শিক্ষায় বৈষম্য: বাংলাদেশের উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায়

প্রথম আলো ফাইল ছবি

একটি জাতির মানবসম্পদ গঠনে শিক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি হলো শিক্ষা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেসব দেশ সময়মতো সর্বজনীন ও মানসম্মত শিক্ষায় বিনিয়োগ করেছে, তারা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু যখন শিক্ষার সুযোগ ও মানে বৈষম্য সৃষ্টি হয়, তখন শিক্ষা উন্নয়নের হাতিয়ার না হয়ে উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে শিক্ষায় বৈষম্য আজও একটি গভীর ও বহুমাত্রিক সমস্যা।

শিক্ষায় বৈষম্য বলতে বোঝায় সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্য সমানভাবে শিক্ষার সুযোগ, অংশগ্রহণ এবং সুফল নিশ্চিত না হওয়া। এই বৈষম্য আয়ভিত্তিক, লিঙ্গভিত্তিক, অঞ্চলভিত্তিক কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে সৃষ্টি হতে পারে। ধনী পরিবারের সন্তানেরা সাধারণত উন্নত অবকাঠামোসম্পন্ন বিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগের পাশাপাশি কোচিং ও প্রাইভেট টিউটরের সহায়তা নেয় এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা গ্রহণ করে। অন্যদিকে, দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা গাদাগাদি করা শ্রেণিকক্ষ, অপর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী এবং প্রশিক্ষণহীন শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষাজীবন শুরু করে। জীবনের এই অসম শুরু তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সীমিত করে দেয়।

আরও পড়ুন

ড. মুইনুল ইসলাম তাঁর ‘The Poverty Discourse and Participatory Action Research in Bangladesh’ শীর্ষক গ্রন্থে উল্লেখ করেন বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরে ১২ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিদ্যমান। এগুলো হলো (১) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, (২) পরীক্ষামূলক প্রাথমিক বিদ্যালয়, (৩) প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই)–সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়, (৪) নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, (৫) অনিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, (৬) কমিউনিটি স্কুল, (৭) স্যাটেলাইট স্কুল, (৮) মাধ্যমিক বিদ্যালয়–সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়, (৯) এনজিও পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়, (১০) কিন্ডারগার্টেন, (১১) ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং (১২) মাধ্যমিক মাদ্রাসা–সংযুক্ত ইবতেদায়ি মাদ্রাসা।

এর অর্থ হলো, শিশুরা শিক্ষাজীবনের একেবারে প্রাথমিক স্তরেই বৈষম্যের সম্মুখীন হচ্ছে। প্রাথমিক স্তরের এ ধরনের বৈষম্য শিশুদের মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতায় পার্থক্য সৃষ্টি করে, যা তাদের সামগ্রিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।

শিক্ষায় বৈষম্যের একটি প্রকট দিক হলো গ্রাম-শহরের ব্যবধান। শহরাঞ্চলে তুলনামূলকভাবে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দক্ষ শিক্ষক, ডিজিটাল সুবিধা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো বহু বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, অবকাঠামো দুর্বল এবং প্রযুক্তিগত সুবিধা সীমিত। ফলে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা শেষ করার আগেই ঝরে পড়ে। এই বাস্তবতা গ্রামীণ দারিদ্র্যকে স্থায়ী করে এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের ভারসাম্য নষ্ট করে।

আমাদের উচ্চশিক্ষা নিয়ে জাতীয়ভাবে কোনো পরিকল্পনা নেই
ফাইল ছবি
আরও পড়ুন

Bangladesh Education Fact Sheets ২০২০ অনুযায়ী, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ না করে স্কুল থেকে বেরিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৮০ শতাংশই গ্রামীণ অঞ্চলের, এবং তারা শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারছে না জাতীয় গড়ের তুলনায় বেশি হারে। একই সঙ্গে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৩৪ শতাংশই গ্রামীণ অঞ্চলের, যেখানে শহর, মেট্রোপলিটন ও অর্ধশহরের শিক্ষার্থী ৬৬ শতাংশ। এগুলো স্পষ্ট নির্দেশ করে যে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় পৌঁছাতে সংকটের মুখোমুখি হচ্ছে। দেশে প্রশিক্ষিত ও মানসম্মত শিক্ষকের সংখ্যা ও অপর্যাপ্ত। জাতীয়ভাবে প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার মাত্র ৭৪ শতাংশ, যা অন্যান্য দক্ষিণ এশীয় দেশের তুলনায় কম এবং গ্রামীণ ক্ষেত্রে এই সমস্যা আরও জটিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ২০২৩–এর তথ্যমতে, প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যায় গ্রামীণ শিক্ষার হার প্রায় ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ, যেখানে শহুরে শিক্ষার হার ৮৩ দশমিক ৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানগুলো পরিষ্কারভাবে দেখায় যে—গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় কম সুযোগ পাচ্ছে এবং শহরের তুলনায় গুণমানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর ফলে, গ্রামীণ দারিদ্র্য ও সামাজিক-অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও জোরদার হচ্ছে এবং জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জনে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যও শিক্ষায় একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রাথমিক শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়লেও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় অনেক সমাজে এখনো পিছিয়ে পড়ছে তারা। বাল্যবিবাহ, পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং নিরাপত্তাহীনতা মেয়েদের শিক্ষাজীবন বাধাগ্রস্ত করে। যখন সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী সমান শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তখন একটি দেশের মানবসম্পদের বড় অংশ অকার্যকর থেকে যায়, যা সামগ্রিক উন্নয়নকে ব্যাহত করে। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, মেয়েদের ড্রপআউটের হার প্রাথমিক স্তরে ১২ দশমিক ৩২ শতাংশ, মাধ্যমিক স্তরে ৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ২২ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এটি দেখায় মেয়েরা প্রাথমিক স্তরে আপেক্ষিকভাবে পড়াশোনা কম ছাড়লেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে, যা মেয়েদের শিক্ষাজীবনে বড় বিরাম সৃষ্টি করছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ এখনো পুরুষদের তুলনায় কম। ২০২৩-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মোট শিক্ষার্থীর মাত্র ৩৬ শতাংশ মেয়ে, যা দেখায় উচ্চশিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।

শুধু শিক্ষায় প্রবেশাধিকার নয়, শিক্ষার মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বৈষম্য তখনই আরও গভীর হয়, যখন দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীরা নিম্নমানের শিক্ষা গ্রহণে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা বহু বছর পড়াশোনা করেও মৌলিক সাক্ষরতা, গণিত কিংবা বিশ্লেষণমূলক দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এর ফলে তৈরি হয় ‘সনদধারী বেকার’ যারা শিক্ষিত হলেও কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা থেকে বঞ্চিত। এই পরিস্থিতি শিক্ষা ও উন্নয়নের মধ্যে প্রত্যাশিত সম্পর্ককে দুর্বল করে দেয়। বিশ্বব্যাংকের হিউম্যান ক্যাপিটাল ইনডেক্স অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন শিক্ষার্থী ১০ বছর স্কুলে থাকার পরও আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ষষ্ঠ শ্রেণির সমমানের দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। অর্থাৎ দশম–একাদশ শ্রেণির ছাত্রও আন্তর্জাতিক স্তরের মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণির মতো দক্ষ। জাতীয় শিক্ষা মূল্যায়ন ও গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবই ঠিকভাবে পড়তে পারে না এবং গণিতেও অনেকেই মৌলিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ। প্রাথমিক স্তরে বাংলা ও গণিতে দক্ষতার হার মাত্র ৫০ শতাংশ বা তার নিচে। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি শিশু মৌলিক দক্ষতা অর্জন করে না। স্থানীয় শ্রমশক্তি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে যত বেকার রয়েছেন, প্রায় ১৩ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী, যা ইঙ্গিত দেয় উচ্চশিক্ষা পেয়ে থাকলেও তারা বাজার-উপযোগী দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, নিয়োগ কর্তারা মনে করেন বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রোগ্রামগুলো বর্তমান শ্রমবাজারের চাহিদা মেটাতে অপ্রতুল, ফলে স্নাতকেরা দক্ষ কর্মী হিসেবে কাজের জন্য প্রস্তুত নয়।

শিক্ষায় বৈষম্য সরাসরি আয়বৈষম্যকেও বাড়িয়ে তোলে। মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিরা সাধারণত ভালো চাকরি ও আয় অর্জন করতে সক্ষম হয়, আর নিম্নমানের শিক্ষা পাওয়া মানুষ কম মজুরি ও অনিরাপদ কর্মক্ষেত্রে আটকে পড়ে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান আরও প্রশস্ত হয়, সামাজিক গতিশীলতা হ্রাস পায় এবং সমাজে অসন্তোষ ও অস্থিরতা বাড়ে। এভাবে শিক্ষায় বৈষম্য একদিকে যেমন আয় বৈষম্যের কারণ, অন্যদিকে তা আয়বৈষম্যকে আরও গভীর করে।

আরও পড়ুন

উন্নয়ন দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষায় বৈষম্য মানবসম্পদ গঠনে বড় বাধা সৃষ্টি করে। মানবসম্পদই আধুনিক অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। যখন জনগোষ্ঠীর বড় অংশ মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়, তখন উৎপাদনশীলতা কমে, উদ্ভাবন ব্যাহত হয় এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় দেশ পিছিয়ে পড়ে। পাশাপাশি শিক্ষার বৈষম্য নাগরিক সচেতনতা ও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকেও দুর্বল করে, যা টেকসই উন্নয়নের জন্য ক্ষতিকর।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষানীতি। সরকারকে অবশ্যই শিক্ষা খাতে ন্যায্য অর্থায়ন নিশ্চিতকরণের সঙ্গে অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ে অভিন্ন ও সমমানের শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। গ্রামীণ বিদ্যালয়ে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল সুবিধা সম্প্রসারণ জরুরি। দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি, স্কুল ফিডিং এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে মেয়েদের শিক্ষার জন্য নিরাপদ পরিবেশ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক বাধা দূর করা প্রয়োজন।

শিক্ষায় বৈষম্য কেবল একটি শিক্ষাগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর উন্নয়ন সংকট। এই বৈষম্য দূর না হলে দারিদ্র্য হ্রাস, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার অর্জন সম্ভব নয়। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে কেউ পিছিয়ে থাকবে না। আজ শিক্ষায় সমতা নিশ্চিত করা মানেই আগামী দিনের একটি উন্নত, স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজে বিনিয়োগ করা।

লেখক: নূরুন নাহার আঁখি, প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।