনা বা ধারণা শেয়ার করতে চাইলে তা মনোযোগ দিয়ে শুনে মতামত দেওয়া ছিল এই দায়িত্বের অংশ।
প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে অনেকেরই নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগে। তাই কেউ যদি মানসিক চাপে থাকে, তাকে সরাসরি একক আলোচনার মাধ্যমে সময় দেওয়া এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কোর্স শিক্ষক বা মানসিক স্বাস্থ্যসহায়তা বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ কাজের অংশ। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রথম বর্ষেই একটি নতুন পরিবেশে এসে অনুভব করতে শেখে যে তারা একা নয়; বিশ্ববিদ্যালয় তাদের শেখা, বেড়ে ওঠা এবং স্বপ্নপূরণের যাত্রায় সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
এটি একটি দিক। তবে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করেছে, সেটি হলো মূল্যায়নপদ্ধতি। এখানে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থীদের জন্য দুই ধরনের মূল্যায়নপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। একটি হলো ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্ট, আরেকটি হলো সামেটিভ অ্যাসেসমেন্ট।
মূলত প্রথম বর্ষের ব্লগ, রচনা এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্ট অনুসরণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে ব্লগ, রচনা এবং পরীক্ষার খাতা একজন টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট মূল্যায়ন করেন এবং কোর্স শিক্ষক মূল্যায়নপ্রক্রিয়াটি তত্ত্বাবধান করেন। টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট মূল্যায়নের সময় নম্বর প্রদান করেন এবং নির্ধারিত মূল্যায়ন নির্দেশিকা বা রুব্রিক অনুসরণ করে প্রায় ২৫০ শব্দের একটি লিখিত মতামত দেন। অর্থাৎ, সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ব্লগ, রচনা এবং পরীক্ষার উত্তর লেখার ক্ষেত্রে কোন জায়গায় ভালো করেছে এবং ভবিষ্যতে ভালো গ্রেড পেতে হলে কোনো জায়গায় উন্নতি করতে হবে, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে তাকে কেন নির্ধারিত গ্রেড দেওয়া হলো, সেটিও ব্যাখ্যা করা হয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী খুব সহজেই নিজের শক্তির জায়গা এবং উন্নতির জায়গাগুলো বুঝতে পারে।
ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্টের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, প্রথম বর্ষের গ্রেড চূড়ান্ত ফলাফলে যোগ হয় না; শুধু উল্লেখ থাকে। অর্থাৎ, চূড়ান্ত গ্রেডিংয়ের সময় প্রথম বর্ষের নম্বর যোগ করা হয় না। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে সামেটিভ অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তখন মূল খাতা সংশ্লিষ্ট কোর্স শিক্ষক মূল্যায়ন করেন এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে চূড়ান্ত ফলাফল নির্ধারণ করা হয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষে তুলনামূলকভাবে চাপমুক্ত পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারে এবং রচনা ও পরীক্ষার খাতা লেখার পদ্ধতি ধীরে ধীরে ভালোভাবে রপ্ত করে নিতে পারে।
একজন টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে আমি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি যে এক সেমিস্টারেই ফরমেটিভ অ্যাসেসমেন্ট পদ্ধতি এবং নিয়মিত লিখিত মতামত অনুসরণের কারণে শিক্ষার্থীদের লেখার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। এক সেমিস্টারে ব্লগ ও রচনা লেখার অভিজ্ঞতার পর পরীক্ষার খাতায় প্রায় প্রত্যেকেই নিজেদের পরবর্তী ধাপের গ্রেডে উন্নীত করতে পেরেছে। অনেকেই দুই ধাপ পর্যন্ত গ্রেড উন্নয়ন করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের এই উন্নতি দেখে একজন টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে আমার ভেতরে গভীর ভালো লাগা কাজ করেছে।
তবে একই সঙ্গে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে মনে একধরনের বেদনাবোধও তৈরি হয়েছে। আমাদের দেশে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাগত পটভূমি থেকে একজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। প্রথম বর্ষে এসেই নতুন পরিবেশ, নতুন পাঠক্রম, নতুন ভাষা, নতুন মূল্যায়নপদ্ধতি—সবকিছুর সঙ্গে সবাই সমানভাবে মানিয়ে নিতে পারে না। অনেকেরই এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সময় লাগে। ফলে কেউ কেউ শুরুতেই মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ে, আত্মবিশ্বাস হারাতে শুরু করে।
ঠিক এই সময় যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ তাকে আশ্বস্ত করতে পারে যে ‘তুমি পরীক্ষার খাতায় ভুল করেছ, এটি কোনো সমস্যা নয়। আমরা তোমার পাশে আছি। তোমার এখানে চমৎকার সম্ভাবনা আছে; এই জায়গায় একটু উন্নতি করতে পারলে পরবর্তী পরীক্ষায় তুমি কাঙ্ক্ষিত ফল পাবে। তুমি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী, তাই ভুল করা তোমার শেখারই অংশ। আমরা তোমাকে সেই ভুল থেকে শেখার পরিবেশ দিতে চাই’, তাহলে শিক্ষার্থীর শেখার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি ইতিবাচক হতে পারে।
মূল্যায়নপদ্ধতিতে সামান্য কাঠামোগত পরিবর্তন এবং শিক্ষার পরিবেশে আরও কিছুটা ইতিবাচকতা যোগ করতে পারলে বহু শিক্ষার্থীর জীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। বাস্তবে দেখা যায়, প্রথম বর্ষে প্রত্যাশিত ফলাফল করতে না পারলে অনেক শিক্ষার্থী মানসিকভাবে পিছিয়ে পড়ে, আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরে। মেধা, চেষ্টা ও অফুরান সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ কম গ্রেড বা কম জিপিএ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করে। অথচ প্রথম বছরে ভুল করার স্বাধীনতা, গঠনমূলক মতামত এবং ভুল থেকে শোধরানোর পথনির্দেশ পেলে তাদের গল্পটা অন্য রকম হতে পারত।
উচ্চশিক্ষায় মূল্যায়ন মানে শুধু নম্বর দেওয়া নয়। এটি শিক্ষার্থীর শিখনপ্রক্রিয়াকে ইতিবাচক করা, তাকে আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা, তার সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটানো এবং ভবিষ্যতের পথ দেখিয়ে দেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
*লেখক: সুব্রত কুমার মল্লিক, পিএইচডি শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার, যুক্তরাজ্য এবং সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার