সাংবাদিক থেকে খায়রুল যেভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
বাংলাদেশে ছয় বছর সাংবাদিকতা করে উচ্চশিক্ষার জন্য ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান খায়রুল ইসলাম। যুক্তরাষ্ট্রে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি শেষে এখন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকতা করছেন তিনি। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির স্কুল অব কমিউনিকেশন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া স্টাডিজে ক্রাইসিস অ্যান্ড রিস্ক কমিউনিকেশনের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একটি আর-ওয়ান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।
বাংলাদেশে অনেক সময় পারিবারিক চাপ বা প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষ নিজের পছন্দের বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে পারে না। খায়রুলের ক্ষেত্রেও ছিল এমন সীমাবদ্ধতা। তিনি সাংবাদিকতা পড়তে চেয়েছিলেন, কিন্তু ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে। প্রথম বর্ষ থেকেই ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস’-এ রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করেন। মাস্টার্স শেষ করার পর ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটিতে মাস কমিউনিকেশনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য ভর্তি হন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেন।
সাবেক সাংবাদিক হিসেবে সংকট ও দুর্যোগের সময় গণমাধ্যম কীভাবে ঝুঁকির তথ্য উপস্থাপন করে, তা নিয়ে আগ্রহ ছিল খায়রুলের। সেই কৌতূহল থেকেই ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটিতে ক্রাইসিস অ্যান্ড রিস্ক কমিউনিকেশন বিষয়ে পিএইচডি করতে অনুপ্রাণিত হন। এই প্রোগ্রামটি ক্রাইসিস অ্যান্ড রিস্ক কমিউনিকেশনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। খায়রুল প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিতে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিন থেকেই বুঝেছিলাম, আমি ঠিক জায়গাতেই এসেছি। এখানে ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের শীর্ষস্থানীয় গবেষকদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাই।’
খায়রুল ইসলাম এখন ক্রাইসিস কমিউনিকেশনের গবেষক এবং শীর্ষস্থানীয় জার্নালে তাঁর বহু পিয়ার-রিভিউড রিসার্চ আর্টিকেল প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘এসব প্রকাশনার সবচেয়ে আনন্দের দিক হলো—এগুলো সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত। সাংবাদিক হিসেবে আমি আগ্রহী ছিলাম সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সংকট ও দুর্যোগের সময় ক্রাইসিস কমিউনিকেশন করে। এই অভিজ্ঞতাই আমাকে থিওরি ও বাস্তবতার মধ্যে সংযোগ তৈরি করতে সাহায্য করেছে।’
যেসব বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে আসতে চান তাঁদের উদ্দেশে খায়রুলের পরামর্শ হলো, নিজের সঙ্গে সবচেয়ে ভালোভাবে মানানসই সাবজেক্টটি খুঁজে বের করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাংকিং সামগ্রিক মর্যাদার একটা ধারণা দিতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো মিডিয়া বা কমিউনিকেশন প্রোগ্রাম সত্যটা সব সময় তুলে ধরে না। তাই গ্র্যাজুয়েট স্টাডির সময় প্রোগ্রামের ফোকাস ও শিক্ষকদের প্রোফাইল ভালোভাবে দেখা জরুরি।
খায়রুল ইসলাম আরও বলেন, ‘যদি কারও পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকে, তাহলে একাডেমিক লক্ষ্যগুলো সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা উচিত। অনেক শিক্ষার্থী নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে “ট্রেন্ডি” বিষয় বেছে নেয়, যা একটি ভুল সিদ্ধান্ত। একাডেমিক চাকরির বাজার অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। পিএইচডি শেষে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক পদে চাকরির জন্য একটি পদে ২০০ জনেরও বেশি আবেদনকারীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, যেখানে অনেকেই অভিজ্ঞ গবেষক। তাই আপনার প্রোফাইলের প্রতিটি দিক গুরুত্বপূর্ণ।’
খায়রুল ইসলাম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিয়ে গণমাধ্যমে অনেক সময় বিভ্রান্তিকর তথ্য দেখা যায়। যদিও বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি কমে যাওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে, তবে এসব পরিবর্তন সাধারণত যোগ্য ও বৈধ শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব ফেলে না, বিশেষ করে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে।
যুক্তরাষ্ট্রে অনেক বাংলাদেশি মিডিয়া ও কমিউনিকেশনের গবেষক খুব ভালো করছেন। বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি বড় শক্তি হলো তাঁদের পেশাগত অভিজ্ঞতা, বিশেষ করে মিডিয়া ও ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা। যুক্তরাষ্ট্রের একাডেমিয়ায় এই অভিজ্ঞতা খুবই মূল্যবান এবং বড় একটি সুবিধা তৈরি করে। তিনি বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেন, যুক্তরাষ্ট্রে মিডিয়া ও কমিউনিকেশন বিষয়ে পড়তে চাইলে আগে সাংবাদিকতা বা জনসংযোগের মতো প্রাসঙ্গিক পেশাগত অভিজ্ঞতা অর্জন করতে।
খায়রুল ইসলাম আরও বলেন, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্ক অ্যাট ওসওয়েগোতে গ্র্যাজুয়েট অ্যাডমিশন কমিটিতে কাজ করার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল—গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রি কেন করতে চান, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা। অনেক উচ্চ জিপিএধারী আবেদনকারীও এই জায়গায় দুর্বল ছিলেন। পেশাগত অভিজ্ঞতা সেই ব্যাখ্যাকে শক্ত করে এবং আবেদনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। মিডিয়া ও কমিউনিকেশন শিক্ষার্থীদের প্রোফাইল দেখলে এর প্রতিফলন পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি মিডিয়া ও কমিউনিকেশন গবেষকদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে বলে মনে করেন খায়রুল ইসলাম। তিনি বলেন, আগে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার বিভিন্ন কনফারেন্সে বাংলাদেশি গবেষক খুব কম দেখা যেত। কিন্তু এ বছরই ন্যাশনাল কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েশন (এনসিএ) সম্মেলনে তিনি প্রায় ৪০ জন বাংলাদেশি গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী ও গবেষকের দেখা পেয়েছেন। খায়রুল বলেন, ‘এখন আমরা ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েশন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস অ্যান্ড রিস্ক কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েশন, স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড কমিউনিকেশন এবং সাউথ এশিয়া কমিউনিকেশন অ্যাসোসিয়েশনের মতো বড় সংগঠনগুলোতে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখছি। তাই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে ভালো করার অনেক সম্ভাবনা আছে বলে মনে করি।’