শিক্ষকতাকে ভ্যাকেশন থেকে নন-ভ্যাকেশন ঘোষণা করার সাতকাহন
জাতির বৃহত্তর কল্যাণে শিক্ষকদের চাকরি নন-ভ্যাকেশন ঘোষণা করার উদ্যোগকে শিক্ষকসমাজের অনেকেই স্বাগত জানিয়েছেন। রাষ্ট্র কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্যোগ প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
গতকাল রোববার (২৯ মার্চ) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি কলেজ-১ শাখার উপসচিব সাবিনা ইয়াসমিন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে মন্ত্রণালয়ের ১ নম্বর সূত্রের স্মারকে জারি করা পত্রের অনুচ্ছেদ ‘ক’-এ উল্লেখ করা হয়েছে: ‘সার্বিক দিক বিবেচনায় শিক্ষা সেক্টরকে নন-ভ্যাকেশন বিভাগ ঘোষণা করা যথাযথ হবে না।’
তবে শিক্ষকদের আপত্তি স্পষ্টতই কর্তৃপক্ষের সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গি এবং অফিস সময়ের বাইরে তাঁদের সম্পাদিত কাজের স্বীকৃতির অবমূল্যায়নকে কেন্দ্র করে। তাঁদের দাবি, নন-ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রতি ১১ দিনে ১ দিন পূর্ণ বেতনের ছুটি পান; বিপরীতে, ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টে কর্মরত গণকর্মচারীরা প্রতি ১২ দিনে ১ দিন ছুটি পেলেও তা অর্ধেক বেতনে সীমাবদ্ধ। শিক্ষকদের মতে, এখানে একটি প্রাতিষ্ঠানিক বৈসাদৃশ্য—যা তাঁদের ভাষায় ‘শুভংকরের ফাঁকি’—রয়েছে। কেননা বাস্তব বিচারে, ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টে একজন কর্মী ২৪ দিনে মাত্র ১ দিন পূর্ণ বেতনের ছুটি পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে নন-ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টের একজন কর্মচারী বছরে মোট ১২৮ দিন ছুটি ভোগ করেন (শুক্র ও শনিবার ৫২ সপ্তাহ = ১০৪ দিন, সঙ্গে সরকারি সাধারণ ছুটি ২৪ দিন)।
অপর দিকে ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টে শিক্ষক ও কর্মচারীদের মোট ছুটি—শুক্র–শনিবারসহ সরকারি ছুটি বাদে মাত্র ৭৬ দিন, যার মধ্যে সরকারি ছুটি ২৪ দিন অন্তর্ভুক্ত। তদুপরি এই সরকারি ছুটির দিনগুলোতেও শিক্ষকদের কার্যত অবকাশ থাকে না। জাতীয় দিবস উদ্যাপন, শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের বাইরে প্রশাসনিক আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। এর ফলে তথাকথিত ‘ছুটি’ বাস্তবে কর্মব্যস্ততায় রূপান্তরিত হয়।
বাংলাদেশে শিক্ষকতা যেন অবিরাম ছুটির আরেক নাম। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ‘স্কুল-কলেজ ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট’-এর ধারণাই জানেন না; আরও বৃহত্তর অংশ এর কার্যপ্রণালি সম্পর্কেও অজ্ঞ। অধিকাংশই অবগত নন যে এই ব্যবস্থায় চাকরি শেষে পেনশন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
উল্লেখিত বিজ্ঞপ্তির অনুচ্ছেদ ‘খ’ শিক্ষকদের জন্য একধরনের সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করে। সেখানে বলা হয়েছে, ‘বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ও বিসিএস (কারিগরি শিক্ষা) ক্যাডারের সদস্যগণ এবং শিক্ষা সেক্টরের অন্যান্য শিক্ষকদের শ্রান্তিবিনোদন ছুটি ও গড় বেতনে অর্জিত ছুটিসহ অন্য ছুটি প্রাপ্যতার বিষয়টি বিবেচনাযোগ্য, বিধায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় অর্থ বিভাগের সম্মতি সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে।’
বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের চোখে শিক্ষকতা যেন অবিরাম ছুটির আরেক নাম। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ ‘স্কুল-কলেজ ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্ট’-এর ধারণাই জানেন না; আরও বৃহত্তর অংশ এর কার্যপ্রণালি সম্পর্কেও অজ্ঞ। অধিকাংশই অবগত নন যে এই ব্যবস্থায় চাকরি শেষে পেনশন প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।
নির্ধারিত ছুটি বিধিমালা, ১৯৫৯-এর বিধি ৩-এ গড় বেতনে ও অর্ধগড় বেতনে ছুটির বিধান বর্ণিত হয়েছে। নন-ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টে কর্মকর্তা প্রতি ১১ দিনে ১ দিন পূর্ণ গড় বেতনের ছুটি (ফুল অ্যাভারেজ পে লিভ) এবং প্রতি ১২ দিনে ১ দিন অর্ধগড় বেতনের ছুটি (হাফ অ্যাভারেজ পে লিভ) অর্জন করেন; ফলে বছরে মোট ছুটি জমা হয় প্রায় ৬২ দশমিক ৭২ দিন। ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টে তা নেমে আসে প্রায় ৩১ দশমিক ৩৬ দিনে। অর্থাৎ, ৩০ বছরের চাকরিতে নন-ভ্যাকেশন বিভাগের একজন কর্মকর্তা প্রায় ৩১ মাসের ছুটির আর্থিক সুবিধা পান; বিপরীতে ভ্যাকেশন বিভাগের ক্ষেত্রে তা অর্ধেকে সীমাবদ্ধ।
এই বৈষম্যের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। নন-ভ্যাকেশন বিভাগের কর্মকর্তা অবসরে অর্জিত ছুটি নগদায়ন করে উল্লেখযোগ্য আর্থিক সুবিধা পান; অথচ ভ্যাকেশন বিভাগের শিক্ষকেরা পান তার অর্ধেক। অথচ তাঁদের দায়িত্ব শ্রেণিকক্ষের সীমানা অতিক্রম করে। উত্তরপত্র মূল্যায়ন, প্রশ্ন প্রণয়ন, পাঠপরিকল্পনা প্রণয়ন—এসবই অতিরিক্ত শ্রমনিবিড় কাজ, যার যথার্থ আর্থিক বা সামাজিক স্বীকৃতি অনুপস্থিত।
শিক্ষকদের নন-ভ্যাকেশন সুবিধা প্রদানের বিষয়ে মতামত চেয়ে জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫-এর কাছে পত্র প্রেরণ করা হলে কমিশন ২৬ নভেম্বর ২০২৫ তারিখের ২৭২ নম্বর স্মারকে জানায় যে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারসহ অন্য শিক্ষকদের জন্য নন-ভ্যাকেশন সুবিধা প্রদানের বিষয়ে বেতন ও চাকরি কমিশন ২০১৩-এর সুপারিশ যথার্থ ও বাস্তবসম্মত।
অন্যদিকে ভ্যাকেশন ডিপার্টমেন্টভুক্ত হওয়ায় শ্রান্তিবিনোদন ভাতা গ্রহণের ক্ষেত্রেও শিক্ষকদের জন্য বিশেষ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রতি তিন বছর অন্তর অবকাশকালীন সময়েই এ ভাতা উত্তোলনের বাধ্যবাধকতা থাকায় অন্যান্য বিভাগের মতো আলাদা ছুটি গ্রহণের সুযোগ তাঁরা পান না।
শিক্ষকদের বক্তব্য, তাঁরা তাঁদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও দিয়ে যাবেন; কিন্তু একই গ্রেডের অন্যান্য সার্ভিসের কর্মচারীদের তুলনায় আর্থিকভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বঞ্চনা কেবল ভ্যাকেশন ও নন-ভ্যাকেশনের সীমায় আবদ্ধ নয়; বরং পরিবহনসুবিধা, লাঞ্চ ভাতা, গৃহঋণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত।
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস (প্রথম খণ্ড)-এর বিধি ৫(৫৮) অনুযায়ী, অবকাশ বিভাগ বলতে সেই বিভাগকে বোঝায়, যেখানে নিয়মিত অবকাশ অনুমোদিত এবং কর্মরত কর্মচারীরা অবকাশকালীন সময়ে কর্ম থেকে অব্যাহতি পান। কিন্তু বাস্তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গ্রীষ্মকালীন অবকাশেও ভর্তি কার্যক্রম, পরীক্ষা, ফরম পূরণসহ নানা কারণে কার্যক্রম সচল রাখতে হয়। ফলে এই বিভাগের কর্মচারীদের প্রকৃত অবকাশ প্রায় অনুপস্থিত।
শিক্ষকসমাজ অতিরিক্ত কোনো সুবিধা দাবি করছে না; তারা কেবল সমতা চায়—অন্যান্য বিভাগের মতো সমান সুযোগ, ন্যায্য আর্থিক স্বীকৃতি এবং মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ। এই ন্যূনতম প্রাপ্য নিশ্চিত করাই এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।
রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহর ‘অভিমানের খেয়া’ কবিতার পঙ্ক্তি এখানে অনিবার্যভাবে স্মরণে আসে—
‘অভিলাষী মন চন্দ্রে না পাক, জ্যোৎস্নায় পাক সামান্য ঠাঁই—
কিছুটা তো চাই, কিছুটা তো চাই,
আরও কিছুদিন, আরও কিছুদিন—আর কত দিন?’
যেহেতু এ রকম একটি চিঠি সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনার মধ্যে ইস্যু হয়েছে, সুতরাং শিক্ষকসমাজ আজ নির্ভার হয়ে বসে আছে—অন্তত এ যাত্রায় জ্যোৎস্নায় সামান্য একটু ঠাঁই পাবে।
*লেখক—সচিব তালুকদার, সাফিয়া জান্নাত সকাল, আজরিন জান্নাত সেবা ও অরিয়ন তালুকদার, শিক্ষক ও লেখক